একসময় সবুজে ঘেরা গভীর অরণ্য আর পশুপাখিসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর অভয় আশ্রম ছিল গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মাটিকাটা রেলগেট এলাকা। কালের বিবর্তনে নগরায়ণের কারণে বর্তমানে গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা। এসব শিল্প কারখানার আশপাশে এখন সরকারি বনের জমি দখল করে গড়ে উঠছে মার্কেটসহ বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মার্কেট ও দোকানপাটের অগ্রিম ভাড়াসহ প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী ওই এলাকার দুষ্কৃতকারী কিছু দখলদাররা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সোহরাব, জহাঙ্গীর, মাসুদ, রেজাউল দেওয়ান নামে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বনের জায়গায় দখল করে স্থাপনা ও দোকানপাট নির্মাণ করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার পাশ দখলের পাশাপাশি ওই এলাকার বনের জমি প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে স্টাম্পের মাধ্যমে চুক্তি করে দোকানপাট বিক্রি করছেন। প্রত্যেক পজিশনের জন্য আকার আকৃতির ওপর ভিত্তি করে ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয় ও ভাড়া বাবদ ২ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। আবার কোথাও কোথাও অগ্রিম হিসেবে ১০ লাখ ও ভাড়া হিসেবে ১০ হাজার টাকার বেশি নেওয়া হয় বলেও স্থানীয়রা জানায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বনের জমি দখল নেওয়ার আগে দখলদাররা কৌশলে বনের গাছপালাগুলো মেরে ফেলে। তারপর মরা গাছ আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই জায়গা ফাঁকা হলে সেখানে স্থাপনা গড়ে তোলে। মাটিকাটা রেলগেট এলাকায় বেশ কয়েকজন দখলদার বনের জমি দখল করে যার যার মতো পজিশন নিয়ে মার্কেট ও দোকানপাট তৈরি করেছে। ওই এলাকায় ২ হাজারের বেশি দোকানপাট গড়ে উঠেছে বনের জমি দখল করে। হিসাব করে দেখা গেছে এসব দোকান থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ভাড়া বাবদ বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছে এসব দখলদাররা। এতে দখল হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সরকারি বনের জমি, আরেক দিকে আর্থিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতিনিয়ত বনের জমি এভাবে দখল হতে থাকলে স্থাপনা ছাড়া বনের অলংকার গাছপালা আর দেখা যাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বর্মন জানান, এখানে কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। আমাদের মতো কয়েকটি বাড়ি ছিল। এখন এগুলো সব দখল হয়ে যাচ্ছে। রাস্তার যদি কেউ কোনো কিছু নিয়ে বসে তাও খাজনা দিতে হয়। এসব বিষয়ে সবাই এখন অতিষ্ঠ।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক শামসুল হক বলেন, এমনিতেই এই রাস্তাটি পাশ ছোট। তার মধ্যে রাস্তায় বনের জমি দখল করে দোকানপাট করার কারণে এই দিকে প্রচুর লোকজন দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে। তাই রাস্তায় অনেক যানজট সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
দখলকৃত জায়গায় গড়ে ওঠা দোকান ভাড়া নেন আফরোজা আক্তার নামে এক নারী। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে আমি দেড় লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে দোকান নিয়েছিলাম কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারি এইটা বন বিভাগের জায়গা। এখন তিনি আমাকে দোকানও বুঝিয়ে দেন না, আমার টাকাও ফেরত দেন না। টাকা চাইতে গেলে তিনি আমাকে টাকা না দিয়ে বিভিন্নভাবে হুমকি দেন।
সবজি বিক্রেতা এক ব্যক্তি বলেন, দোকানের জন্য এখানে আমি দেড় লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছি। প্রতি মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়।
বনের জমিতে কেন ভাড়া দেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তা আমি জানি না। যারা দখল করেছেন তাদেরকেই ভাড়া দিয়ে দোকান চালাতে হয়।
অভিযুক্ত দখলদার সোহরাব হোসেন জানান, এগুলো আমি একা নিচ্ছি না। এখানে প্রায় দুই হাজার দোকান আছে। যে রকমভাবে দখল করেছে সে অনুপাতে এক একজন ভাড়া নিচ্ছে।
চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ জানান, মাটিকাটা রেলগেট থেকে অ্যাপেক্স এবং মাটিকাটা থেকে ঢালাস পর্যন্ত আমাদের উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের করা আছে। এখন যে কোনো সময় জেলা প্রশাসন থেকে আদেশ দিলেই উচ্ছেদ অভিযান করা হবে। আমারা সব সময়ই প্রস্তুত।
সহকারী বন সংরক্ষক (গাজীপুর) মো. রেজাউল করিম বলেন, অনেক আগে থেকে দখলকৃত জায়গা পর্যায়ক্রমে চেষ্টা উদ্ধার করছি। কালিয়াকৈর এলাকায় আমরা এর আগে একাধিকবার কিছু উচ্ছেদও করেছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। মাটিকাটাসহ আরো কয়েকটি জায়গা আমরা উচ্ছেদ করব এরকম পরিকল্পনা আছে। যেগুলো পুরাতন স্থাপনা আছে সেগুলো আমরা ইচ্ছা করলেই উচ্ছেদ করতে পারি না। এর জন্য কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে। এসব উচ্ছেদের জন্য আমাদের প্রস্তাবনা দেওয়া আছে। নির্দেশনা এলে আমরা কাজ করব।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, মাটিকাটা রেলগেট এলাকায় বন বিভাগের কিছু জমিতে অবৈধ দোকানপাট রয়েছে। সেগুলো সরকারি বিধি মোতাবেক আমরা উচ্ছেদের কাজ সম্পন্ন করব।
মন্তব্য করুন