বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাশ গ্রামের ছেলে রনি প্রামাণিক (৩০)। ঢাকার সাভারে রিকশা চালাতেন। সেখানেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। তার সামান্য আয়েই চলত পাঁচ সদস্যের পরিবারের সংসার। গত ২০ জুলাই রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন জীবিকার আশায়। সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। পরদিন তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে দাফন করা হয়।
পরিবারের উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে মা শাহানা বেওয়া (৫৫) এখন হতবিহ্বল। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা স্ত্রী সাথী বেগম। গত সোমবার রনির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা শাহানা বেওয়া তখনো বিলাপ করছেন। বারবার বলছেন, ‘এই দুনিয়ায় আমার আর কেউ রইল না। ছেলেটা ঢাকায় রিকশা চালিয়ে প্রতি সপ্তাহে পাঁচশ টাকা করে বাড়ি পাঠাত। সেই টাকা দিয়ে ওষুধ কিনে খাচ্ছিলাম। আমাকে বলেছিল, মা চিন্তা করো না, তোমাকে বাড়ি করে দেব। আমাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে না। সেই পোলাডারে পাখির মতো গুলি কইরা মারল।’ তিনি বলেন, ‘ঘরে একটা চাল নেই। কে চাল কিনে দেবে। এখন আমার ওষুধ খাবার টাকা দিবে কে।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনে ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ দুদিন রিকশা বন্ধ থাকায় ঘরে ওষুধ ও চাল-ডাল ছিল না। তাই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে ২০ জুলাই দুপুরে রনি রিকশা নিয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যান। কিন্তু সেখানে সহিংসতার মাঝে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
রনির স্ত্রী সাথী বেগম জানান, ছোট ছেলের গায়ে খুব জ্বর ছিল। ওর বাবার শরীরও ভালো ছিল না। আন্দোলনের কারণে দুদিন রিকশা চালাতে না পেরে ঘরেই বসে ছিলেন। কিন্তু ঘরে চাল-ডাল কিছুই ছিল না। এমনকি ওষুধ কেনার টাকাও ছিল না। এ জন্য সকাল ৯টার দিকে মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে বের হন। তিনি বলেন, দুপুর ১২টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানান, তোমার স্বামীর বুকে গুলি লেগেছে। এখন হাসপাতালে আছে। শোনা মাত্র ছোট ছেলে ইভানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর নিথর দেহ দেখতে পাই। তার বুকে, পিঠে অসংখ্য গুলির চিহ্ন ছিল।
প্রতিবেশী ও স্বজনের দাবি, রনির মৃত্যুর সঠিক বিচারের পাশাপাশি সরকার অসহায় এই পরিবারের পাশে দাঁড়ালে তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পাবে।
পঞ্চদাস গ্রামের বাসিন্দা বাবলু সরকার বলেন, চার বছর আগে রনির বাবা মারা গেছেন। তার মা শাহানা খাতুন সরকারি খাসজমিতে ঝুপড়িঘর তুলে খুব কষ্টে বসবাস করছেন। মানুষের দুয়ারে সাহায্য চেয়ে তার জীবন চলে।
বুড়িগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চঞ্চল বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। তবে সরকারি সহায়তা পেলে পরিবারটি কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র তৌহিদুর রহমান মানিক বলেন, ‘নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) নির্দেশে আমরা আমাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা নিয়ে রনির পরিবারের পাশে দাঁড়াব।’
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। এ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’