স্থাপনের দুই মাস পর অবশেষে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে লাগেজ স্ক্যানার চালু করা হয়েছে। তবে যন্ত্রটি যারা পরিচালনা করছেন, এ বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নিরাপত্তার পূর্ণ সুবিধা কতটা নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চলতি বছরের জুনে যাত্রীদের লাগেজ পরীক্ষা ও অবৈধ মালামাল পরিবহন রোধে চট্টগ্রামসহ দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন বসায় রেলওয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সুপারিশে নেওয়া এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ঠেকানো এবং যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা। কিন্তু চট্টগ্রামে যন্ত্র বসানোর পর থেকে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের অভাবে অচল পড়ে ছিল। সম্প্রতি এটি চালু করা হয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, এই স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন স্টেশন মাস্টার, আরএনবি সদস্য ও টিকিট কালেক্টর। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম স্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আরএনবির সদস্যদের এক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে স্ক্যানিং মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দুজন প্রকৌশলী। পরে আবার এসে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত আর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু যন্ত্র বসানো বা চালু করাই যথেষ্ট নয়, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাই প্রকল্পের মূল চ্যালেঞ্জ। এদিকে স্ক্যানিং মেশিন চালু হলেও স্টেশন এলাকা অরক্ষিত হওয়ায় মেশিন বসানোর পরিপূর্ণ সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একদিকে স্ক্যানিং মেশিন, আর বাকি দিকগুলো খোলা। যারা অবৈধ জিনিসপত্র বহন করবে, তারা সহজেই অন্যদিক দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।
স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী কালবেলাকে বলেন, এই মেশিনে মাদক, অস্ত্র বা অবৈধ জিনিসপত্র রঙের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। জিনিসপত্রের আকার, আকৃতি ভেদে একেক রং প্রদর্শিত হয়। যেমন—পানীয় জাতীয় মাদক থাকলে এক রং দেখাবে, আবার শুকনো মাদক থাকলে আরেক রং দেখাবে। এ বিষয়ে আমাদের মাত্র এক দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এক দিনের প্রশিক্ষণ থেকে আমরা তেমন কিছুই শিখতে পারিনি। আমরা তখনই আবার প্রশিক্ষণের কথা বলেছিলাম। কিন্তু আর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যথাযথ প্রশিক্ষণ না পেলে আমাদের পক্ষে পরিপূর্ণ সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যাত্রী নিয়াজ মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘যন্ত্র চালু হওয়ায় ভালো লাগছে, কিন্তু যারা চালাচ্ছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কম। পুরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রশিক্ষণ জরুরি।’
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমান কালবেলাকে বলেন, ‘মেশিনটি চালানো হচ্ছে ঠিকই, তবে পুরো দক্ষতা নিয়ে ব্যবহার করতে হলে আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক দিন এসে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়েছে, পরে আর আসেনি।’
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার কালবেলাকে বলেন, ‘স্ক্যানিং মেশিনটি চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে চালু হয়ে তা রাতের শেষ ট্রেন পর্যন্ত চলবে। যন্ত্রটি যারা পরিচালনা করেন, তাদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা শতভাগ এক্সপার্ট হতে পারেননি। তাদের আরও প্রশিক্ষণ দরকার। আমরা আশা করি সরবরাহকারী সংস্থা দ্রুত আবার এসে এটি সম্পন্ন করবে।’
স্টেশনের বিভিন্ন দিক খোলা রেখে স্ক্যানিং মেশিন চালু করার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো রেলস্টেশনেই সবদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন কালবেলাকে বলেন, মাদক বা বিভিন্ন অবৈধ জিনিসপত্র শনাক্তে এই স্ক্যানিং মেশিন বসানোর উদ্যোগটি অত্যন্ত যুগোপযোগী। তবে প্রশিক্ষিত জনবল, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে উদ্যোগটি কোনো কাজেই আসছে না।
মন্তব্য করুন