পাট জাগ নিয়ে শুরু থেকেই বিপাকে নাটোরের বাগাতিপাড়ার চাষিরা। বর্ষা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির দেখা না পাওয়ায় এলাকার জলধারাগুলো এখনো পানিশূন্য। ফলে পাট জাগ দিতে পারছেন না চাষিরা। এতে এবার পাটের ভালো ফলন হলেও সময়মতো জাগ দিতে না পারলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে অনেকে পাট জাগ দেওয়ার জন্য পুকুর ভাড়া নিচ্ছেন।
অন্যদিকে এলাকার পুকুর মালিকরাও পাট জাগের জন্য ভাড়ায় খাটাতে শ্যালোচালিত পাম্প বসিয়ে পানি ভরছেন নিজেদের পুকুরগুলোতে। এতে ক্ষতি হচ্ছে মাছের।
উপজেলার গালিমপুর গ্রামের কৃষক ইদ্রীস আলী বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে এবার খালে বা বিলে পানি নেই। এদিকে পাট কাটার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু জাগ দেওয়ার পানি না থাকায় পাট কাটতে পারছিলাম না। শেষে উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে ১৬শো টাকা বিঘা হিসেবে পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছি।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩১০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব জমির পাট কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু খাল-বিলে পানি না থাকায় চাষিরা ভাড়া দিয়ে পুকুরে শ্যালোমেশিনে পানি দিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন। এ সুযোগে কেউ কেউ পুকুরের মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকনো পুকুরে পানি জমিয়ে পাট জাগের জন্য পুকুর লিজ দিচ্ছেন। এতে চাষিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
সদর ইউনিয়নের কোয়ালীপাড়ার আলাল উদ্দিন বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে চাষ, পাটবীজ, সার, কীটনাশক দেওয়া এবং আগাছা পরিষ্কার, পাট কাটা, পরিবহন খরচ, জাগ দেওয়া, ধোয়া ও শুকানোর শ্রমিক খরচ বাবদ ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। আর পুকুর ভাড়া নিয়ে জাগ দিতে খরচ আরও দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেশি। বাজারে বর্তমানে ভালো মানের প্রতি মণ পাট ২৩০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। লোকসান ছাড়া এবার পাট বিক্রি সম্ভব না।
পেড়াবাড়িয়া গ্রামের পুকুর মালিক হেলাল আলী বলেন, তার দুই বিঘা জমিটি অন্যান্য জমি থেকে অনেক নিচু হওয়ায় এখানে রোপা-আমন মৌসুমে ধান ও বর্ষা মৌসুমে মাছের চাষ করেন। কিন্তু পাট জাগ দেওয়ার জন্য সবাই পুকুর ভাড়া নিতে চাইল। তাই মাছ চাষ না করে পাট জাগের জন্য ভাড়া দিচ্ছেন। এক বিঘা জমির পাটের জন্য তিনি ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা নিচ্ছেন।
উপজেলার মালঞ্চি বাজার এলাকার পাট ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, এবার বৃষ্টি কম ও খরা বেশি হওয়ায় পাটগাছ তেমন বড় হয়নি। আগে বিলে বা নদীতে বেশি পানিতে পাট জাগ দিয়ে ওপরে কলাগাছ দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হতো। এতে পাটের আঁশের রঙ ভালো হতো। কিন্তু পানি না থাকায় অল্প পানিতে কাদামাটি দিয়ে চাপা দিয়ে পাট জাগ দেওয়ায় আঁশের রঙ বেশি ভালো হচ্ছে না। এতে এসব পাটের দাম কম হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. ভবসিন্ধু রায় বলেন, পানির অভাবে পাট জাগ দিতে কৃষকদের বেশ ভোগান্তি হচ্ছে। তাই বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে কৃষকদের রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট প্রস্তুতের কথা বলা হয়েছে। আর বেশির ভাগ কৃষক পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন।
এদিকে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আগে বর্ষা মৌসুমে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ফুট গভীরেই পানির স্তর পাওয়া যেত। বর্তমানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম এবং পুকুরে পানি না থাকায় সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে প্রতিনিয়ত সেচ কার্যক্রম চলছে। এতে করে পানির স্তর এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। উপজেলায় প্রায় ১৯ হাজার নলকূপে পানি উঠছে না। ভবিষ্যতে সচেতন না হলে আমাদের জন্য আরও খারাপ দিন অপেক্ষা করছে।
এ সময় পানি ব্যবহারে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
মন্তব্য করুন