বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা-ডলার অদলবদল (সোয়াপ) সুবিধা চালুর ফলে দেশে বাড়ছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা ও ব্যাংকগুলোর কারেন্সি সোয়াপের পর গতকাল সোমবার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে রিজার্ভ দাঁড়াবে ২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আড়াই মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ আবার ২১ বিলিয়ন ছাড়াল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বর্তমানে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। এজন্য তারা বিভিন্নভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে চলার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে গত মাসে ২১৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসায় কয়েকটি ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত ডলার এসেছে। এসব ডলারের বিপরীতে গতকাল ব্যাংকগুলো প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে। অর্থাৎ এ দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ১০১ কোটি ডলারের কারেন্সি সোয়াপ করেছে ব্যাংকগুলো। এর আগে ব্যাংকগুলো ৩৭ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিয়েছিল।
ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, বেশকিছু ব্যাংক ডলার দিয়ে টাকা নিয়েছে। এটিই রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ। আগামীতে সেই ডলার ফেরত নিলে রিজার্ভ কমতে পারে। তবে এর মধ্যে বিভিন্নভাবে রিজার্ভ বাড়বে।
এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ১১০ টাকা দরে ব্যাংকগুলো প্রবাসী ও রপ্তানি আয় কিনছে। এই দামে ডলার অদলবদল হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার নিয়ে সমপরিমাণ টাকা দিচ্ছে ব্যাংকগুলোকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৫০৫ কোটি ডলারে। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী, ওই দিন রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৯৯৩ কোটি ডলার। ২০ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ বেড়ে হয় ২ হাজার ৫৩২ কোটি ডলার। আইএমএফের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, ওই তারিখে রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ১৯ কোটি ডলার। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৭৪ কোটি ডলার। আর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, এর পরিমাণ ২ হাজার ১৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আড়াই মাস পর দেশে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আবারও ২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি টাকার সঙ্গে ডলার অদলবদল বা সোয়াপ ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য টাকা-ডলার অদলবদল করা যায়। এ সুবিধা চালুর পর ২০ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি ব্যাংক ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার দিয়ে সমপরিমাণ টাকা নিয়েছে। আর ২২ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি ব্যাংক ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ টাকা নিয়েছে।
দুই বছর ধরে দেশে ডলার সংকট চলছে। ফলে রিজার্ভ নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। সংকট সামাল দিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাতে চাহিদা কিছুটা কমলেও ডলার সংকট কাটেনি। ফলে আমদানি দায় মেটাতে এখনো প্রতি ডলারের জন্য ১২৩ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। আবার কিছু ব্যাংক ঘোষণার চেয়ে বেশি দামে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনছে।
ডলারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক রয়েছে টাকা সংকটে। কারণ, ব্যাংকগুলোকে নগদ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে। আবার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেও তারল্য সংকটে পড়েছে কিছু ব্যাংক। তবে অনেক ব্যাংকের কাছে বাড়তি কিছু ডলার রয়েছে। এই ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে থেকে সমপরিমাণ টাকা নিচ্ছে তারা।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোয়াপ ব্যবস্থা দুপক্ষের জন্যই লাভজনক। কারণ, উদ্বৃত্ত ডলারের বিপরীতে ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাবে। আবার নির্ধারিত সময় পর টাকা ফেরত দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ ডলার পেয়ে যাবে। এ ব্যবস্থার আওতায় সর্বনিম্ন ৫০ লাখ ডলার বা তার সমপরিমাণ টাকা অদলবদল করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোর সাধারণ ব্যাংকিং থেকে অফশোর ইউনিটে ডলার স্থানান্তর বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি মূল ব্যাংক থেকে অফশোর ইউনিটে দেওয়া অর্থ চলতি বছরের মধ্যে ফেরত আনতে বলা হয়েছে। অফশোর ব্যাংকিংয়ে ডলার স্থানান্তর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ব্যবসার জন্য বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে যে ডলার ধার এনেছে, তা ব্যবহার করতে পারছে না। এখন এসব ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে টাকা নিয়ে সেই অর্থ ঋণ হিসেবে দিতে পারছে ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলারের জমা হওয়ায় বাড়ছে রিজার্ভও।