পিতার সূত্রে হামজা চৌধুরী গ্রানাডার বংশোদ্ভূত, মায়ের সূত্রে বাংলাদেশি। ইংলিশ ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার রক্ত বহন করছেন—এমন খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় তারকা লেস্টার সিটির এ মিডফিল্ডার। কিন্তু সার্বিকভাবে ইংলিশ ফুটবলে দক্ষিণ এশিয়ার পরিচয় বহন করা ফুটবলারদের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য!
দক্ষিণ এশিয়ান সংখ্যা : নানা বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের পর স্কাই স্পোর্টস জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে চল্লিশ লাখের বেশি দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন। কিন্তু প্রায় ৩ হাজার ৭০০ পেশাদার ফুটবলারের মাত্র ২২ জনের দক্ষিণ এশিয়ান পরিচয় রয়েছে। বিশ্লেষণে এ রুগণ চিত্রের কারণও অনুসন্ধান করা হয়েছে।
সাধারণ ধারণা : ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয়দের সম্পর্কে ধারণা হলো, তারা ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট বেশি পছন্দ করে। ২০২১-২২ মৌসুমে স্পোর্টস ইংল্যান্ডের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রিটিশ দক্ষিণ এশিয়ান প্রাপ্তবয়স্কদের ক্রিকেটের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ ফুটবল খেলে। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে স্কাই স্পোর্টস নিউজ ধারণা করেছে যে, তৃণমূলে পুরুষ ফুটবলারের মধ্যে ৬.৫ শতাংশ এবং নারী ফুটবলারের ১১.৪ শতাংশ দক্ষিণ এশিয়ান। সিনিয়র পর্যায়ে যা অনূদিত হচ্ছে না।
ধারণা বদলাচ্ছে : স্পোর্টিং ইকুয়ালস নামক দাতব্য সংস্থার প্রধান অরুণ কং বলেন, ‘১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যারা যুক্তরাজ্যে এসে নিজেদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন, এটি হয়তো তাদের বেলায় ঠিক ছিল; কিন্তু এখন পরিস্থিতি তেমন নয়। এখানে দক্ষিণ এশীয়দের চতুর্থ প্রজন্ম বাস করছে। তারপরও প্রিমিয়ার লিগের উপযোগী ফুটবলার খুঁজে না পাওয়া সত্যি লজ্জাজনক।’ ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায় এবং ইংলিশ ফুটবলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. ড্যানিয়েল কিলভিংটন বলেন, ‘অনেক নিয়োগকর্তা, প্রতিভা অন্বেষণকারী এবং কোচ বছরের পর বছর ধরে বলেছেন, ‘ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয়রা প্রযুক্তিগতভাবে খুব ভালো, কিন্তু প্রতিযোগিতা করার জন্য শারীরিকভাবে সুঠাম নয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমি মনে করি এই মানসিকতা এখনো অনেকের মনের মধ্যে গেঁথে আছে।’
শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব : প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনে ১০ বছর ধরে কাজ করা রিজ রেহমান বলছিলেন, ‘আমি কোচদের বলব খেলোয়াড়দের প্রতি ধৈর্য ধরতে। খেলা এখন বদলে গেছে এবং এখন সব আকারের খেলোয়াড়ই আছে।’ ক্রিস্টাল প্যালেসের প্রি-একাডেমি স্কাউট মাইকেল ভারগুইজাস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘এশিয়ান পরিবারগুলো শিক্ষার পেছনে সব প্রচেষ্টা ব্যয় করে এবং ক্রিকেটের প্রতি বেশি আগ্রহী। আমার মনে হয় না তাদের পরিবার বা সংস্কৃতিতে ফুটবলকে উৎসাহিত করা হয়।’
বৈষম্যমূলক আচরণ : ২০২৩ সালে কিক ইট আউট এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পরিচালিত গবেষণা বলছে, ‘ফুটবলে এশিয়ান জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।’ যার উদাহরণ পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত গোলকিপার রোহান লুথরা কার্ডিফের সতীর্থ জ্যাক সিম্পসনের দ্বারা বর্ণবাদী আচরণের শিকার হওয়া।
প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির চেষ্টা : ‘ফুটবলস হিডেন ট্যালেন্ট’ তথ্যচিত্রে স্পষ্ট ছিল যে, খেলাটির সব স্তরেই ব্রিটিশ দক্ষিণ এশিয়ানদের পেশাদার পর্যায়ে অংশগ্রহণ বাড়ানো সংক্রান্ত পরিবর্তন আনার ইচ্ছা রয়েছে। বার্নলিতে জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত। ফুটবলের শীর্ষ স্তরে কিন্তু যার প্রভাব নেই। প্রিমিয়ার লিগ ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ান অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে, যা একাডেমি সিস্টেমে ওই অঞ্চল থেকে আসা খেলোয়াড়দের কম প্রতিনিধিত্বের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে অনূর্ধ্ব-৯ থেকে অনূর্ধ্ব-১১ বয়সের গ্রুপগুলোর ওপর মনোযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এশিয়ান ইনক্লুশন মেন্টরিং স্কিমও রয়েছে।
প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ তৎপর : প্রিমিয়ার লিগের ফুটবল ডিরেক্টর নিল সন্ডার্স বলেছেন, ‘আমরা প্রথমে এমার্জিং ট্যালেন্ট ফেস্টিভ্যালের ওপর মনোযোগ দিচ্ছি, যার মাধ্যমে খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের জন্য প্রিমিয়ার লিগের ইভেন্টে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়াচ্ছি।’ ইংলিশ ফুটবল লিগে সমতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক ডিরেক্টর ডেভিড ম্যাকার্ডল বলেন, ‘আমরা ক্লাবগুলোকে তাদের জনসংখ্যার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য উৎসাহিত করছি।’
মন্তব্য করুন