দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার নির্ভার আশ্রয়স্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল। স্বল্প খরচে ভালো চিকিৎসা দেওয়ায় সুনাম রয়েছে হাসপাতালটির। কিন্তু দুর্বল প্রশাসন, চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও দফায় দফায় কর্মবিরতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ নানা কারণে হাসপাতালটি এখন ধুঁকছে। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খুলনাবাসী, বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।
জানা গেছে, গত ৪ মাসে হাসপাতালের পরিচালক ডা. গৌতম কুমার পাল অফিস করেছেন মাত্র ৫ দিন। তত্ত্বাবধায়ক ও ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক এবং সহকারী পরিচালকও ৫ আগস্টের পর ১৫ দিনও অফিস করেননি। প্রশাসন না থাকায় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর গত ১০ দিনে তিনবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দফায় দফায় কর্মবিরতি দিচ্ছেন ইন্টার্ন ও অনারারি চিকিৎসকরা। ডেঙ্গু পরীক্ষা, এক্সরেসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সেবা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া হাসপাতালজুড়ে ময়লা-আবর্জনা তো আছেই। এসব কারণে বিভাগীয় সর্ববৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
ভেঙে পড়েছে হাসপাতাল প্রশাসন: হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের প্রধান তিন পদের মধ্যে পরিচালক ডা. গৌতম কুমার পাল থেকেও নেই। গত ২২ জুলাইয়ের পর থেকে তিনি হাসপাতালে এসেছেন মাত্র ৫ দিন। এর বাইরে বেশিরভাগ চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফোনও রিসিভ করেন না তিনি। ২৬ জুলাই থেকে উপপরিচালক পদ ফাঁকা। তত্ত্বাবধায়ক ডা. আক্তারুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও মাসের বেশিরভাগ সময় থাকেন অনুপস্থিত।
তিনি বলেন, পরিচালক, সহকারী পরিচালক কেউ হাসপাতালে আসেন না। এখানে কাজের পরিবেশ নেই। সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বেশি আসা হয় না।
একই কারণে হাসপাতালে আসেন না সহকারী পরিচালক নিয়াজ মুস্তাফি চৌধুরী। এভাবে মাসের পর মাস হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রধান তিন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে প্রশাসন। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া ঝুলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ উন্নয়ন ও সেবা খাত। এখন পর্যন্ত সম্পন্ন করা যায়নি বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি)।
হাসপাতালের হিসাব শাখার একজন কর্মচারী কালবেলাকে বলেন, প্রতি জুলাইয়ে এপিপি সম্পন্ন করার কথা থাকলেও আওয়ামী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে তা নভেম্বরে শেষ করা হয়। এবার তো আরও দেরি হবে।
১০ দিনে তিনবার চিকিৎসকদের ওপর হামলা: জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর হাসপাতালের শিশু বিভাগে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তিন দাবি উত্থাপন করা হয়। এই দাবির দুই দিনের মাথায় অপারেশন থিয়েটারে নারী চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করেন রোগীর স্বজনরা। ঘটনাক্রমে গত এক মাসের মধ্যে ওই দিনই পরিচালক গৌতম কুমার পাল হাসপাতালে ছিলেন; কিন্তু এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পরদিন থেকে আবারও অনুপস্থিত থাকেন। গত ২০ অক্টোবর মেডিসিন ওয়ার্ডে একজন অনারারি চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করে বহিরাগতরা। গত সোমবার পরিচালকের বিনা নোটিশে অনুপস্থিতির জন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে নিরাপত্তার দাবি জানায়।
সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ শরীফুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, থানায় যোগদানের পর গত ৭ দিনে তিনবার হাসপাতালে গিয়েছি। সেখানে আনসার সদস্যরা আছেন; কিন্তু কীভাবে কাজ করে, বুঝি না। একবার পরিচালককেও দেখেছি। যদিও আমরা প্রতিটি ঘটনার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। হাসপাতাল প্রশাসনের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ অনেক সেবা বন্ধ: প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও কর্মবিরতি, অপারেশন থিয়েটারের ডায়াথার্মি, অ্যানেসথেসিয়া মেশিনসহ অনেক মেশিন নষ্ট হওয়ার কারণে হাসপাতালে হচ্ছে না নিয়মিত অস্ত্রোপচার। রোগ নিয়ে মাসের পর মাস অপারেশনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। এতে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভোগান্তিতে পড়ছেন।
জানা গেছে, হাসপাতালজুড়ে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন মাত্র দুটি সচল, যেখানে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ জনের আল্ট্রাসনো করা যায়। অথচ প্রতিদিন হাসপাতালে অন্তত ২০০ আল্ট্রাসনো করার চাহিদা রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন হাসপাতালে দেখা যায়, চারদিকে আবর্জনা আর ময়লায় ভরা হাসপাতাল যেন একটি ডাস্টবিন। সেপটিক ট্যাঙ্ক ওভারফ্লো হয়ে ময়লা বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে। এর মধ্যে আউটসোর্সিং ১০০ লটের কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন।
হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি সামেলা বেগম কালবেলাকে বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ, পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু আল্ট্রাসনো করাতে গিয়ে ৩ দিনেও সিরিয়াল পাইনি। এক্সরেসহ অন্যসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে বাইরে থেকে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. গৌতম কুমার পালকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। উপপরিচালক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, স্যার বেশিরভাগ সময় ছুটিতে থাকেন। নষ্ট মেশিন ঠিক করতে উপযুক্ত জায়গায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।