কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:১০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গানম্যান গণমাধ্যম ও গণমানুষের কথা

ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
গানম্যান গণমাধ্যম ও গণমানুষের কথা

সার্বিকভাবে নিত্যনতুন ইস্যু পেলে পুরোনো সব ইস্যু ভুলে যাওয়াটা এ দেশের গণমাধ্যম ও গণমানুষের রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একজন ওসমান শরিফ হাদির ক্ষেত্রে বিষয়টা ব্যতিক্রম। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তৃতার সূত্র ধরে বলা যায়, হাদি বিদায় নেয়নি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশে একালের বিদ্রোহী ও অকুতোভয় দেশপ্রেমিক হাদি যেন প্রতিনিয়ত ‘চির উন্নত মম শির’ বলে ‘আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচা’র দীক্ষা দিচ্ছে। এ চত্বরেই ঘুমিয়ে আছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, যিনি দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে শ্রেণিবৈষম্যের জীবন্ত ক্যানভাস সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু একজন হাদির ক্ষেত্রে ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে’ কথাটি চলে না। হাদি যেন প্রতিনিয়ত বয়স, লিঙ্গ কিংবা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার চেতনায় এক বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের ছবি এঁকে চলেছে। সেই ছবি চিরজাগ্রত রাখার দায়িত্ব যারা সাহস করে কাঁধে নিয়েছেন এবং তাদের মতো সংশপ্তক হওয়ার ব্রত নিয়েছেন, আজ তারাও হুমকির মুখে। এমন ব্যক্তিবিশেষের নিরাপত্তায় গানম্যান নিয়োগ তারই অকাট্য প্রমাণ।

জুলাই ও আগস্টে যারা সামনে থেকে লড়াই করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা যে হুমকির সম্মুখীন হবেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বেন; এটা ছিল অবধারিত। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে কোনো বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। প্রতিবিপ্লবই প্রমাণ করে সত্যিকারের বিপ্লব হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে সেই বিপ্লব হয়েছে। তারা গণরায় নয়, গায়ের জোরে, ষড়যন্ত্র করে কিংবা তৃতীয়পক্ষের মদদে ও তাদের স্বার্থরক্ষায় ক্ষমতা কবজা করেছিল। বিশেষত জুলাই বিপ্লবের পর যখন নানাভাবে এই বিপ্লবের নেতাদের ‘ম্যাটিকুলাস প্ল্যানার’ এবং ভিনদেশের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে তাদের সব কর্মকাণ্ডের হিসাব রাখা ও কড়ায়-গণ্ডায় সবকিছু উসুল করার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় মৃত্যুঝুঁকিতে আছে সম্মুখসারির জুলাই যোদ্ধারা। জুলাই-আগস্টে এ দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়ে যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আশাব্যঞ্জক সাফল্য লাভে ব্যর্থতা, নির্বাচন বানচাল করতে শুটার টিম ও কিলিং গ্রুপের আবির্ভাব এবং অত্যাধুনিক স্নাইপার ব্যবহার নিয়ে সর্বত্র আলোচনার পরও একজন হাদির এমন অসহায় মৃত্যু হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার উত্তর মেলানো কঠিন।

হাজারো প্রশ্নের মধ্যে যে কয়টি প্রশ্নের উত্তর যে কোনো মূল্যে জানা প্রয়োজন, তার কয়েকটি হলো—হাদির মৃত্যুতে কে লাভবান হলো? ক্ষতিগ্রস্ত হলো কে? হাদি অন্য কোনো আসনের প্রার্থী হলেও কি খুন হতেন? অন্য কেউ যদি হাদির কাঙ্ক্ষিত আসনে (ঢাকা-৮) নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হতেন, তিনিও কি খুন হতেন? এসব প্রশ্নের উত্তরেই মিলতে পারে হাদি হত্যায় জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখা অমানুষ ও অপশক্তির পরিচয়। আর হাদি হত্যার পরপর গণমাধ্যমে হামলা এবং দুটি পত্রিকা অফিসে আগুন জ্বালিয়ে ভাঙচুর এবং অগ্নিনির্বাপক গাড়িকে ঘটনাস্থলে আসতে বাধা দিল কারা? কেন? এর মাধ্যমে কী অর্জন করতে চেয়েছিল ওই অপশক্তি? গণমাধ্যমকর্মীদের তাদের কর্মস্থলে পুড়িয়ে মারার কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি? এমন জঘন্য ষড়যন্ত্রইবা করল কারা? একজন হাদির শাহাদাতবরণ এবং এ নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে খবর, ফিচার ও কলামকে বিভক্ত করা কিংবা মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতেই কি এমন আগুন ও গণমাধ্যমকর্মী হত্যাচেষ্টা? অথচ হাদি নিজেই প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন—প্রথম আলো অফিসের সামনে তোমাদের কাজটা কিরে ভাই? পারলে এমন আরও দশটা পত্রিকা বের করে দেখাও। না, সে পথে কেউ হাঁটেনি বা কাউকে হাঁটতে দেওয়া হয়নি। বরং পত্রিকা অফিসে আগুন আর গণমাধ্যমকর্মীদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পথেই হেঁটেছে ষড়যন্ত্রকারীরা, যা চিরতরে বন্ধ হওয়া উচিত।

নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে ২০ জনেরও বেশি তরুণ রাজনীতিবিদ ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে। হাদির পরিবারেরও কেউ কেউ গানম্যানের নিরাপত্তা বলয়ে আছেন। তবে প্রশ্ন হলো, প্রকৃত অর্থে গানম্যান পাওয়া নেতারা কতটুকু ঝুঁকির মধ্যে আছেন আর গানম্যান পেয়ে তারা আসলেই কি নিরাপদ? ভুলে গেলে চলবে না যে, শুধু গানম্যানই নয়, রীতিমতো নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা জালে থাকতেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী (বর্তমানে ক্ষমতাসীন) ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রচারণা চালানোর সময় পেনসিলভানিয়ার এক বটতলায় তার ওপর গুলি ছোড়া হয়। এ সময় একটি গুলি তার ডান কানে আঘাত করলে তিনি রক্তাক্ত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’; অর্থাৎ, আমেরিকাকে আবারও মহান ও শক্তিশালী করো। আর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, ‘ফাইট’ ‘ফাইট’; অর্থাৎ, লড়াই চালিয়ে যাও। একজন হাদি মৃত্যুর আগে তার কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের চিত্রপট তুলে ধরলেও গুলিবিদ্ধ হয়ে আর কিছু বলার সুযোগ পাননি। তার না বলা কথাই যেন আজ কোটি মানুষের চাওয়া, যার মূল সুর ‘চাই নিরাপদ বাংলাদেশ’। বহু হয়েছে। সিরাজ সিকদার থেকে হালের হাদি। আর কত লম্বা হবে এ তালিকা? অনেকেই অনেক ক্ষেত্রে ‘ফুলস্টপ’ বলতে পারেন। তবে জনগণ এখন মানুষের নিরাপত্তা তথা মানুষ হত্যার ক্ষেত্রে ফুলস্টপের কথা শুনতে চায়, যা কেউ বলছেন না। আর বললেও তাদের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না, যা রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের জন্য লজ্জার নতুন ইতিহাস রচনা করছে।

ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, শুধু বন্দুক নয়, গানম্যানও নয়, গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ও গণমাধ্যম মালিক ও কর্মীদের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে সেই স্বাধীনতা সদ্ব্যবহারই গণমানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এজন্য সাংবাদিকতার ছাত্রদের ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’ শেখানো হয়। নানা পেশার ও নানা মতের মানুষ ফিচার, কলাম ও মতামত লেখে তাদের আশঙ্কার কথা, অংশীজনদের ভূমিকা ও কাঙ্ক্ষিত সরকারি ব্যবস্থাপনার কথা ব্যক্ত করেন। ভোটের রাজনীতিতে গণমাধ্যম প্রভাব ফেলে বলে গণতান্ত্রিক সরকার গণমাধ্যমের প্রচারণাকে উপেক্ষা করতে পারে না। তবে দুঃখের বিষয়, হাদি হত্যার আগে এক অজানা আশঙ্কায় ছিল গণমাধ্যমকর্মীরা। শত্রুর আঘাত কিংবা সেলফ সেন্সরশিপ ও করপোরেট সাংবাদিকতার নামে আত্মহত্যার চেষ্টায় গণমাধ্যম আজ মৃত না হলেও বড় রকমের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। এখনো অনেকে বলতে ও লিখতে ভয় পায়। আবার বলে কিংবা লিখে নাজেহালও হয় কেউ কেউ। এতে বৃহৎ কলেবরে ধ্বংস হয় জননিরাপত্তা। এমনকি মিডিয়াকর্মীরাও তখন আর নিরাপদ থাকে না। সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড এবং এ-সংক্রান্ত বিচারের দীর্ঘসূত্রতা তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

অন্যদিকে জনসচেতনতা জননিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আগেও মানুষ এক হয়েছিল। কিন্তু ক্রমেই সেই আবেগ ভুলে যাওয়া এবং নিজ বলয়ে হারিয়ে যাওয়া ও নতুন কোনো ইস্যুতে সোচ্চার হওয়ার প্রবণতা পুঁজি করে ক্রমেই বেড়েছে সন্ত্রাসবাদ। খুনিরা যখন দেশ ছাড়ার সময় ও সুযোগ পায়, তখন সন্ত্রাসবাদ মদদপুষ্ট হয়। আর কোনো দল গোষ্ঠী বা দেশ যদি খুনিকে প্রকারান্তরে আশ্রয় দেয়, তখন নিত্যনতুন খুনির জন্ম হয়। প্রতিটি খুনের যৌক্তিক সময়ে বিচারের দাবিতে জনমত তৈরি এবং এ নিয়ে ক্রমাগত চাপ বিচারিক কাজে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে। ১৯৫৫ সালে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের বাসের আসন ছেড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিংশ শতকের শুরুতে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মহিলাদের ভোটাধিকার আদায়, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ শিরোনামে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংস্কার, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় আর্জেন্টিনার পুলিশ কর্তৃক ২০২৩ সালে প্লাস করিয়া নামক চালককে হত্যার বিচার ও পুলিশি সংস্কার প্রভৃতি সম্ভব হয়েছিল জনসচেতনতা ও সরকারের ওপর জনগণের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি এবং দাবি আদায়ের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সেই চাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে অনড় অবস্থানের কারণে।

পরিশেষে বলব, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা বা নির্বাচন করতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের গানম্যান নিশ্চিত করার জন্য একজন হাদির জন্ম কিংবা শাহাদাতবরণের ঘটনা ঘটেনি। আমরা যদি হাদির মতো সাধারণ রিকশায় চলাচল করা প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের জাতীয় সংসদে আসার সুযোগ করে দিতে না পারি কিংবা গানম্যান, বডিগার্ড, হোন্ডা আর গুন্ডা ছাড়া নির্বাচনে জয়লাভের পথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে জুলাই বিপ্লবে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া ও অঙ্গহানি হওয়া প্রতিটি বীরের প্রতি অসম্মানের শামিল। গানম্যান নয়, জননিরাপত্তায় গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও গণমানুষের সচেতনতাই হোক সংশপ্তক ও শহীদ হাদির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা সমর্থকের ব্রাজিলে যোগদান

ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’

বছরে কতবার পরিষ্কার করা হয় মসজিদে নববী?

আত্মসমর্পণের পর পাঁচ আ.লীগ নেতা কারাগারে

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা নিহত

একনেকে ১০ প্রকল্প অনুমোদন

কিউবায় ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

পরম আমাকে বিয়ে করেনি বলে তাদের ভীষণ দুঃখ: রাইমা

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু

আ.লীগ নেতা রানা গ্রেপ্তার

১০

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বহু হতাহত

১১

পাবনায় ধর্ষণ-হত্যার জেরে আসামিদের বাড়িতে আগুন, নিহত ৩

১২

নতুন কিছু করার অঙ্গীকার শি-কিমের

১৩

চার বছর পর ফিরেই মোসাদ্দেকের ফিফটি

১৪

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মাকে ধর্ষণের অভিযোগ

১৫

যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আইসিসি প্রসিকিউটর করিম খান সাময়িক বরখাস্ত

১৬

রাশিয়ার শ্রমবাজারে ১ লাখ কর্মী পাঠাতে চায় বাংলাদেশ

১৭

মহাসড়কে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর

১৮

ড. ইউনূসের বিচার চাইলেন গ্রেপ্তার সেই ৬১ আইনজীবী 

১৯

অনার্সে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন কোর্স বাতিলের খবর ‘ভিত্তিহীন’ : শিক্ষা মন্ত্রণালয়

২০
X