আহমেদ সারজিল, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

খাতুনগঞ্জে ডিও ব্যবসার আড়ালে ‘স্লিপ বাণিজ্য’

প্রতারণার অভিযোগ
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। ছবি : কালবেলা
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। ছবি : কালবেলা

দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এলাচসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্যে এখন ডেলিভারি অর্ডারের (ডিও) বা ‘স্লিপ বাণিজ্য’-এর খপ্পরে পড়েছে। প্রথাগত ব্যবসার আড়ালে চলছে এক ধরনের ‘জুয়া খেলা’, যেখানে প্রকৃত পণ্য ছাড়াই শুধু কাগজের হাতবদলে এলাচের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি আস্থার সংকটে পড়েছে শতবর্ষী এই বাণিজ্য কেন্দ্র।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরির্তনের পর এই চক্রের হোতারা গা ঢাকা দিলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। খাতুনগঞ্জে বর্তমানে ভোজ্যতেল, চিনি বা গমের ক্ষেত্রে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ছাপানো ডিও থাকলেও এলাচ মূলত কেনাবেচা হচ্ছে সাদা কাগজের একটি স্লিপের মাধ্যমে। এসব স্লিপে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম, সিল বা স্বাক্ষর থাকে না; শুধু পণ্যের নাম ও দাম লেখা থাকে। ব্রোকারদের মাধ্যমে এই স্লিপগুলো এক সপ্তাহ থেকে এক মাস মেয়াদে বারবার হাতবদল হয়। দেখা যায়, কোনো বিক্রেতার কাছে হয়তো ১০০ টন এলাচ আছে; কিন্তু তিনি বাজারে ৫০০ টনের স্লিপ ছেড়ে দিয়েছেন। শেষে যখন খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্য ডেলিভারি নিতে যান, তখন বিক্রেতা আর পণ্য দিতে পারেন না। আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই কয়েক দফা হাতবদলের ফলে বাজারদর ‘হাওয়ার ওপর’ ওঠানামা করে।

খাতুনগঞ্জের এই স্লিপ বাণিজ্যের আড়ালে সম্প্রতি বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। সোনা মিয়া মার্কেটের ‘নূর ট্রেডিং’য়ের মালিক নাজিম উদ্দিন এলাচ সরবরাহের নামে ব্যবসায়ীদের অন্তত ৭৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। প্রায় ১২টি আড়তদার প্রতিষ্ঠান এই প্রতারণার শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, অধিক লাভের আশায় তারা স্লিপের মাধ্যমে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত না পেয়েছেন টাকা, না পেয়েছেন পণ্য। এর আগে আব্দুর রহিম নামে এক ব্যবসায়ীও প্রায় ৮ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হন, যা বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করে।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, খাতুনগঞ্জের ডিও ব্যবসা এখন আর প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে নেই। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার অব্যবসায়ী এই স্লিপ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী কিংবা বিদেশফেরত অনেকেই নগদ টাকার লোভে কোনো গুদাম বা আড়ত ছাড়াই স্রেফ কাগজের লেনদেনে যুক্ত হচ্ছেন। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই এলাচের মতো পণ্যের দাম আমদানিকারক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানের খবর পেলে অসাধু এ চক্র দ্রুত দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যায়।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম কালবেলাকে বলেন, ‘ডিও ব্যবসা এখন আর প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে নেই। এখানে একটি বড় চক্র ছিল, তারা বর্তমানে কেউ নেই। যার ফলে বহুগুণে কমে গেছে এই ডিও ব্যবসা।’

আল্লাহর দান স্টোরের মালিক জুয়েল বলেন, ‘ডিও ব্যবসার কারণে বাজারে প্রথমে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এরপর কয়েক দফায় স্লিপ হাতবদল হলে হঠাৎই এলাচের দাম কমে যায়। ফলে এই চেইনে যারা ছিল তাদের মধ্যে সর্বশেষ জন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বর্তমানে এই ব্যবসা এখনো চলমান আছে। তবে খুবই গোপনে।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় সোনা মিয়া মার্কেটসহ খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে। তবে স্লিপগুলোতে কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি না থাকায় দোষীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে গেলে তারা সরাসরি দাবি করে, সাদা কাগজের ওই স্লিপ তাদের নয়। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

গত চার দশকে ডিও ব্যবসার আড়ালে খাতুনগঞ্জে হাজার কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও আস্থার ওপর ভিত্তি করে চলা এই বাজারে এখন লেনদেন কমে গেছে। নব্বইয়ের দশকে যেখানে দৈনিক লেনদেন ছিল দেড় হাজার থেকে ২ হাজার কোটি টাকা, এখন তা কয়েকশ কোটিতে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এলাচসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে এই নামসর্বস্ব ‘স্লিপ বাণিজ্য’ বন্ধ করে সরাসরি পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘এই ডিও ব্যবসার কারণে পণ্যের দাম বাড়ে। ধরেন একটি স্লিপ পাঁচবার হাতবদল হলো। এতে করে ওই পাঁচজনই কিন্তু কিছু না কিছু লাভ করেছে। আমি যদি কেজিপ্রতি ৫ টাকা ধরি, তাহলে আমার একটি পণ্যের দাম ২৫ টাকা বেড়েছে। অথচ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে গেলে তারা সরাসরি দাবি করে, সাদা কাগজের ওই স্লিপ তাদের নয়। ফলে প্রশাসনও কিছু করতে পারে না।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব দেখা যাচ্ছে এখনই

ইসির কাঠগড়ায় দ্বৈত নাগরিকত্ব

আর্টেমিস-২ মিশন / ৫০ বছর পর চাঁদে মানুষ পাঠাতে প্রস্তুত নাসা

পাম্পে শ্রমিক হত্যার অভিযোগ, ‘সুজন যুবদলের কেউ নয়’

আইসিএমএবি’র নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

গাজার জন্য গঠিত বোর্ড অব পিসে আমন্ত্রণ পেলেন যারা

লামিন বনাম রিয়াল: স্পেন শিবিরে বাড়ছে অস্বস্তি

রক্ত লাগলে রক্ত দেব: সারজিস

‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে জুলাই যোদ্ধাদের দেখাশোনার জন্য বিশেষ বিভাগ খুলবে’

চবি ২৮ ব্যাচের ফুটবল উৎসব অনুষ্ঠিত

১০

পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয় : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

১১

জয় দিয়ে বিশ্বকাপ বাছাই শুরু বাংলাদেশের 

১২

‘উদ্ভাসিত গোসাইরহাট ফাউন্ডেশন’-এর শীতবস্ত্র বিতরণ

১৩

এইচএসসি পাসেই আবুল খায়ের গ্রুপে বড় নিয়োগ

১৪

শীত আবার বাড়বে কি না জানাল আবহাওয়াবিদ

১৫

দুই জোড়া ভাইকে নিয়ে ইতালির বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

১৬

আগামী ৫ দিন কেমন থাকবে শীত

১৭

নুরুদ্দিন অপুর উপহারের ক্রীড়াসামগ্রী পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা

১৮

মেয়ের নাম প্রকাশ করলেন রাজকুমার-পত্রলেখা

১৯

‘গণঅভ্যুত্থানে যাদের ভূমিকা নাই, তারাই নানা আকাঙ্ক্ষার কথা বলে’

২০
X