‘ফুল’ শুভ্র সুন্দরের প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক। ফুলের নির্যাস মোহিত করে তোলে মানবমন। ফুলের রঙে বসন্ত রঙিন হয়। ফুল, প্রকৃতি, প্রকৃতির মিষ্টি আবহই বসন্তের অনুষঙ্গ। ষড়ঋতুর এ দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। ঋতুরাজ বসন্তের আলিঙ্গনে রুদ্রপলাশ, শিমুল, স্বর্ণশিমুল, মহুয়া, রক্তকাঞ্চনকে সঙ্গী করে বছর বছর মার্চ আসে এ বঙ্গদেশে। বার্তা দেয় নতুনের, বার্তা দেয় সজীব জীবনের। শুধু প্রকৃতির নান্দনিকতাই নয়, এ মার্চ সযতনে বুকে ধরে আছে এক চিরবসন্ত ইতিহাস।
১৯২০ সালের এ মার্চেই টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতিতে বঙ্গফুল ফোটে। যে ফুলের সুবাসে সুবাসিত বাংলার বায়ু, প্রকৃতি। পরাধীন মুক্তিকামী জাতিকে মুক্তির বসন্ত এনে দেওয়া সে ফুলের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মার্কিন ইতিহাসবেত্তা ড্যানিয়াল জে ব্রুস্টিন স্বাধীনতাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন—‘স্বাধীনতা একটি সুযোগের নাম যার মাধ্যমে আমরা যা কখনোই হতে পারার কল্পনা করতে পারি না, তা হতে পারি।’
বাঙালি জাতিকে সে দুর্লভ, চির আরাধ্য, আকাঙ্ক্ষার স্বাধীনতা এ মার্চেই এনে দেন মুক্তিমানব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন চিরশাশ্বত, অমর, তেজোদ্দীপ্ত বাণী—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বাঙালি জাতি তার এ শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দেয়। হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার জাদুর বাঁশির মতো সে আহ্বান তাদের টেনে নেয় স্বাধীনতার পথে। স্বাধীনতা নামক পবিত্র ফুলকে বাঁচানোর তাগিদে, অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্পে তারা হয়ে ওঠেন মুক্তির পথযাত্রী। সে মুক্তিযাত্রার কণ্টকাকীর্ণ পথ কখনো মসৃণ ছিল না। ছিল শ্বাপদসংকুলে পরিপূর্ণ। সে পথের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ছিল থমকে দাঁড়ানোর ভয়। ছিল পথ হারানোর শঙ্কা। তবুও মুক্তিকামী জনতা থেমে যায়নি। স্বাধীনতা নামক অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে প্রাণপণ ছুটে চলেছে একটি সাহসী অকুতোভয় সংগ্রামী তর্জনীর ভিতের ওপর ভর করে।
তর্জনী উঁচু করা ১৮ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে সমগ্র জাতিকে মুক্তির পথ দেখানো সে মহামানব নিউজউইক ম্যাগাজিনের ভাষায় ‘পোয়েট অব পলিটিকস বা রাজনীতির কবি’। তার ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেসকো কর্তৃক ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি কিংবা ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রার’-এ অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যে মাসটি জ্বলজ্বল করে অনন্তকাল দেদীপ্যমান থাকবে সেটিও মার্চ।
স্বাধীনতা ছাড়া, জীবনকে আত্মা ছাড়া শরীরের সঙ্গে তুলনা করেছেন লেবানিজ কবি কাহলিল জিবরান। সত্যিই তো! যে জীবনে স্বাদ নেই; যে জীবনে ফুল, পাখি, মুক্ত হাওয়া, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মুরোদ নেই; যে জীবনে মায়ের ভাষা, অধিকারের স্বাধীনতা নেই সে জীবন তো প্রাণহীন দেহই। অদৃষ্টের কাছে নিজের অধিকার সঁপে দেওয়া জনতার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে, তৎকালীন স্বার্থবাজ পাকিস্তানিদের ক্রমাগত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুক্তির দূত হয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একটি স্বাধীন সার্বভৌম পতাকার জন্য যে নিরন্তর প্রচেষ্টা, বাঙালি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য যে নিরলস প্রয়াস, স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলার আকাশে পতপত করে উড়ন্ত পতাকার সূচনা, সফল বাস্তবায়নও এ মার্চ মাসেই।
বাঙালি জাতিকে সব আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠান, জাতির দুর্দিনে-দুর্বিপাকে মাথা উঁচু করে অপরাজেয় দাঁড়িয়ে থাকার প্রেরণার উৎসমূল প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এবং সচিবালয়ে পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের পতাকা সরিয়ে সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মাঝখানে সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল একাত্তরের মার্চেরই ২ তারিখ। সেদিনের সে পতাকা উত্তোলন সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। অন্যায়-শোষণের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শুধু তাই নয়, জাতির পিতার জীবন ও যৌবনের উত্তাপ দিয়ে গড়া ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় ৩ মার্চ। তা ছাড়া ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে অনেক রাষ্ট্র মায়াকান্না দেখালেও প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পাশে ছিল না। বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ভূমিকা সে ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবি রাখে। শুধু প্রশংসাই নয়, তাদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ এ জাতি। কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলার মাটিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সময়টাও সেই মার্চ। বাহাত্তরের ১৮ মার্চ।
সব ধরনের বৈদেশিক চাপ, সমীকরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশের পাশে ছিল বন্ধু হয়ে। যুদ্ধকালীন পুরোটা সময়জুড়ে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে গেছে নিঃশর্তে। এ লেখায় ভারত প্রাসঙ্গিক। কারণ, তৎকালীন সময়ে বাংলা ও বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয় একাত্তরের মার্চের অন্তে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৫ মার্চ, ১৯৭২ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারকার্য পুরোপুরিভাবে সমাপ্ত হয়। সদ্য স্বাধীন একটি দেশ থেকে এত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সহায়ক দেশের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
দীর্ঘ ৯ মাসের গেরিলা যুদ্ধ শেষে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে ঢেলে সাজানোর বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বীরের বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরই তিনি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিষয়গুলোর ভিত মজবুত করার ব্যাপারে মনোনিবেশ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ব্যাপারটা এত বেশি সহজও ছিল না। তাও জাতির পিতা তার সুদক্ষ নেতৃত্ব দ্বারা একের পর এক সফলতার পালক যুক্ত করেছেন দাম দিয়ে কেনা স্বাধীন বাংলার মুকুটে।
১৯ মার্চ ১৯৭২। ১২ দফা সংবলিত ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি (The Indo-Bangla Treaty of Friendship, Cooperation and Peace) স্বাক্ষরিত হয়। স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন মাসের মধ্যে সম্পাদিত এ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিঃসন্দেহে দেশের সেরা কূটনৈতিক অর্জন বলে বিবেচিত।
কালের পরিক্রমায় হয়তো এ জাতিতে, ইতিহাসের অধ্যায়ের পাতায় পাতায়, পরতে পরতে অনেক ঘটনা জমা হবে। ইতিহাসের পাতা সমৃদ্ধ হবে ঘটনার ঘনঘটায়। কিন্তু সব ঘটনা ছাপিয়ে, সব ইতিহাস মৃদু হয়ে উঠবে একটি নাম, একজন মানুষের অবদান, কর্মকাণ্ড, নেতৃত্বের কাছে। আর সে মানুষটি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার জন্ম, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৭ মার্চ, বাঙালির স্বাধীনতা দিবস; মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিভিন্ন ঘটনা কাকতালীয়ভাবে নতুবা প্রকৃতির অদৃশ্য সমীকরণেই হয়তো এ মার্চ মাসকে ঘিরে আবর্তিত।
এভাবেই যুগ যুগ ধরে সোনালি ইতিহাস মুঠোবন্দি করে বাঙালির মার্চ আসে বছর ঘুরে। স্বাধীনতার মাস, মুক্তির মাস, ফুল ফোটার মাস, জয় বাংলা বলে এগিয়ে যাওয়ার মাস, উদ্যম-অর্জনে বাঙালির বসন্ত মাস ‘মার্চ’।
লেখক: সদস্য, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ