নেত্রকোনায় গলা কেটে হত্যার পর অপরাধ ঢাকতে মরদেহের মুখ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সোমবার (১৮ মার্চ) ভোরে তাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন- সুনামগঞ্জের মাসুক মিয়া (২৯) ও ধামরাইয়ের আল-ইমরান ফয়সাল (৪৪)।
তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র্যাব জানায়, নিহত সাইফুল ইসলামের বাড়ি ঝিনাইদহে। ঢাকায় তিনি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করতেন। সাইফুলের ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে নেত্রকোনা নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সংবাদ সংগ্রহের কথা বলে সাইফুলকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার দেওরাজান বালুর চরে নিয়ে যায় মাসুক ও ফয়সাল।
নির্জন স্থানে তাকে হত্যার পর মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় তারা। ঘটনার পর অভিযুক্ত দুজন আত্মগোপনে চলে যায়। সেখান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ১৪ মার্চ দুপুরে দেওরাজান বালুর চরে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির গলাকাটা মরদেহ দেখে স্থানীয়রা পুলিশের খবর দেয়। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধারের সময় দেখতে পায়- নিহতের গলাকাটা, মাথায় আঘাত, মুখপোড়া।
পরে নিহতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
জানা যায়, সাইফুল ইসলামের বাবা আব্দুস সামাদ। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে মোহনগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিতে হত্যায় জড়িতরা গ্রেপ্তার হয়।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে দুজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, গ্রেপ্তার দুজন আন্তঃজেলা মোটরসাইকেল ছিনতাই-চুরি চক্রের সদস্য। নিহত সাইফুল ৩-৪ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করেন। ঢাকায় তিনি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন।
ঘটনার ১৫ দিন আগে গ্রেপ্তার ফরসালকে মাসুক জানান, তার ভাগিনার একটা মোটরসাইকেল দরকার, টানা বা চোরাই। মোটরসাইকেল দেবে বলে ভাগিনার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা এনে ফয়সালকে দেন।
ফয়সাল মাসুককে নিয়ে ঢাকায় কয়েকবার মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর টার্গেট করে সাইফুলকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুর চৌরাস্তার একটি দোকান থেকে ছিনতাই করার জন্য ছুরি কেনা হয়।
মাসুক সাইফুলকে জানায়, আমার পরিচিত এক সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ এবং ভিডিও ধারনের জন্য নেত্রকোনায় যাবে। সে জন্য ১৩ মার্চ বিকেল ৩টায় মিরপুর ১৪ থেকে মাসুককে নিয়ে রওনা হন সাইফুল।
ভাড়া হিসেবে ৩ হাজার টাকাও পরিশোধ করে মাসুক। পথে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সাইফুলের মোটরসাইকেলে উঠে ফয়সাল।
খন্দকার আল মঈন সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, ফয়সাল নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন। তার কাছে ‘শেষ খবর’ নামে একটি পত্রিকার আইডি কার্ড পাওয়া যায়।যেখানে তার পদবি গাজীপুর করেসপন্ডেন্ট।
এক মোটরসাইকেলে তিনজন করে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে তিনজন যাত্রী বহনের কারণে ট্রাফিক পুলিশ তাদের পথ আটকায়।
সেখানে ফয়সাল নিজেকে দৈনিক শেষ খবর পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চতুরতার সঙ্গে চলে যান। নেত্রকোনার ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর সংবাদ সংগ্রহের বাহানা করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
রাত ৩টার দিকে সুযোগ বুঝে সাইফুলের মাথায় রাস্তার পাশে থাকা ইট দিয়ে আঘাত করেন ফয়সাল। সাইফুল মাটিতে পড়ে অচেতন হওয়ার পর দুজন মিলে সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন। এরপর সাইফুলের গায়ে থাকা শার্ট খুলে তার মুখে পেছিয়ে দেন।
মোটরসাইকেলের পেট্রোল শার্টে ঢেলে এতে আগুন দেওয়া হয়। যাতে সাইফুলের পরিচয় গোপন করা যায়। এরপর হত্যায় ব্যবহার করা ছুরি, সাইফুলের মোবাইল ফোন পানিতে ফেলে দেন। সাইফুলের মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। মাসুক তার ভাগ্নের কাছে মোটরসাইকেলটি রেখে আসেন।
এদিকে ঘটনার পর দিন ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে মাসুকের ভাগ্নে অন্তর আহমেদ শান্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে সাইফুলের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। শান্তর বাড়ি খালিয়াজুরী। তিনি ঢাকায় ভাসানটেক এলাকার বরিশাল বস্তিতে থেকে একটি দোকানে কাজ করতেন। ফয়সাল ও মাসুকসহ পাঁচজনের সঙ্গে ভাসানটেকের বরিশাল বস্তিতে থাকতেন শান্ত। তাদের বাড়ি নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
র্যাব জানায়, মাসুক রাজধানীর মিরপুর ১৪ এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি দিনে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে আর সন্ধ্যায় ভ্যানে করে কাপড় বিক্রির আড়ালে মোটরসাইকেল ছিনতাই করতেন।
হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে আত্মগোপন করেন। ফয়সাল ঢাকা ও আশপাশের জেলায় মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। নিজেকে তিনি সাংবাদিক পরিচয় দিতেন। হত্যার পর গ্রেপ্তার এড়াতে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় আত্মগোপন করেন। র্যাব পৃথক দুটি স্থান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে।
মন্তব্য করুন