বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকারের পতন, বন্যাসহ জাতীয় কয়েকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সংকটে বন্ধ ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রেলের পণ্য পরিবহন। অনেকদিন পর আবারও একই সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়েছে কনটেইনার। তবে এবার এর পরিমাণ খুব বেশি না হলেও হাজারের ঘর ছাড়াতে পারে। দুই দিন ধরেই এসব কনটেইনার পড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের গুডস ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই)। মূলত রেলের ইঞ্জিন সংকটের কারণে এসব কনটেইনার ছেড়ে যেতে পারেনি বলে জানিয়েছে রেলওয়ে। আর বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, চলাচল ঠিক হলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এসব কনটেইনারের কারণে জট লাগেনি বন্দরে। হয়নি কোনো লোকসানও। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। দুই দিন নয়, দুই ঘণ্টার জন্যও কেন রেল বন্ধ থাকবে, তা নিয়ে ক্ষিপ্ত তারা। এই সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানের শিকার হয়েছেন বলে দাবি তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার রাত ১২টা থেকে রেলের রানিং স্টাফদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যবাহী কনটেইনার ট্রেন চলাচলও। এরপর দাবি পূরণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে রানিং স্টাফরা কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার পরও আটকে থাকা পণ্যবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে বুধবার বিকেল পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে ছাড়া সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত থাকা জ্বালানি, কনটেইনার এবং গমবাহী সাতটি রেক প্রস্তুত থাকলেও ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেগুলো চট্টগ্রাম পোর্ট গুডস ইয়ার্ডে আটকে থাকে।
সিজিপিওয়াইয়ের প্রধান ইয়ার্ড মাস্টার আবদুল মালেক কালবেলাকে বলেন, সিজিপিওয়াইতে কনটেইনারবাহী চারটি ট্রেন রয়েছে। গতকাল সকাল ১০টায় একটির জন্য পাওয়ার (ইঞ্জিন) কল দেওয়া হয়েছে, সেটা আসে বেলা দেড়টায়। এরপর জ্বালানিবাহী একটি রেক সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়। তেলবাহী বাকি দুটি রেক রয়েছে। এর মধ্যে একটি শ্রীমঙ্গল ও একটি রংপুর যাবে। রংপুরগামী একটি গমবাহী ট্রেন ছাড়ার জন্য পাওয়ার কল দেওয়া হয়েছে। মূলত বুধবার সকাল থেকে কোনো পাওয়ার (ইঞ্জিন) পাওয়া যায়নি। পাওয়ার এলে রেকগুলো গন্তব্যে ছেড়ে যাবে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত শুধু একটি রেক পাঠানো হয়েছে। বাকি সাতটি রেক প্রস্তুত থাকলেও ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেগুলো ছেড়ে যেতে পারেনি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক কালবেলাকে বলেন, রেলের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার পাঠানো সম্ভব হয়নি। রেল চালু হলে এসব কনটেইনার পরিবহন আবার শুরু হবে। রেল থেকে লাইন ক্লিয়ার করে তারা পুনরায় সব সচল করার চেষ্টা করছেন। যেহেতু দেড়দিন কর্মবিরতি ছিল, তাই তা ক্লিয়ার করতে একটু সময় লাগবে। তবে ওই রকম জট সৃষ্টি হয়নি। হয়তো এক হাজারের মতো কনটেইনার রয়েছে, তা দু-এক দিন চললে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে এতে লোকসানের কোনো বিষয় নেই।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেশিরভাগ কনটেইনার সড়কপথে আনা-নেওয়া করা হয়। ৩ থেকে ৪ শতাংশ কনটেইনার আনা-নেওয়া হয় রেল ও নৌপথে। ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে ট্রেনের মাধ্যমে কনটেইনারবাহী পণ্য আনা-নেওয়া হয়। এর বাইরে সিটেল, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলের মাধ্যমে পরিবহন করা হয় পণ্যবাহী কনটেইনার।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সদস্য মাহাবুব রানা কালবেলাকে বলেন, শ্রমিকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন শুনছি আবার রেলের ইঞ্জিন সংকটের কথা। সবকিছু ঠিক হলে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শিপমেন্ট তো পিছিয়ে যাচ্ছে। এক দিন কমবেশি হলে ব্যবসায়ীদের ডিলিংয়ের কিছু ব্যাপার রয়েছে। ওখান থেকে কনটেইনারবাহী যেই জাহাজ সেইল (রওনা) হবে, দেখা গেল তা ধরতে পারল না। যে কারণে পুনরায় তা ব্যবস্থা করতে গেলে আরও তিন দিন সময় লেগে গেল। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান তিন দিন পিছিয়ে গেল। সব মিলিয়ে এসব ছোটখাটো ব্যাপারগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ। ঠিক সময়ে কনটেইনার বন্দরে ঢুকতে বা বের হতে না পারলে দুই ঘণ্টার কারণেও দেখা যায় শিপমেন্ট এক সপ্তাহ পেছনে পরে গেছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহায়ক কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের ক্লিফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. এম মহিউদ্দিন চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, রেল চলাচল বন্ধ থাকার কারণে পণ্য পরিবহন যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা না যায়, তাহলে ব্যবসা খাতে এর প্রভাব পড়বেই। ইঞ্জিন সংকটের কারণে পণ্যবাহী কনটেইনার যাচ্ছে না, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। ধর্মঘট বা কর্মবিরতি ছিল, এ কারণে ট্রেন যায়নি, তা মানা যায়। কিন্তু এখন সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পরও কেন ইঞ্জিন থাকবে না। দুই ঘণ্টার জন্যও রেল বন্ধ থাকবে, এটা রহস্যজনক বিষয়। আসলে প্রতিটি সেক্টরে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা রয়ে গেছে। যে কারণে আমাদের বারবার এমন সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। এসব বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য রেল প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব।