

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানিদের আক্রমণের বিভীষিকার সামনে প্রথম বিদ্রোহ করা সেনাকর্মকর্তার নাম জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পোশাক পরে তাদের চায়নিজ রাইফেল হাতে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে We Revolt বলার মতো সাহসী দেশপ্রেমিক হতে যে বুকের পাটা প্রয়োজন, তা বিরল। সেদিন সৈন্যদল নিয়ে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে রেললাইন ধরে কালুর ঘাটে যাবার পথে সৈনিকরা জানতে চাইছিল স্যার! বেগম সাহেবাকে বলে গেলেন না! জিয়ার পালটা জিজ্ঞাসা। তুমি বলে যাচ্ছ! না, স্যার! আমার পরিবার তো এখানে নেই। তুমি যখন বলে যাচ্ছ না, তখন আমার বলারই বা দরকার কী? চলো! পরিবারের কাছে মাস খরচের টাকাটাও দেয়া হয়নি। তখন তো সবে ২৫ তারিখ বেতন হবার সুযোগ কোথায়। স্ত্রী আর অসহায় দুটি শিশুকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে আবারও রেডিওর ঘোষণা, আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনত| ঘোষণা করছি। এই বেতার ঘোষণার অর্থ কতটা উপলব্ধি করি আমরা। এই ঘোষণার গভীরতায় নাই বা গেলাম শুধু এই ঘোষণার পরিণতিতে অবধারিত কোর্টমার্শাল মৃত্যুদণ্ড আর পরিবারের জন্য নিদারুণ অনিশ্চয়তা-তবুও সাহসের এতোটুকু ঘাটতি তো ছিল না তাঁর মাঝে। এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই পাল্টা বিমান আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে বেতার কেন্দ্র। আবারো অনিশ্চিত যাত্রা সৈন্যদল নিয়ে। কোথায় যাবেন? কোন দেশে? আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি তাদেরকে আকারে ইঙ্গিতে কোন আগাম নির্দেশনা দিয়েছিলেন? ইতিহাস তো সেটা বলে না। পরে ১নং সেক্টরের কমান্ডার হয়েছিলেন কিন্তু জানতেন এই সমতল বাংলাদেশ গেরিলা যুদ্ধে চূড়ান্ত সফলতা অসম্ভব। তাই হাজারো প্রতিকূলতা অতিক্রম করে গড়েছিলেন প্রথম ব্রিগেড 'জেড ফোর্স' তাঁর নেতৃত্বে কামালপুরে যুদ্ধ, রৌমারীতে মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি-এসব ইতিহাসকে যারা আবদ্ধ রাখতে চান তারা বোকার স্বর্গের অধিবাসী।
স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরত্ব আর সক্ষমতা দেখানোর পাশাপাশি তাঁর প্রাপ্য সেনাপ্রধানের পদবঞ্চিত হলেও নীরবে মেনে নিয়েছেন শৃঙ্খলার সাথে। গুরুত্বহীন উপ-প্রধান হয়েও সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন অবদান রাখতে। দেশে যখন নকলের মহোৎসব তখন ক্যাডেট কলেজগুলোর গভর্নিং বডির প্রধান হিসাবে শিক্ষার মানে এতোটুকু ছাড় দেননি জাতি আজো সেটার ফল ভোগ করছে। সাত নভেম্বর ইতিহাসের আরেক ক্রান্তিকালে নেতৃত্বশূন্য দেশকে দেখিয়েছেন আলোর দিশা। একাত্তরের স্বাধীনতা ঘোষণার মতো। হেনরি কিসিঞ্জার Basket case আর আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বলা 'তিন বছর কিছুই দিবার পারবো না' বিপরীতে তিনি দেশকে দিয়েছেন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা মুক্ত করেছেন গণতন্ত্র। অর্থনীতিকে দিয়েছেন দিশা-তাঁর দেখানো পথে তৈরি পোশাক রপ্তানি আর বিদেশের শ্রমবাজার থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পথ ধরে যে অর্থনীতি আজ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে টিকে আছে সেখানে আমরা অতিরিক্ত আর কোন কিছুকে যুক্ত করতে পেরেছি কি? তাঁর মন্ত্রিসভায় সংযুক্ত হয়েছেন অরাজনৈতিক এমনকি ভিন্ন মতাদর্শীরাও শুধুমাত্র তাঁর দেশপ্রেমের বিশুদ্ধতার সম্মানে। তাই অধ্যাপক আবুল ফজল, অধ্যাপক ইব্রাহীম, অধ্যাপক শামসুল আলম, ড. ফজিউদ্দীন মাহতাবরা তাঁর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র আর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বিএম আব্বাস পানিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি করতে পারেন। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয় জাপানকে পরাজিত করে।
রাজ্যের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি স্বজনপ্রীতির সামান্যতম কালিমা তাঁর গায়ে লাগতে দেননি। ছোট চাচা কর্নেল ডা. মমতাজুর রহমানের উৎসাহে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সবিনয়ে তাকে বলেছিলেন, তাঁর বাসায় বেশি না আসতে। শৈশব থেকে একসাথে চলা নিকটাত্মীয়রাও বাসায় সামান্য সৌজন্য উপহার নিয়ে গেলে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করতেন। তাঁর আপন ছোট ভাই মিজানুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা। গ্যারেজের দোতলায় ভাড়া থাকতেন। তিনি তাঁর প্রাপ্য পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বারবার শুধুমাত্র প্রেসিডেন্টের ছোট ভাই পদোন্নতি পেলে স্বজনপ্রীতির ভ্রুকুঞ্চন হতে পারে। এই আশঙ্কায় যদিও তিনি নিজেই ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। আপন ছোট ভাই অকৃতদার আহমেদ কামাল ছিলেন পর্যটন কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা— যে সময় ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জানতেন না সে কথা। তাঁর বড় ভাই রেজাউর রহমান ছিলেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা সাবেক নৌপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিরপুরের এক সাধারণ বাড়িতে জীবনযাপন করেছেন। তার আপন চাচাতো ভগ্নিপতি যে এয়ার ভাইস মার্শাল খন্দকার আবুল বাশার সেকথাই বা জানে কয়জন। কিশোর তারেক আর আরাফাতের ভাগ্যে নতুন জামা-কাপড়ের সৌভাগ্য তেমন হয়নি। বেশিরভাগ সময় জুটেছে বাবার পুরনো শার্ট, প্যান্টের কাটছাট করা পরিধেয়। রাষ্ট্রীয় সফরে একান্ত বাধ্য না হলে বেগম জিয়াকেও সঙ্গে নেননি কখনো। তারেক আরাফাতের তো প্রশ্নই ওঠে না। একবার নেপালের রাজা ধীরেন্দ্র তার ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ফিরতি সফরে যাবার কথা প্রেসিডেন্ট জিয়ার কিশোর তারেকের আবদার নেপালের রাজার ছেলে বাংলাদেশে আসলে সে কেন নেপালে যেতে পারবে না। জিয়ার সাফ জবাব, তুমি কোনো রাজার ছেলে নও। শৈশব থেকে আদর্শ আর সততার এমন শৃঙ্খলার মাঝে বড় হওয়া তারেক রহমানের মাঝে যারা বিলাসিতার গন্ধ খোঁজেন তাদের জন্য কেবল করুণা।
রাষ্ট্র পরিচালনার তৃণমূলের খবর নিতে গভীর রাতেও জেলা প্রশাসকদের নিজেই ফোন করতেন। জেলা পর্যায়ে সফরে গেলে সার্কিট হাউসের বাবুর্চির হাতে নিজে টাকা দিয়ে বলতেন, ডাল-সবজি আর ছোট মাছ ভাতের সাথে যদি কোনো কর্মকর্তা এর বাইরে কিছু করতেন তাহলে সেটা শুধু প্রত্যাখ্যাতই হতো না বরং মাঝরাতে বাবুর্চিকে ডাল রান্না করতে হতো নতুনভাবে। সফরে গেলে নিজ হাতে কাপড় ধুয়ে সারারাত শুকিয়ে সকালে আবারো পরতেন। প্রেসিডেন্টের স্যুটের দৈন্যদশা দেখে যদি কখনো কেউ নতুন স্যুট কোর্টের ব্যবস্থা করেছে তবে তাকে সে টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য করতেন। বিদেশে প্রাপ্ত সফল উপহার সরাসরি জমা দিতেন রাষ্ট্রীয় তোষাখানায় ।
বঙ্গভবন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বলে খরচ কমাতে সেনাউপ-প্রধানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণহীন বাড়িতে থেকেছেন আমৃত্যু। প্রেসিডেন্ট হবার পর একবার জন্মভূমি বগুড়ার বাগবাড়িতে গিয়ে খুঁজে বের করেন শৈশবের শিক্ষক পণ্ডিত মজিবর রহমানকে। প্রকাশ্যে শত মানুষের সামনে কদমবুছি করে সম্মান জানালেন শিক্ষককে। শিক্ষক সাহস পেয়ে বলেছিলেন, বাবা শহরে যাতায়াতে আমাদের সমস্যা হয় খাউরা বিলের উপর ব্রিজটা যদি করে দিতে। প্রেসিডেন্ট বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, স্যার! কিছু মনে করবেন না। আমার গ্রামে যাওয়া-আসার ব্রিজটা হবে দেশের শেষ সেতু। সবগুলো ব্রিজ তৈরি শেষ হলে। এমনি মানুষ জিয়াউর রহমান। নেতৃত্বে আর ভবিষ্যদর্শিতা যদি কোনো রাষ্ট্রনায়কের অত্যাবশ্যক গুণাবলি হয় আর এ দেশে যদি একজনও তেমন মানুষ জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তার নাম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল
মন্তব্য করুন