

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে শতাধিক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। সিন্ডিকেট সভার পরদিন এ নিয়োগ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় শুরু হয়। নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন শিক্ষার্থীরা। একই দিন আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে আসেন চাকসুর কয়েকজন নেতা। এর আগে তিনি তিনটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করলেও সিন্ডিকেট বিশাল নিয়োগের পরদিনই তাকে হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে নেওয়ার পেছনে নিয়োগ থেকে সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর পরিকল্পিত চেষ্টা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এদিকে চবির সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে হেনস্তার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক হেনস্তার আগের দিন শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে ১০৫ জনের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে শিক্ষক ১৮ জন, কর্মকর্তা সাতজন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৩৩ জন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৪৭ জন। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমও রয়েছেন।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢালাওভাবে নিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। সিন্ডিকেটের পরদিনই শিক্ষক হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। দুটি বিষয়ই উদ্বেগজনক। অনেকে বলছেন নিয়োগ থেকে দৃষ্টি সরাতে হেনস্তা ঘটনা ঘটেছে। আমরা কোনো বিষয়কেই উড়িয়ে দিচ্ছি না।
ছাত্রদলের প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক কালবেলাকে বলেন, ‘এর আগেও উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য রোমান শুভর (হেনস্তার শিকার সহকারী অধ্যাপক) সঙ্গে চেয়ার শেয়ার করেছিলেন। আমরা অতীতের ঘটনার বিচার চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রশাসনের সদিচ্ছা দেখিনি। প্রশাসনের শেল্টারেই তিনি পরীক্ষার ডিউটি করছেন। একদিকে চাকসু তাকে ধাওয়া করছে, অন্যদিকে প্রশাসন দায়িত্ব দিচ্ছে এটা এক ধরনের দ্বিচারিতা। এ ধরনের শিক্ষকদের প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। নিয়োগ ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমনিতেই সমালোচিত। উনি আগেও তিনদিন ভর্তি পরীক্ষার ডিউটি করেছেন। কিন্তু চতুর্থ দিন তার সঙ্গে এ ঘটনা হলো। এর পেছনে সাম্প্রতিক নিয়োগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
এক ফেসবুক পোস্টে আইয়ুবুর রহমান তৌফিক আরও লেখেন, ‘আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে এবং তার বিচার হওয়া প্রয়োজন। তবে যেভাবে চাকসু নেতারা তাকে আটক করেছেন, তা দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনলে একই সঙ্গে অভিযুক্ত অন্য শিক্ষকদের বিচারও নিশ্চিত করা যেত।’
শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘একটা বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অন্য ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা জামায়াত-শিবিরের কৌশল। ওরা একটা অপকর্মকেই আড়াল করার জন্য অন্য একটা অপকর্ম হাইলাইট করে থাকে। রোমান শুভর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আছে, দেশের আইন আছে, আদালত আছে।’
তবে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘আমরা শিক্ষককে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেছি, তাকে কোনো আঘাত বা হয়রানি করা হয়নি। বিষয়টি আইনগতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে হাটহাজারী প্রশাসন মামলা নেয়নি। আমরা আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম এমন একজন শিক্ষককে কীভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে, তা জানতে। তখন তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমরা তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসি।’
তিনি বলেন, ‘নিয়োগের বিষয়টি প্রশাসনের দেখার বিষয়, তারা বলছে নিয়োগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনকে অবশ্যই দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা হবে। নিয়োগ আড়াল করার জন্য আমরা কিছু করিনি। এর আগেও আমরা এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি এবং স্মারকলিপি জমা দিয়েছি।’
শিক্ষকদের নিন্দা, প্রতিবাদ: হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্তার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এ ঘটনার বিচারও দাবিও উঠেছে। ঘটনার প্রতিবাদে চবি শিক্ষকসহ অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
চবির যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আর রাজী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সম্মতি ছাড়া কাউকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া অপহরণ। অপরাধী হলেও কোনো শিক্ষক বা কোনো মানুষকে জোরপূর্বক কোথাও নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।’
ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জি এইচ হাবীব ফেসবুকে হেনস্তার ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, ‘একজন শিক্ষক ও বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি এই আগ্রাসী ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা থাকতে পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এমন পদক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য।’
শিক্ষক হেনস্তার প্রতিবাদ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে জয়লাভের পর ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতি ও শিক্ষক নিপীড়নের প্রবণতা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে পারবে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
মন্তব্য করুন