

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দুই দশকের বেশি সময় ধরে কৌশলগত অংশীদার, যার শুরু ২০০৪ সাল থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের জন্য একটি শীর্ষ বাণিজ্যিক (১২০-১৩৫ বিলিয়ন ইউরো) ও বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। ট্রয়িকা সংলাপসহ সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাসমূহ পারস্পরিক সুবিধার জন্য ক্রমাগতভাবে আরও শক্তিশালী ও গভীরতর হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মতো বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর ও কষ্টসাধ্য হলেও ট্রাম্পের একতরফাবাদের ফলে সৃষ্ট ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের বর্তমান প্রতিবন্ধকতার কারণে যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্য চুক্তিটি সম্পন্ন করার একটি বিশেষ তাগিদ সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যমান এ ব্যবধানগুলো দূর করা হবে এবং নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন বা তারও আগেই, অর্থাৎ ২৭ জানুয়ারির মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ-FTA) স্বাক্ষরিতও হতে পারে। ভারত ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের একটি বিশেষ সম্মান প্রদান করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরজুলা ফন ডের লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের চিফ আঁতোনিউ কস্তা এ বছর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এটাই বাস্তবতা যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়া থেকে ভারতের ক্রমাগত অপরিশোধিত তেল আমদানি নিয়ে কিছু সদস্যের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত পারস্পরিকভাবে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে দৃঢ় ও নিয়মিতকরণের মাধ্যমে একে অপরকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তবে বাস্তবতা হলো আর এক বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ও দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সাফল্য এবং ভারতের জাতীয় স্বার্থের স্পষ্ট উচ্চারণ তাদের নিজেদের স্বার্থেই কঠোর অবস্থান পরিত্যাগ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়েছে। এ ছাড়া ভারত ও যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি দেশ এরই মধ্যেই এফটিএসমূহে স্বাক্ষর করেছে। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি থাকা কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (ইসি-এফটিএ EC-FTA)-ও কার্যকর হয়ে উঠেছে। এসব কারণের পাশাপাশি ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকিস্বরূপ শুল্ক এবং মার্কিন নীতির প্রতি অসন্তোষ, ভারত-ইইউ বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে যে কোনো বিরক্তিকর বিষয় চিহ্নিত করার এবং তা কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি যৌক্তিক ভিত্তি সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক অতীতে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ব্যতিক্রমী ধরনের হয়েছে। ২২ জন ইইউ কমিশনার ভারত সফর করেছেন। এটা এই প্রথমবার ঘটেছে। জার্মান চ্যান্সেলর মের্জ সম্প্রতি দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রীয় সফর সমাপ্ত করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও এ বছরের শুরুতে ভারত সফরের জন্য আশা করা হচ্ছে, কারণ ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে কয়েকশ রাফায়েল যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির কূটনৈতিক উপদেষ্টা মহামান্য ইমানুয়েল বোন ১৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে ৩৮তম ভারত-ফ্রান্স কৌশলগত সংলাপে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। কৌশলগত সংলাপ চলাকালীন ভারত ও ফ্রান্স তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
এর আগে বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর নতুন বছরের সূচনা করেন ইউরোপের প্রথম সফর ফ্রান্স ও লুক্সেমবার্গ দিয়ে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি তিনি ফরাসি রাষ্ট্রপতি মাখোঁর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবনের বছরে তারা উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গতিশীলতার ক্ষেত্রে সম্পর্ককে বৈচিত্র্যময় করার উপায়সমূহ অনুসন্ধান করেন। পাশাপাশি তারা প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, মহাকাশ, বেসামরিক পারমাণবিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির কৌশলগত ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। ভারত-ওয়েমার পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণকে নিয়ে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালে যথাক্রমে জি৭ ও ব্রিকসের সভাপতিত্ব করা উভয়পক্ষের লক্ষ্য হবে একে অপরের বিপরীতে কাজ করার পরিবর্তে সমন্বয় খুঁজে বের করার জন্য একসঙ্গে কাজ করা, ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি মাখোঁর এমন মন্তব্যের প্রশংসা করেন ড. জয়শঙ্কর। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দুই দেশ বহু-মেরুত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি একসঙ্গে কাজ করাটা আমাদের জন্য এবং একই সঙ্গে এ পর্যায়ে বৈশ্বিক রাজনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’ ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি ইতালি সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমন্ত্রণ জানান। আইএমইসি করিডোর এবং বহুমাত্রিক রুটের ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে অসাধারণ সংযোগ ও সক্ষমতার সম্ভাবনা রয়েছে, যা উভয়পক্ষই তাৎক্ষণিক কিছু প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কার্যকর করতে আন্তরিক।
এ বিস্তৃত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিলম্বিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশাধিকার, কৃষি, অটোমোবাইল, প্রযুক্তিগত ও অপ্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতাসমূহের পাশাপাশি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যসমূহ (জিআই-সমূহ GIs) এবং ইইউর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম সম্পর্কিত ভিন্নতাগুলো সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বা পারস্পরিক সন্তুষ্টির সীমার মধ্যে সীমিত হচ্ছে। এ বাণিজ্য চুক্তিটি একে অপরের বাজারে, বিশেষভাবে ভারতীয় শ্রমনিষ্ঠ পণ্যের জন্য মসৃণ প্রবেশাধিকার প্রদান করবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পৃক্ততার পরিধি জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, প্রতিরক্ষা, সাইবার খাতসহ নিরাপত্তা, এআই কোয়ান্টাম ও নতুন যোগাযোগ প্রযুক্তি ৬জি এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (ইন্দো-প্যাসিফিক), এবং মানবসম্পদ, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সালে একটি বাণিজ্য ও প্রযুক্তি পরিষদ (Trade and Technology Council) প্রতিষ্ঠা করে, যার লক্ষ্য হলো ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি ও স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা। অভিবাসন ও গতিশীলতা ভারতের জন্য একটি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিদ্যমান রয়ে গেছে। বিশেষ কোনো দেশের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা এবং অন্যকিছু দেশের স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে বৈশ্বিক ও মূল্য সরবরাহ শৃঙ্খলসমূহকে (জিভিসি-সমূহ, GVCs) কীভাবে নিরাপদ করা সম্ভব, সেটা উভয়পক্ষের জন্যই একটি প্রধান উদ্বেগ ও সামঞ্জস্যের ক্ষেত্র হিসেবে থেকে যাচ্ছে। ভারত পুনর্ব্যক্ত করছে, সম্পর্ক শুধু তখনই শক্তিশালী করা যেতে পারে যখন থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা; পারস্পরিক স্বার্থ; পারস্পরিক সংবেদনশীলতা।
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত একটি পরিণত কৌশলগত মানসিকতা বিদ্যমান রয়েছে এবং এটি অভিন্ন মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তিতে একবিংশ শতাব্দীর জন্য একটি ফলপ্রসূ ও সুফলদায়ক কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে পরিচালিত করতে পারে। উভয়পক্ষই নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলাব্যবস্থা ও বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক শাসন ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে সমর্থন করে, যা ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের জন্য একটি ভিত্তি প্রদান করে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক
মন্তব্য করুন