

যার জন্ম ইতিহাস পড়ার জন্য নয়, হয়েছিল ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য। যার জীবন শুধু বেঁচে থাকার জন্য, দেশের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার জন্য। যার ভালোবাসা নিজ কিংবা শুধু পরিবারের জন্য নয়—ছড়িয়ে পড়েছিল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মাটি-মানুষ, নদী-নালা, হাওর-বিল, পাহাড়-সমুদ্র আর তরুলতার ওপর, তিনিই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। যিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’। তার সেই কালজয়ী উক্তি আজ বিশেষ করে মনে পড়ে বিএনপির নির্বাচনমুখী প্রচারণা দেখে। তারই পবিত্র রক্তবাহী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে ধারণা এরই মধ্যে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেটি তো তার মরহুম পিতা শহীদ জিয়ারই মতাদর্শ। তাই রাষ্ট্রপতি জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ এ লেখায় এ প্রসঙ্গটি না টেনে পারা গেল না।
মেজর জিয়া। বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে শুরু করে এর স্থিতিশীলতা অতঃপর আধুনিকতার পথে যাত্রা সবখানেই এ নামটি জড়িয়ে রয়েছে। একাত্তরে তিনি যদি বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিতেন, তাহলে স্বাধীনতা পেতে হয়তো আমাদের আরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। তার সেই ঐতিহাসিক ‘উই রিভোল্ট’—আজ একটি নতুন বাংলাদেশের সৃষ্টি। ৫৪ বছরের বাংলাদেশ। যেই বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে, একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নিয়ে যেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে এবং বিশ্বের বুকে গড়ে তুলেছে তার নিজস্ব পরিচয়।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং পরদিন মহান স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে আধুনিক ও উৎপাদনমুখী বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে জিয়ার অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। জিয়ার সততা, দেশপ্রেম, দেশের কল্যাণ সাধনে একাগ্রতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল এক ঈর্ষণীয় বিষয়। এসব গুণাবলি তাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জিয়ার এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা বাংলাদেশবিরোধী শক্তির সহ্য হয়নি। তাই আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রে দেশি-বিদেশি যোগসাজশে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে কতিপয় বিপথগামী সৈন্যের হাতে জিয়া শাহাদাত বরণ করেন। তার বয়স ছিল মাত্র ৪৫!
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি এই মহান নেতা জন্মগ্রহণ করেন। ক্ষণকালের অথচ বর্ণিল এ জীবনে জিয়া এ দেশের মানুষের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, মানুষের কল্যাণ সাধনে যেভাবে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিরলস ছুটে বেড়িয়েছেন; তাতে তার দেশপ্রেমের পূর্ণ পরিচয় মেলে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা, মহান স্বাধীনতার ঘোষণা, সিপাহি জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জনতার জিয়ায় রূপান্তর, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দর্শনের প্রবর্তন, আধুনিক ও উৎপাদনমুখী বাংলাদেশ গড়ার মেনিফেস্টো তথা ১৯ দফা রচনার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে জিয়া এ দেশের জনতার মাঝে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
মুজিব আমলের দুঃশাসন সৃষ্ট ভঙ্গুর অর্থনীতি ও পরবর্তী নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে আসা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আজন্ম লড়াকু জিয়া সেই চ্যালেঞ্জটা নিলেন। উৎপাদনমুখী রাজনীতির সূচনার মাধ্যমে জিয়া পূর্বেকার শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পদদলিত করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফের বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেন। সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে, বিপৎসংকুল পথ মাড়িয়ে তিনি একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা করলেন।
একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জিয়াউর রহমান গ্রামমুখী অর্থনীতির ওপর জোর দেন। উপসামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামমুখী অর্থনীতি গড়ার আহ্বান জানিয়ে জিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশ অর্থ গ্রাম। বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য আমাদের গ্রাম ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন করতে হবে।’ গ্রামীণ জনজীবনের সার্বিক উন্নতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ‘গ্রামের নিরক্ষর ও দরিদ্র মানুষের দ্বারে আমাদের সভ্যতার বাণী নিয়ে যেতে হবে। তাহলেই বলতে পারব যে, বাংলাদেশের উন্নতির জন্য আমরা কাজ করেছি।’
খাল খনন কর্মসূচি ছিল জিয়ার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান যশোরের উলশি-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্প হাতে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের কৃষিভিত্তিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সেচের পানির অপ্রতুলতা দূর করতে দেশব্যাপী ১৪ হাজার খাল খনন করেন।
শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্য। একটি সময়োপযোগী অন্তর্বর্তী শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ১৯৭৮ সালে প্রফেসর মুস্তফা বিন কাসিমের নেতৃত্বে তিনি একটি জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন। উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শহীদ জিয়া ঢাকায় একটি ‘জাতীয় শিক্ষা ওয়ার্কশপ’ আয়োজন করেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সারা দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষাকর্মী এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার প্রসারে গ্রন্থাগারকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ‘থানা পাবলিক লাইব্রেরি কাম অডিটোরিয়াম স্থাপন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
আজ সেই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্মদিন। ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে মহাপুরুষদের প্রায় সবাই ছিলেন ক্ষণজন্মা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও তেমনই একজন। তার শাহাদাতের পর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই পথ হারায়। তবে আশার কথা, তারই উত্তরাধিকার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান পিতার দেখানো পথেই হেঁটে চলেছেন। দেশ এবং দেশের মানুষকে নিয়ে তার চিন্তা, পরিকল্পনায় রয়েছে নিখাদ দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতার ছোঁয়া। মা বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির এই ধারকই যে আগামী দিনের কান্ডারি—তা এখন আর ধারণা নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
মন্তব্য করুন