দেশের আপামর জনসাধারণও নির্বাচন পদ্ধতিতে আস্থা-অনাস্থার প্রশ্নে কিছুটা বিভোর হয়ে আছেন। দেশের রাজনীতির এমন উত্তালময় খেলায় স্পষ্টভাবে দুদিকে দুটি রাজনৈতিক দল রয়েছে। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) কমবেশি ভূমিকা রয়েছে। নব্বই-পরবর্তী সময়ে এ দুদলই একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। কখনো সরকারি দল আবার কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই সরকার গঠিত হয়েছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতি সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোই গণতন্ত্রের খুঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকারের যেমন দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, ঠিক তেমনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা কম নয়। এখানে বলে রাখা ভালো, বিরোধী দল সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত গণতন্ত্রের অন্যতম ধারক-বাহক। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নির্বাচন ও নির্বাচন পদ্ধতির ওপর আস্থার পাশাপাশি যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকারও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সংবিধানকে সমুন্নত রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণই গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে।
এখন আমাদের সামনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে নির্বাচন অন্যদিকে আন্দোলন। বিএনপির একাংশ ও শরিকদের একাংশ পথ খুঁজছে কঠোর আন্দোলন করে সরকারকে কীভাবে চাপে ফেলা যায়। বিএনপি চাইছে তাদের চূড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচির আগে সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপ আরও বাড়ুক। এ চাপ বাড়াতে বিএনপি বেশ তৎপর রয়েছে।
অন্যদিকে সরকার আগামী নির্বাচন যে কোনোভাবেই হোক অংশগ্রহণমূলক করতে চায়। কিন্তু বিএনপি মনে করছে, তারা নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিহত করতে পারলে, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে। যদিও আওয়ামী লীগ চায় বিএনপিকে নিয়েই নির্বাচন করতে। তবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে সেটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি না, কিংবা বিএনপি সেই নির্বাচন প্রতিহত করতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মহলের কাছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বিএনপির দাবি না মেনে তাদের সমমনা দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনে গেলে, পরবর্তী সময়ে বিএনপি তাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জে টিকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, বিএনপি আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে খুব বেশি চাপে ফেলতে পারবে না। কারণ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে বর্তমানে বেশ শক্তিশালী।
একটানা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ দাপটের সঙ্গে রাজনীতিতে টিকে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রশ্নে দোদুল্যমান। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির অনেকের ধারণা ছিল বিদেশিরাই তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। পরিবেশটা এমন মনে হচ্ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবেই। এ ছাড়া বিএনপিরও অতিমাত্রায় আস্থা ছিল জামায়াত এবং হেফাজতের ওপর। শুধু আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারেনি সরকার, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন এবং দেশের মানুষের প্রতি। এমন অনাস্থার ভ্রমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি বেছে নিয়েছিল। সিভিল সমাজের বেশিরভাগ সদস্য এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা এ সিদ্ধান্তকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেছেন বিভিন্ন সময়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নেতিবাচক দিক হলো, হঠাৎ করে হরতালমুখী রাজনীতি সৃষ্টি হয়, যা জনগণ কোনোভাবেই সমর্থন করে না। গত এক দশকে দেশে হরতাল হয়নি। বর্তমান সময়ে হরতাল-রাজনীতি কোনোভাবেই সফলতার মুখ দেখবে না। কারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটে হরতাল আরও সংকট বাড়িয়ে দেয়। এজন্য এ ধরনের আন্দোলনে জনসমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাজেই হরতালের দিকে সহজে না যাওয়াই বিএনপির জন্য ভালো হবে।
লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়