দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কারখানা মালিকরা বলছেন, নির্ধারিত মজুরি ওভারটাইমসহ একজন শ্রমিক মাস শেষে ১৭ থেকে ২১ হাজার টাকা পাবেন। গত ১১ নভেম্বর নিম্নতম মজুরির খসড়া প্রজ্ঞাপন জারি করার পর আজ সোমবার (১৩ নভেম্বর) খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন মজুরি বাস্তবায়ন মালিকদের জন্য কঠিন হলেও শিল্পের স্বার্থে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে তারা সেটি বাস্তবায়ন করবেন বলে জানিয়েছেন।
অপরদিকে শ্রমিক, খাত সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন ও বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত বেতনে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ব্যয় মেটানো কষ্টকর হবে। ফলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এখনো মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে দাবি তাদের।
এ ছাড়া নতুন মজুরি প্রত্যাখ্যান করে ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করছে শ্রমিকরা। গত অক্টোবর থেকে গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার ও মিরপুরে কারখানা ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এ ছাড়া ঘটনায় বেশকিছু কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকরা। অপরদিকে কারখানায় হামলার ঘটনায় শ্রমিক ও অজ্ঞতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩২টি মামলায় ২০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে এবং অন্তত ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর এ ঘটনায় রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষে জড়িতদের খুঁজে বের করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা গেছে, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য গত এপ্রিল মাসে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ৬টি সভা করে বোর্ড সদস্যরা। এর মধ্যে শ্রমিক পক্ষ নিম্নতম মজুরি ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা এবং মালিক পক্ষ ১০ হাজার ৪০০ টাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর চূড়ান্ত সভায় মালিক পক্ষ দুই হাজার ১০০ টাকা বৃদ্ধি করে সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি প্রস্তাব করে। যা বোর্ডে সব পক্ষের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিম্নতম মজুরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ভিত্তিতে ১১ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। এ বিষয়ে কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বোর্ডে দাখিল করতে পারবে। যা শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। আর আপত্তি না থাকলে বোর্ড আগামী ৫ বছরের জন্য শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, নতুন মজুরি কাঠামোতে প্রাথমিক পর্যায়ের একজন শ্রমিকের বেসিক বেতন ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ টাকা, বাসা ভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা খরচ ৭৫০ টাকা, যাতায়াত খরচ ৪৫০ টাকা, খাদ্য বাবদ ১ হাজার ২৫০ টাকা। গ্রস বা মোট হিসাবে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। যা ২০১৮ সালের মজুরি কাঠামো থেকে যথাক্রমে বেসিক ও বাসা ভাড়ায় ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ, চিকিৎসায় ২৫ শতাংশ, যাতায়াত ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, খাদ্য ৩৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং মোট গ্রস হিসাবে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ওভারটাইম হিসেবে ২০১৮ সালের তুলনায় প্রতি ঘণ্টায় ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ হিসাবে ২৫ টাকা বেড়ে ৬৪ টাকা ৪২ পয়সা হয়েছে।
বিজিএমইএ দাবি করছে, প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো একজন শ্রমিক প্রতি মাসে ৫২ ঘণ্টা ওভারটাইম কাজ করলে মাস শেষ ৩ হাজার ৩৭৮ টাকা এবং ৭৮ ঘণ্টা ওভারটাইম কাজ করলে ৫ হাজার ২৫ টাকা এবং মাসে সর্বোচ্চ ১০৪ ঘণ্টা কাজ করলে ৬ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত ওভারটাইম হিসেবে পাবেন।
ফারুক হাসান বলেন, এ ছাড়া শ্রমিকরা তাদের বার্ষিক অর্জিত ছুটির ৫০ শতাংশ নগদ উত্তোলন করতে পারে। যদিও কারখানাগুলো সাধারণত অর্জিত ছুটির পুরোটাই পরিশোধ করে। শ্রমিকদের এখন প্রতি ১৮ দিনে ১ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল ২২ দিনে ১ দিন। এ হিসাবে বছরে ১৬ দিনের অর্জিত ছুটির জন্য এক দিনের মোট বেতনের হারে দেওয়া হয় অর্থাৎ ১২ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে এক দিন বা ৪১৭ টাকা। যা বছরে ৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এর ৫০ শতাংশ বা ৩ হাজার ৩৬ টাকা। প্রতি মাসে প্রায় ২৭৮ টাকা।
এ হিসাবে বিজিএমইএ বলতে চাচ্ছে- একজন শ্রমিক প্রতিদিন ২ ঘণ্টা ওভারটাইমসহ সারা মাস কাজ করলে বেতন পাবেন ১৭ হাজার ৭৪৪ টাকা, প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা ওভারটাইমসহ মাস শেষে ১৯ হাজার ৪১৯ টাকা এবং প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা ওভারটাইমসহ মাস শেষে ২১ হাজার ৯৪ টাকা বেতন পাবেন।
বিজিএমইএ সভাপতি বলছেন, অনেকে মজুরি নিয়ে বিতর্কে এবং পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু শিল্পের প্রতি তাদের কোনো সহানুভূতি নাই। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এ শিল্পের বিকল্প কোনো শিল্প দেশে নেই যা এত বিশাল কর্মসংস্থানকে সহযোগিতা করতে পারে। যেজন্য তৈরি পোশাক খাত প্রশংসার দাবিদার। আমরা কর্মীদের আরও বেশি যত্ন করতে আগ্রহী। তবে খেয়াল রাখতে হবে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে যাতে শিল্পকে ভারসাম্যহীন না করা হয়।
এদিকে, সোমবার (১৩ নভেম্বর) খুলনা জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে আমরা সরকারি কর্মচারীদের বেতন মাত্র ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছি। আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তাহলে তাদের আপত্তিটা কোথায়? ১৯টা শিল্পকলকারখানা তারা ভেঙেছে। এই ধ্বংস কারা করছে। এদের মধ্যে কারা আছে সেটাই খুঁজে বের করা দরকার এবং দেখা দরকার।
মন্তব্য করুন