

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদের (জাকসু) পর এবার ঘণ্টা বাজছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের। শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয় দুটির বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা। বাস্তবসম্মত ইশতেহারের পাশাপাশি ‘আকাশকুসুম’ প্রতিশ্রুতি নিয়েও শিক্ষার্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন প্রতিনিধিরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রমরমা নির্বাচনী আমেজে।
রাকসুর তপশিল অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার রাত ১০টা পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রচার চালাতে পারবেন। শেষ মুহূর্তের এ তাড়া রেখে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের জমজমাট প্রচারে মুখর অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, মেস ও আড্ডাস্থল। প্রার্থীরা দলবেঁধে শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন, করছেন কুশল বিনিময়, হাতে তুলে দিচ্ছেন লিফলেট ও হ্যান্ডবিল। শিক্ষার্থীরাও হাসিমুখে সেসব গ্রহণ করছেন।
এরই মধ্যে সোমবার ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কেন্দ্রীয় নবীনবরণ ঘিরে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে ছিল প্রার্থীদের প্রচারের কেন্দ্রস্থল। বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের আকর্ষণীয় লিফলেট ও হ্যান্ডবিল নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন এসব নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে।
ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেন, ‘বিশেষ করে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা আমাদের ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। কারণ তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আমাদের প্যানেলের বৈচিত্র্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে এবং ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজা বলেন, ‘প্রচার শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছি, তারা আমাদের কথা শুনছেন এবং তাদের সমস্যাগুলো শেয়ার করছেন।’
গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদের ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা লিফলেট সাদরে গ্রহণ করছেন, আমাদের সংগ্রাম চিনছেন ও মূল্যায়ন করছেন।’
প্রচার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া সিদ্দিকী রিমি বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান যে, আমাদের সময় রাকসু হচ্ছে। প্রার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন—এটা সত্যিই ভালো লাগছে। এক বছরের মধ্যে প্রায় অসম্ভব, এমন প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের কাছে আসছেন। আকাশকুসুম হলেও শিক্ষার্থীবান্ধব দিকগুলো নিয়ে তারা ভাবছেন, এটা অনেক বড় ব্যাপার।’
এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. এফ. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে দুই হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন থাকবে। নির্বাচন কমিশনের একটি বিশেষ টিমও মাঠে কাজ করবে; কোনো প্রার্থী বা প্যানেল আচরণবিধি ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ‘আমরা খুবই আশাবাদী। নির্বাচনী পরিবেশ সুন্দর ও উৎসবমুখর। শিক্ষার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই প্রচার চালাচ্ছে—এটা প্রশংসনীয়। ছোটখাটো ব্যত্যয় ঘটলেও বড় কোনো সমস্যা হয়নি।’
এদিকে চাকসু নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের প্রচারে সরগরম চবি ক্যাম্পাস। আগামীকাল বুধবার সকাল থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ। গতকাল সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত ছিল আনুষ্ঠানিক প্রচারের শেষ সময়। এর আগ পর্যন্ত ভোটারদের মন জয় করতে মরিয়া বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা।
এদিন সকাল থেকেই স্টেশন, ঝুপড়ি, মূল ফটকসহ, বিভিন্ন অনুষদে প্রার্থীদের পদচারণায় সরব হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। লিফলেট হাতে হাসি মুখে প্রচারের শেষ দিনেও যেন উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে।
চবিতে প্রচলিত প্রচারের ধারার বাইরে দেখা গেছে কিছু অভিনব আয়োজন। কেও স্কেটিং করে প্রচার চালাচ্ছেন, কেউ আবার চার্লি চ্যাপলিন সেজে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রচার চালাচ্ছেন। এতে ভোটারদের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনি নির্বাচনী আমেজে যুক্ত হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘ বিরতির পর এমন নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তারা এমন নেতৃত্বই চান, যারা সত্যিকারের শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করবেন।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে ভিপি পদপ্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, ‘আমরা সকাল থেকেই প্রচার চালাচ্ছি। শেষ দিন হিসেবে আমরা রাত পর্যন্ত প্রচার চালাব। আমরা অনেক আশাবাদী এবং আমরা অনেক সাড়া পাচ্ছি।’ তবে নির্বাচন নিয়ে দেওয়া অভিযোগগুলো আদৌ সমাধান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে প্রশাসন থেকে না জানানোয় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে খানিকটা সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘প্রচারের শেষ মুহূর্তে প্রার্থী ও শিক্ষার্থী সবাই চাকসুকেন্দ্রিক আলাপ-আলোচনা করছেন। ক্যাম্পাসে উৎসবের অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে যা বিগত সময়ে ভাবাও অসম্ভব ছিল।’
স্বতন্ত্র দপ্তর সম্পাদক প্রার্থী তাহসান হাবীব বলেন, ‘সকাল থেকেই আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছি। যেসব জায়গায় আমি নিজে যেতে পারছি না, সেখানে আমার ছোট ভাই ও বন্ধুরা প্রচারে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ এখন পর্যন্ত বেশ ভালো।’
‘বৈচিত্র্য ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ধ্রুব বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা ঝুপড়ি থেকে শুরু করে ট্রেন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচার চালিয়েছি। আমরা চেয়েছি সবার অংশগ্রহণ, তাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল ব্যালটের বিষয়টি প্রশাসনের কাছে উত্থাপন করেছি।’
এদিকে চাকসু নির্বাচনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভোটদানের সুবিধার্থে আলাদা কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় তাদের জন্য আলাদা একটি ভোটগ্রহণ সেন্টার করা হবে। গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনার ও সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলোচনাক্রমে এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটাররা ভোটদানের সুবিধার্থে একটি আলাদা ভোটগ্রহণ সেন্টার করা হবে।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ওই নির্বাচন কেন্দ্রে সব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারের ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচনী কর্মকর্তার সঙ্গে নির্বাচন কক্ষে ভোট প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনার সার্বিক তত্ত্বাবধান করবেন।’
মন্তব্য করুন