বাসস
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:০৭ পিএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

দাফনে পুলিশের সময় বেঁধে দেওয়ায় ছেলের মুখ ঠিকমতো দেখতে পারেননি মা

আন্দোলনে নিহত ছাব্বির মল্লিকের বাবা-মা ও বোন। ছবি : বাসস
আন্দোলনে নিহত ছাব্বির মল্লিকের বাবা-মা ও বোন। ছবি : বাসস

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বেগবান করতে একপর্যায়ে হাজারো ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে এসেছিল। বসে থাকেননি টগবগে তরুণ মো. ছাব্বির মল্লিকও।

আন্দোলনে যোগ দিতে ছাব্বির মল্লিক (২০) এইচএসসির দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে ১৭ জুলাই ঢাকায় চলে যান। যাওয়ার আগে মাকে বলেন, বোনের বাচ্চাদের জন্য তার খুব মন পুড়ছে। তাদের দেখতে ইচ্ছে করছে।

বড় বোন ফারহানা শারমিন গাজীপুরে বসবাস করেন। ছাব্বির এসে তার বাসায় ওঠেন। ভাগনা-ভাগনিদের জন্য ‘মজা’ কিনতে যাওয়ার কথা বলে ১৯ জুলাই বাসা থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

ছাব্বির এমন এক তরুণ ছিলেন, যেখানেই আন্দোলন, প্রতিবাদ সেখানেই তার সরব উপস্থিতি ছিল। তিনি ছিলেন খুবই মানবিক। নিজে প্রাইভেট পড়িয়ে সেই টাকা দিয়ে গরিব অসহায়দের সাহায্য করতেন। তার দাদা, বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তাই তারও স্বপ্ন ছিল একদিন তিনি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ও সাধ আর পূরণ হলো না।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার হিজলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. শহিদুল মল্লিক (৫৭) ও গৃহিণী কাকলি বেগমের (৫৩) চার সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র ছাব্বির মল্লিক ছিলেন স্থানীয় শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তিন বোনের এক ভাই ছিলেন ছাব্বির।

তিনি ১৯ জুলাই ঢাকার উত্তরায় বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। সেদিন বিকেলে পুলিশের গুলিতে আহত হলে তাকে সহযোদ্ধারা উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে রাত ১০টায় হাসপাতাল থেকে বড় বোনকে ফোন দেওয়া হয়। তারা দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে দেখেন ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ লাশ।

ছাব্বিরের বাবা ঢাকায় একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে গার্ডের চাকরি করতেন। একমাত্র ছেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন তিনি। ওই রাতেই ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসার পথে আওয়ামী গুণ্ডাবাহিনী ‘ছাত্রলীগ’ তাদের ওপর হামলা চালায়। অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করে। লাশের ওপর ককটেল নিক্ষেপ করে। সে এক ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম ঘটনা, যা ১৯৭১ সালের পাকবাহিনীর নির্মমতাকেও হার মানায়।

ছেলের লাশ বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতে ছাব্বিরের পিতা ও বোনকে ব্যাপক বাধার মুখে পড়তে হয়। গোপালগঞ্জের মোল্লাহাট ব্রিজ পর্যন্ত এ বাধার মুখে পড়েন তারা।

এ প্রসঙ্গে বড়ো বোন ফারহানা শারমিন (৩১) বলেন, উত্তরা থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্তই আমরা ২০ থেকে ২৫ বারের মতো বাধার মুখে পড়ি। এরপরও কিছু সময় পর পরই আমাদের গাড়ি আটকে দেয়া হচ্ছিল। আর বলছিল, আমরা যেন লাইট না জ্বালাই, হর্ন না বাজাই।

এদিকে হিজলা বাজার থেকে কানন চক বাজার পর্যন্ত সাদা পোশাকে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। পুলিশ নির্দেশ দেয়, অল্প সময়ে মধ্যেই জানাজা ও দাফনের কাজ শেষ করতে হবে। এমনকি ছাব্বিরদের গ্রামের বাড়িতে হামলারও প্রস্তুতি চলে।

গত ২০ জুলাই রাত ৩টায় লাশ এসে বাড়ি পৌঁছায়। কোনো রকমে তড়িঘড়ি করে গোসল দেওয়া হয়। জানাজা শেষে রাত ৪টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে শহীদ ছাব্বিরকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এ প্রসঙ্গে ফারহানা কালবেলাকে বলেন, লাশ নিয়ে আসার পর পুলিশ মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে দাফন, জানাজা সব শেষ করতে বলে। আমার দুঃখিনী মা-ছেলের মুখটাও ঠিক মতো দেখার সুযোগ পাননি।

শহীদ ছাব্বিরের মা এখনও শোকে বিহ্বল। ‘ছেলে আমরা লেখাপড়া শিখে সেনা কর্মকর্তা হবে, অথচ তাকে মেরা ফেলা হলো’ এই বলে বার বার আহাজারি করছিলেন।

ছাব্বিরের তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা শহীদুল মল্লিক খুবই গরীব। একমাত্র ছেলের অকাল প্রয়াণে সিকিউরিটির চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে এসেছেন। পেনশনের টাকায় কোনো রকম সংসার চলছে।

শহীদুল মল্লিক জানান, তারা ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে নগদ ২ লাখ টাকা, আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে ১ লাখ টাকার চেক, সমাজকল্যাণ চিতলমারী অফিস থেকে ৫ হাজার টাকার চেক, মোল্লাহাটের স্থানীয় বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার মাসুদের কাছ থেকে ২৫ হাজার ও এক আমেরিকান প্রবাসীর কাছ থেকে ৯ হাজার টাকার সাহায্য পেয়েছেন।

এদিকে ছাব্বিরের বাবা গত ১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। এছাড়া নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম আরিফ শহিদ ছাব্বিরের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কেউ পরিবারটির কোন খোঁজ নেয়নি।

ছাব্বিরের পিতা-মাতা বর্তমানে ছেলের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারা এখনও সারাদিন কান্নাকাটি করেন। তাই ছাব্বিরের বড়ো বোন শারমিন কিছুদিনের জন্যে পিতামাতাকে সঙ্গ দিতে গাজীপুর থেকে বাড়ি গেছেন।

পরিবারের সবাই ছাব্বির হত্যায় যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

কালবেলা/এমএ
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি যুবকের পায়ের অংশ বিচ্ছিন্ন

মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা ও সুশাসনে ২১ দফা প্রস্তাব

‘এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের অধিকাংশ সেতু ধ্বংস করে দিতে পারি’

কওমি মাদ্রাসার ভাবমূর্তি রক্ষা ও সংস্কারে আহমাদুল্লাহর ৬ দফা প্রস্তাব

জুলাই পদযাত্রায় হামলা, সারজিস-পাটওয়ারী আহত

এমপি মনিরুলকে নিয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সনাতনী সমাজের সংবাদ সম্মেলন

বিএসইসির কমিশনার হিসেবে হোসেন সাদাতের যোগদান

স্ত্রী ও তিন ছেলে প্রবাসে, ঘরে মিলল নিঃসঙ্গ বাবার গলিত লাশ

১৮ গবেষককে ৩৬ লাখ টাকা অনুদান দিল ঢাবির বোস সেন্টার

সৌদিতে হুথিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আরামকোর তেল শোধনাগার বন্ধ ঘোষণা

১০

তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের দাবি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির

১১

ফুলের টবে গাঁজা গাছ, র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ১

১২

প্রথমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গেলেন প্রধানমন্ত্রী

১৩

সাংবাদিককে হাতুড়িপেটা, যুবদল ও শ্রমিক দলের ২ নেতা গ্রেপ্তার

১৪

১৩ বছরের শিশুর কোলে ৭ মাসের সন্তান

১৫

ঢাবির ছাত্রী হলে ‘হয়রানি’ বন্ধে ৪ দফা দাবি ছাত্রশক্তির

১৬

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক / বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসটিআই

১৭

উদ্ভাবনী বীমা সেবা চালুর উদ্যোগের স্বীকৃতি পেল দুই প্রতিষ্ঠান

১৮

চুরির এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেপ্তার ২, উদ্ধার ১০ ভরি স্বর্ণ

১৯

প্রথমবার রিয়েলিটি শোতে জয়া আহসান

২০
X