বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আমার ঠাকুর

নিখিল মজুমদার
আমার ঠাকুর

যুগ পুরুষোত্তম শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বাংলায় ১২৯৫ বঙ্গাব্দ ৩০ ভাদ্র, পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ছিল শিবচন্দ্র চক্রবর্তী। মায়ের নাম মনোমোহিনী দেবী। উল্লেখ্য, মনোমোহিনী দেবী ছিলেন যোগী হুজুর মহারাজের শিষ্য। শৈশবে অনুকূলচন্দ্র মায়ের কাছে ধর্ম-শিক্ষা লাভ করেন।

১৯৪৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর শ্রীশ্রী ঠাকুর স্বাস্থ্যগত কারণে বায়ু পরিবর্তনের জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শে অখণ্ড ভারতের বিহার রাজ্যের দেওঘর যান। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে গেলে ওই স্থানেই গড়ে উঠল সৎসঙ্গ আশ্রম। ভক্তশূন্য হেমায়েতপুর ধাম, তৎকালীন সরকার পাবনায় সৎসঙ্গ আশ্রমসহ কয়েকশ একর জায়গা সরকারি অধিগ্রহণ করে সেখানে মনোবিকারগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসার জন্য স্থাপন করা হলো পাবনা মানসিক হাসপাতাল, ১৯৫২ সালে। তিনি ১৯৬৯ সালে ২৬ জানুয়ারি ভারতের দেওঘরে পরলোকগমন করেন।

শ্রীশ্রী ঠাকুর সব ধর্মের নির্যাস থেকে পরম স্রষ্টাকে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মকে তিনি পৃথক করে দেখেননি, বহু মতের স্রোতধারাকে তিনি একই ধর্ম সমুদ্রে মিলিত হতে দেখেছেন। শ্রীশ্রী ঠাকুরের সুন্দরের এ আরাধনা তা হতে হবে স্বকীয় মতে, বিনয় আর ঔদার্যে পরিপূর্ণ; স্বাধীন চিন্তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশে।

শ্রীশ্রী ঠাকুর বললেন, ‘প্রার্থনাতে কইলি কত/ করলি নাকো কাজে, ফুটলো ওটা কল্পনাতে/ ফলটি পেলি বাজে।’ ‘অন্যকে কোন বিষয়/ বিচার ক’রবার পূর্বেই/ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিজেকে/ বিচার করে দেখ।’

একজন মানুষ আর একজন মানুষের কাছে এসে যদি শান্তি পায় বা তুষ্ট হয়, সে আবার তার পরিবেশের কাছে বলে, এতে বহু মানুষের শ্রদ্ধা ওই মানুষটির ওপর বর্তায়, আবার প্রত্যেকে যদি জানে সে তার ব্যথা নিরাকরণের একটা জায়গা আছে, তাহলে মানুষগুলো আশ্বস্ত হবে। কেউ অন্যায়মূলক প্রতিষ্ঠান গঠন করতে চাইলে তারাই প্রতিরোধ করবে। খারাপ পরিবেশের মানুষ ভালো পরিবেশের মানুষকে খেপিয়ে সমাজের অনিষ্ট সুযোগ পায় কম। একতাও বজায় থাকে। তাই যাদের দেখে আমরা সঠিক পথের সন্ধান পাব আগে তাদের আত্মশুদ্ধি হতে হবে। তখন পরম পিতার কাজ আমার করতে হবে না, তার কাজ তিনিই করবেন।

আদর্শকেন্দ্রিক ইষ্টীচলনের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন সুনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে। ইষ্টের জীবন্ত-আদর্শ পরম পূজ্যপাদ আচার্যদেব আজ বিশ্বের এই দুর্দিনে আমাদের প্রতি প্রত্যেকের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে চাইছেন যা পরম প্রেমময় শ্রীশ্রী ঠাকুর আমাদের কাছে চান। আমরা যদি সম্পূর্ণভাবে আদর্শে যুক্ত না হই, তাহলে আদর্শে যুক্ত হওয়ার কথা কাউকে বলতে পারব না। যা বড় বড় ইমারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ঘরে ঘরে ইষ্ট প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজেকে সংশোধন হয়ে চলতে হবে। নিজে ভালো না হলে কাউকে ভালো করার কথা বলা যায় না। সঙ্গে ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষকে আপন করতে হবে। এটাই শ্রীশ্রী ঠাকুরের আদর্শ।

শ্রীশ্রী ঠাকুরের আদর্শ তরুণদের কাছে এত বিশেষ যে, তারা শুধু প্রেমের আবেগ আরতার উৎসারণ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে নারাজ, তারা চায় এটা সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠুক ঐক্যের প্রতীক। সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আজ তরুণদের মনোজগৎও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তরুণরা বয়স ও ধর্মের কারণেই প্রতিবাদী হয়, প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করে, বিকল্পের সন্ধান করে। নতুন প্রজন্ম সব সমাজেই

জীবন-ঘনিষ্ঠতা, সৃষ্টিশীলতা আর দ্রোহের স্ফুরণ ঘটায়। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রুচি থাকে প্রকাশে ও ধ্যানে, থাকে প্রত্যাশাও। সৎসঙ্গের আদর্শ তরুণদের রুচি নির্মাণে ভূমিকা রাখছে। নতুন ও উন্নত চিন্তার সঙ্গে মানবসেবায় উৎসাহিত হয়ে ভক্তদেরও মেলবন্ধন ঘটায়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে তীর্থক্ষেত্র ও সংহতি সৃষ্টি করে।

মানুষের জীবনকে মাপার আসল মানদণ্ড কখনো কথার বা বক্তৃতার ঝংকারে নয়, বরং তার কর্মেও দ্যুতি। শব্দের ফুলঝুরি মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি কাড়ে, কিন্তু ইতিহাস গড়ে তারাই, যারা আদর্শকে ব্যবহার না করে কথায় ও কাজে এক। তাদের পরিশ্রম ও হৃদয়ের সততা একসূত্রে গাঁথা। তখনই সমাজ তাকে সম্মানের আসনে বসায়। বলার চেয়ে করার সাহসী পদক্ষেপই প্রকৃত প্রমাণ আর সেই প্রমাণের মধ্যেই লুকানো থাকে মানব মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখর। শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, ‘বললেই কিরে হয়?/ বলার মতো চলিস যদি/ তবেই হবে জয়।’ ‘খারাপ হ’তে চায় না কেউ/ খারাপ ক’রেও ভালই চায়,/ মন্দ ক’রেও ভাল’র তক্মায়/ বাহাদুরি গেয়ে বেড়ায়।’

কথার মাধ্যমেই মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু কথার ব্যবহার যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অপব্যবহার অনেক সময় অভিশাপেও পরিণত হয়। এ কথাটি শুধু একটি নীতিবাক্য নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। একজন মানুষ যদি এই শিক্ষা মেনে চলে, তবে সে নিজের জীবন যেমন সমৃদ্ধ করতে পারে, তেমনি সমাজের জন্যও হবে এক অমূল্য সম্পদ।

সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘প্রকৃতি আমাদের দুটি কান এবং একটি মুখ দিয়েছে, যাতে আমরা বলার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি শুনি। শোনার মাধ্যমেই মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, জ্ঞান সঞ্চয় করে এবং সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়।’ তবে শুধু কম বলা ও বেশি শোনাই যথেষ্ট না; প্রয়োজন সত্য কথা বলা। সত্য বলা মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ। এটি শুধু আবেগ নয়, বরং কর্তব্য, দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়।

শ্রোতা হিসেবে অন্যের মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন—মানুষের মহত্ত্ব কখনোই কথার আড়ম্বরতে নয়, বরং কর্মের বাস্তবতায়। কথার চেয়ে করার মধ্যেই সত্যিকার প্রমাণ নিহিত থাকে। আর সততাও হলো মানুষের আত্মার আলোকশিখা। কোনো কাজের সঙ্গে যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ না থাকে, তাহলে তা কখনোই সত্যিকারের ধার্মিক বা ধর্মযাজকের পরিচয় দিতে পারে না। এজন্য ধার্মিক বা ধর্মযাজক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন ধার্মিক বা ধর্মযাজক কখনো অনৈতিক পথ অবলম্বন করে নিজের স্বার্থ বা স্বীকৃতির জন্য সমাজের ও মানুষের ক্ষতি করে না। মনে রাখতে হবে, ধার্মিক বা ধর্মযাজক হওয়া মানে শুধুই ভালোবাসা নয়; এটি হলো কাজের মাধ্যমে মানবসেবা করা এবং ত্যাগী হওয়া, কুটিল বুদ্ধি নয়, বরং উদার হওয়া, দখল নয় বরং বিলিয়ে দেওয়া। তাই মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বজায় রেখে ধার্মিক বা ধর্মযাজক হওয়া হলো সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীলতা প্রকাশের সঠিক পথ। তাই মানুষের প্রকৃত সম্মান ধনসম্পদে নয়, কথার চাকচিক্যেও নয়, বরং তা নিহিত থাকে কথার সততা ও তার কর্মের সততা ও প্রেমময় জীবনযাপনে।

শ্রীশ্রীঠাকুর বললেন, ‘তুমি যদি সৎ হও, তোমার দেখাদেখি হাজার হাজার লোক সৎ হয়ে পড়বে। আর যদি অসৎ হও, তোমার দুর্দশার জন্য সমবেদনা প্রকাশের কেউই থাকবে না। কারণ তুমি অসৎ হয়ে চারদিকই অসৎ করে ফেলছ।’ যে মানুষ অন্যকে সৎ ভাবতে পারে না, সে নিজে কখনো সৎ হতে পারে না। তাই বলে অসৎকে সৎ বলতে ঠাকুর নারাজ। অসত্যকে তিনি কখনোই প্রশ্রয় দিতে বলেননি। ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধির জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে, সত্যনিষ্ঠ হতে হবে, সৎ জীবনযাপন করতে হবে।

জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থেকে সাহায্য করার মানসিকতার মধ্যেই মনুষ্যত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। শ্রম দিয়ে হোক, আর্থিক সহায়তা দিয়ে হোক, কিংবা পরামর্শ প্রদান করে হোক, নিঃস্বার্থ মানসিকতা নিয়ে একে অপরের পাশে থাকাই মনুষ্যত্বের ধর্ম হওয়া উচিত। যুগপুরুষোত্তম পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের মনুষ্যত্ববোধের সেই দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে আজ ২৬ ডিসেম্বর তার ১৩৮তম আবির্ভাব মহা-মহোৎসব ঢাকার পল্লবীতে সৎসঙ্গ বাংলাদেশ শ্রীমন্দিরে আয়োজন করা হয়েছে। জয়গুরু।

লেখক: আহ্বায়ক, সৎসঙ্গ বাংলাদেশ

(প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব)

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘ফিল্মি স্টাইলে’ হামলা চালিয়ে পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনতাই

অবশেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা-দাফনের সময় জানাল ইরান

বিশ্বকাপের আগেই সুসংবাদ / নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির বার্তা

মাঝ আকাশে বিমানের জানালার কাচ ভাঙলেন যাত্রী!

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

১০

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

১২

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

১৩

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১৪

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১৫

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১৬

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৭

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৯

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

২০
X