ওয়াহেদুজ্জামান সরকার
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:১৬ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:১৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গাজায় মৃত্যু-অনাহারের দুঃস্বপ্ন কি শেষ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর
গাজায় মৃত্যু-অনাহারের দুঃস্বপ্ন কি শেষ

‘আমার মনে হচ্ছে ১৫ মাস মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে আমি পান করার জন্য কিছু পানি পেয়েছি। আমি আবার জীবিত বোধ করছি। মনে হচ্ছে, মৃত্যু ও অনাহারের দিন শেষ।’ কথাটি ফিলিস্তিনের উত্তর গাজা শহরের আয়া নামের বাস্তুচ্যুত এক নারীর, যিনি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর এভাবে স্বস্তি প্রকাশ করেন। যদিও বাড়ি বলতে সেখানে কিছুই নেই। পুরোটাই ধ্বংসস্তূপ। ১৫ মাসব্যাপী ইসরায়েলি বর্বরতা শেষে গতকাল রোববার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ার মতো বাস্তুচ্যুতরা দলে দলে আপন ঠিকানায় ফিরতে শুরু করেছেন। ধ্বংস ও মৃত্যুর দুঃস্বপ্ন ভুলে আবার নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা।

গাজা উপত্যকায় কয়েক ঘণ্টা বিলম্বের পর স্থানীয় সময় রোববার বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে (৯টা ১৫ জিএমটি) বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গাজায় স্থানীয় সময় রোববার সকাল সাড়ে ৮টায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা হয়নি। কয়েক ঘণ্টা বিলম্বের পর তা কার্যকর হয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর নিজেদের কাছে জিম্মি থাকা তিন ইসরায়েলি নারীকে মুক্তি দেয় হামাস। তিন জিম্মির নাম প্রকাশ করেছেন হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসেম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবেইদা। তিনি বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আমরা তিনজনকে মুক্তি দিয়েছি। তারা হলেন রোমি গোনেন (২৪), এমিলি দামারি (২৮) ও দোরোন স্টেইনব্রিচার (৩১)। তারা এরই মধ্যে নিজ দেশে ফিরেছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মধ্যে ৯০ জনকে মুক্তি দিয়েছে দেশটির সরকার।

এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরাও নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরতে শুরু করেছেন। কিন্তু আপন ঠিকানায় ফিরে শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখতে পাচ্ছেন তারা। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকে আনন্দের কান্না কাঁদছেন। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সাহসও জোগাচ্ছেন। এ মুহূর্তে গাজার প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছেন। বেঁচে থাকার জন্য এখন এটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর রোববার মানবিক সহায়তা বহনকারী বেশ কিছু ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের দাতব্য কর্মকর্তা ও ফিলিস্তিনে নিযুক্ত ওসিএইচএর অন্তর্বর্তী প্রধান জোনাথন হুইটাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কয়েক মিনিট পরই ত্রাণবাহী প্রথম বহরের ট্রাকগুলো গাজায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। মিশর সীমান্তে থাকা শত শত ট্রাক খুব শিগগির গাজায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু গাজার ধ্বংসস্তূপে আরও এক বিপদের বার্তা দিচ্ছে ইসরায়েলের অবিস্ফোরিত বোমা। গাজায় ইসরায়েলের ফেলা হাজার হাজার বোমা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে অবিস্ফোরিত অবস্থায় চাপা রয়েছে, যেগুলো অপসারণ করতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যেতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। লুকিয়ে থাকা এসব অবিস্ফোরিত বোমায় যে কোনো সময় প্রাণ যেতে পারে মানুষের। বিভিন্ন দেশে অবিস্ফোরিত বোমা অপসারণের কাজ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মাইন অ্যাডভাইজরি গ্রুপ’ (এমএজি)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রোগ্রাম) গ্রেগ ক্রোদার মনে করেন, ‘অবিস্ফোরিত এসব বোমা অপসারণ কিংবা নিষ্ক্রিয় করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগবে। খরচ হবে কোটি কোটি ডলার।’ এসব বোমায় হতাহতের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অনেকেই আছেন, যারা যথাযথ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। তারা বাড়িতে যাবেন; একটি ট্রাক ভাড়া করবেন এবং হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করে দেবেন। এসব কাজে অনেক শিশুও হাত লাগাবে, যেটা আরেকটা বড় ভয়ের ব্যাপার।’ একই সময়ে অবশ্য গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনের একটা জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক যাত্রাও শুরু করতে হবে ফিলিস্তিনিদের। কারণ ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজার ১৯ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা থেকে চার কোটি ২০ লাখ টনের বেশি ধ্বংসাবশেষ সরাতে হবে। এতে সময় লেগে যেতে পারে ১০ বছর; আর অর্থ লাগবে প্রায় ৭০ কোটি ডলার।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এই হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি নিহত হন। জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় আড়াইশ জনের বেশি মানুষকে। তাদের মধ্যে অনেককে মুক্তি দিয়েছে হামাস। হামাসের হামলার দিন থেকেই গাজায় নির্বিচারে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অনেক মানুষ। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মসজিদ সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দীর্ঘ ১৫ মাসের এ বর্বরতার মধ্যে গত বুধবার রাতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি হয়। অনেক নাটকীয়তার পর শনিবার রাতে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা চুক্তির অনুমোদন দিলে রোববার থেকে তা কার্যকর হয়। এখানেও অবশ্য নাটকীয়তা থেমে ছিল না। কারণ নির্ধারিত সময়ে তিন ঘণ্টা পর এ চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হয়। গতকাল শুরু হওয়া এ চুক্তি তিন ধাপে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপ ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে। এ ধাপে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস, যাদের মধ্যে সব নারী, শিশু ও ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ রয়েছেন। এ সময় রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় প্রতিদিন ত্রাণ ও চিকিৎসা সামগ্রীবাহী ৬০০ ট্রাক প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। এ ধাপে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করা হবে এবং হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা হবে এবং তৃতীয় ধাপে শুরু হবে গাজার পুনর্গঠন কাজ। এ চুক্তি কার্যকরের পর গাজার অনেকেই নতুন সূর্যের আলো দেখতে পাচ্ছেন। পরিবারের সবাইকে হারিয়েও ধ্বংসস্তূপে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। বাস্তুচ্যুত আয়ার মতো মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার পর কিছু পানি পেয়েছেন তারা। তাদের কাছে মনে হচ্ছে মৃত্যু ও অনাহারের দিন শেষ। কিন্তু আয়ার মতো অবশ্য সবাই এতটা আশাবাদী নন। তাদের অনেকেই বলছেন, ‘ইসরায়েলকে বিশ্বাস নেই। তারা যে কোনো সময় অজুহাত তুলে আবার হামলা শুরু করতে পারে। তারা রক্তপিপাসু। রক্ত ছাড়া তারা কিছু বোঝে না।’ তাদের কথা অবশ্য অমূলক নয়। চুক্তি ঘোষণারও পরও তারা বিভিন্ন অজুহাতে তা বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করে। আর এরই মধ্যে প্রাণ যায় আরও দেড় শতাধিক মানুষের। তা ছাড়া গাজাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবিস্ফোরিত বোমা আরও মৃত্যুর অশনিসংকেত দেয়। কাজেই গাজায় মৃত্যু ও অনাহারের দিন শেষ কি না তা বলে দেওয়ার সময় বোধ হয় এখনো অসেনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিজিটাল মোবাইল জার্নালিজম ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে : উমামা ফাতেমা 

গাজায় ভয়াবহ ক্ষুধা, মানবিক সুনামির আশঙ্কা

চট্টগ্রাম রেলস্টেশন : স্ক্যানার আছে, ব্যবহার জানা নেই

নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা ইরানের, ঘরে ঘরে প্রস্তুতির আহ্বান

চাকরি দিচ্ছে ব্যাংক এশিয়া, চলছে অনলাইনে আবেদন

ছোট্ট তিলেই লুকিয়ে থাকে ক্যানসার বীজ? যা বলছেন চিকিৎসক

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

স্কুল ব্যাগে মিলল ৭ লাখ টাকার জালনোট, গ্রেপ্তার ১

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

জুমার দিন মসজিদে এসে যে ৩ কাজ ভুলেও করবেন না

১০

২৯ আগস্ট : আজকের নামাজের সময়সূচি

১১

যারা অত্যাচার-নির্যাতন করেছে তাদের বিচার হতেই হবে : হুম্মাম কাদের

১২

স্বাস্থ্য পরামর্শ / চোখের লাল-জ্বালা: এডেনোভাইরাল কনজাঙ্কটিভাইটিসের প্রাদুর্ভাব

১৩

ইতালিতে ‘ও লেভেল’ পরীক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সাফল্য

১৪

সাবেক এমপি বুলবুলের পিএস সিকদার লিটন গ্রেপ্তার

১৫

টাকা না পেয়ে ফুপুকে গলাকেটে হত্যা করল ভাতিজা

১৬

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য বিশেষ কোটা বাতিল 

১৭

আন্তর্জাতিক ফেলোশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ছাত্রদলের ঊর্মি

১৮

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেছেন খালেদা জিয়া

১৯

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের মায়ের মৃত্যুতে প্রেস ক্লাবের শোক

২০
X