কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৯ এএম
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কোন পথে হাঁটবেন পুতিন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
কোন পথে হাঁটবেন পুতিন

প্রায় তিন বছর আগে ইউক্রেনে সেনা অভিযানের মধ্য দিয়ে শুধু কিয়েভকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেনকে বিপুল পশ্চিমা সহায়তার বিপরীতে রাশিয়া প্রায় এককভাবে দেশটিতে যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে অনেকটা সফলও তিনি। একের পর এক এলাকা দখল করে যেভাবে যুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী, তাতে অনেকে তাকে এ যুদ্ধে বিজয়ীও ভাবতে শুরু করেছেন। আর নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ যুদ্ধ বন্ধ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাতেও লাভের পাল্লাই ভারী দেখছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার বছরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ও সমঝোতা করার জন্য প্রস্তুত বলে বার্তা দিয়েছেন। এজন্য তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যে কোনো সময় আলোচনায় বসার জন্য প্রস্তুত বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সংশয়ের জবাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের চ্যালেঞ্জও জানিয়েছেন তিনি। শব্দের চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন (হাইপারসনিক) ও নতুন প্রজন্মের রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিকের কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সংশয়ের জবাবে এ চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।

ভ্লাদিমির পুতিন আগে থেকেই বলে আসছেন যে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী। এর জন্য ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলগুলোর দাবি ছাড়তে হবে ইউক্রেনকে। সেই সঙ্গে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ত্যাগ করতে হবে। তবে চলতি বছরের শেষের দিকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে কিয়েভকে হামলার যে অনুমতি দেয় ওয়াশিংটন, তা নিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে পড়ে। রাশিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার পর মস্কো এটাকে ইউক্রেনের নয় বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের হামলা বলে অভিহিত করে। জবাবে রাশিয়াও ইউক্রেনে ওরেশনিক নামে নতুন প্রজন্মের এক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। সেইসঙ্গে পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত নীতিমালার পরিবর্তন করে যুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারেরও অঙ্গীকার করে রাশিয়া। এমন অবস্থায় নতুন করে পারমাণবিক তথা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ঘিরে সবাই যেখানে যুদ্ধ বন্ধের প্রতীক্ষায় রয়েছেন, সেখানে জো বাইডেনের বিদায়বেলায় এভাবে যুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেওয়ায় অনেকে একে আশার আলো নিভে যাওয়া বলে মনে করছেন। বিশেষ করে কয়েকদিন আগে খোদ মস্কোয় শীর্ষস্থানীয় রুশ জেনারেল ইগর কিরিলভ গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে রাশিয়া। এ ঘটনা মস্কোর বড় ধরনের নিরাপত্তা দুর্বলতা বলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। রাশিয়াও সেটা স্বীকার করে নিয়েছে। এ ঘটনার পর রাশিয়ার জনমনে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভীতির সৃষ্টি করেছে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন গত বৃহস্পতিবার বছরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চার ঘণ্টাব্যাপী এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ যুদ্ধ নিয়েই বেশি কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া আলোচনা ও আপস করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এ নিয়ে যে কোনো সময় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত আছেন বলেও জানান পুতিন। একই সঙ্গে অন্য পক্ষও এর জন্য প্রস্তুত রয়েছে কি না, তার দরকারও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় আলোচনা ও আপসের কথা বলে আসছি।’ ইউক্রেন যুদ্ধে বিজয় নিকটবর্তী কি না—এমন প্রশ্নে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, পরিস্থিতি দ্রুততার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। প্রতিদিন রুশ সেনারা এক বর্গকিলোমিটারের মতো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ একটি জটিল বিষয়; কিন্তু আমরা বিশেষ সামরিক অভিযানে আমাদের প্রাথমিক কাজ সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি।’ মস্কোয় শীর্ষস্থানীয় রুশ জেনারেল ইগর কিরিলভ গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যর্থতা ছিল বলেও স্বীকার করেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্পেশাল সার্ভিস (গোয়েন্দা সংস্থা) এটি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মানে আমাদের কাজের আরও উন্নতি করতে হবে। অবশ্যই এ ধরনের সাংঘাতিক ভুল হতে দেওয়া যাবে না।’ গত মাসে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, যদি রাশিয়াকে কোনো দেশ হুমকি দেয়, তাহলে রাশিয়া মনে করে, সেই দেশের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার অধিকার তার আছে। অর্থাৎ পশ্চিমারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পিছপা হবে না রাশিয়া। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা পুতিনের ফাঁকা বুলি। তাদের মতে, এটা সর্বোচ্চ ধরনের ঝুঁকি, যা নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। যেখানে এ মুহূর্তে রাশিয়ার অর্থনীতি আগের চেয়ে বেশ নাজুক। তবে পশ্চিমাদের এ ধরনের দাবিও বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে নাকচ করে দিয়েছেন পুতিন। তিনি বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্বের শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমাদের ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধেরও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। ওরেশনিক নামে নতুন প্রজন্মের যে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালানো হয়, তা নিয়ে পশ্চিমাদের সংশয়ের জবাবে তিনি এ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সংবাদ সম্মেলনে ওরেশনিকের গতি এবং কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংশয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। জবাবে পুতিন বলেন, ‘যেসব পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ওরেশনিকের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, তাদের নিয়োগকর্তাদের উদ্দেশে আমি বলব—আসুন আমরা একটা দ্বৈরথের আয়োজন করি। আপনারা কিয়েভে একটি লক্ষ্যবস্তুকে বাছাই করবেন এবং আপনাদের কাছে সর্বাধুনিক যেসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, সবগুলো মোতায়েন করবেন আর আমরা এখান থেকে আপনাদের বাছাই করা টার্গেটকে লক্ষ্য করে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ব। তারপর দেখুন কী হয়। আমরা এ ধরনের একটি অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। আপনারা (পশ্চিম) প্রস্তুত তো?’

প্রসঙ্গত, বাতাসে শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩৩১ দশমিক ২৩ মিটার। ওরেশনিকের গতি শব্দের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। গত ২২ নভেম্বর প্রথমবার ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। ইউক্রেনের সেনা কর্মকর্তারা জানান, ওরেশনিক ভীষণ শক্তিশালী। এতটাই শক্তিশালী যে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এটির বিধ্বংসী ক্ষমতাকে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) সঙ্গে তুলনা করেন। রুশ সেনা কর্মকর্তাদের দাবি, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিককে প্রতিহত করতে পারে—এমন কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো আসেনি পৃথিবীতে।

পুতিনের এ চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় বসার প্রস্তুতির বার্তা একটি মিশ্র ধারণা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পুতিন বরাবরই বলে আসছেন যে তিনি কোনো আপস করতে রাজি নন অর্থাৎ ইউক্রেনে যে অঞ্চল রাশিয়া দখল করেছে, তার দাবি ছাড়তে হবে কিয়েভকে। অন্যদিকে এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধ বন্ধে আপস করতেও রাজি বলে মন্তব্য করেছেন। তার এই আপসের বিষয়ে ঘোর সংশয়ে পড়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পুতিন আর যাই হোক দখলকৃত অঞ্চল থেকে সরে আসবেন না। তাহলে কীসের আপসের কথা বলছেন তিনি। এটি জানার জন্য ট্রাম্প-পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন এ যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে, যা এখনই তিনি প্রকাশ করতে চান না। দুজনের এ দুই মন্তব্যের আসল তাৎপর্য কী, তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্যাংকে গরুর মাংস খাওয়া নিষেধ, প্রতিবাদে কর্মীদের ‘পার্টি’

ব্যাংকিং টিপস / ঋণ নেওয়ার আগে যেসব চিন্তাভাবনা জরুরি

বাংলা সিনেমায় মুগ্ধ অনুপম খের

ফের ছোট পর্দায় ফিরছেন মধুমিতা

প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট ঔষধি নিম

বিসিবির নির্বাচন জিতলে কী কী পদক্ষেপ নেবেন, জানালেন তামিম

৫০০ সাংবাদিককে ছাঁটাই করছে ট্রাম্প প্রশাসন

ধূমপানের ক্রেভিং কমাতে সাহায্য করে যে ফল

‘ফ্যাসিস্টদের দৃশ্যমান বিচার ছাড়া নির্বাচন উৎসবমুখর হবে না’

স্থানীয়দের সঙ্গে চবি শিক্ষার্থীদের রাতভর সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

১০

টানা তিন জয়ে লা লিগার শীর্ষে রিয়াল

১১

মোদি এখন কোথায়?

১২

আজ থেকে নতুন দামে বিক্রি হবে স্বর্ণ, ভরি কত?

১৩

স্যামসাং টিভি ও মনিটরে আসছে মাইক্রোসফটের 'কোপাইলট' চ্যাটবট

১৪

সৌন্দর্যে ভরে উঠছে ত্রিশালের চেচুয়া বিল

১৫

আজ মুখোমুখি অবস্থানে যেতে পারেন বিএসসি প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীরা

১৬

৩১ আগস্ট : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১৭

সিঙ্গারে চাকরির সুযোগ, থাকবে ভাতাসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড

১৮

টাঙ্গাইলে সাত মাসে সাপের কামড়ের শিকার ৫৩৫ জন

১৯

ব্যাংক এশিয়ায় রিলেশনশিপ ম্যানেজার পদে আবেদন করুন আজই

২০
X