

একসময় গ্রামবাংলার পথেঘাটে, পাড়া-মহল্লায় ও বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায় শিশুদের ভিড় জমত হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতাকে ঘিরে। রঙিন বাক্সে সাজানো গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাইয়ে ও বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়েই গেছে।
একসময়ের বাক্সবন্দি হাওয়াই মিঠাইর সচরাচর দৃশ্য এখন আর দেখাই যায় না। তবে এখনো কিছু মানুষ আছেন, যারা আগলে রেখেছেন হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্য। তাদেরই একজন ছামাদ।
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ছামাদ (৬০)। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে আসছেন। কখনো নিজ জেলা জামালপুরে, কখনো পার্শ্ববর্তী কোনো জেলায়। আবার কখনো অনেক দূরের কোনো জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে ফেরি করে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেন। সম্প্রতি তাকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরের মহালক্ষীপাড়া এলাকায় বাক্স নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরি করে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করতে দেখা যায়।
ছামাদ বলেন, এই মিঠাই বিক্রির লভ্যাংশ দিয়েই আমাদের জীবন চলে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই পেশায় জড়িত আছি। একসময় বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করলে অনেক বিক্রি হতো। এখনকার শিশুদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, শিশুদের খাবারেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। তাই এখন আর আগের মতো বিক্রি হয় না। তবে এখনো কিছু বাচ্চা আছে যারা এই মিঠাই দেখলে খুশি হয়, এগিয়ে আসে।
তিনি আরও বলেন, একসময় আমার বাবাও এই পেশায় জড়িত ছিলেন। আমি আমার বাবার হাত ধরেই এই পেশায় যুক্ত হয়েছি। বাবা কখনো অসুস্থ থাকলে আমি বাবার জায়গায় যেতাম। তারপর ধীরে ধীরে নিজেও পুরোপুরিভাবে এই পেশায় জড়িয়ে গেছি। তবে আমার ছেলেরা এই পেশায় জড়ায়নি। তারা আধুনিক সময়ের হয়ে আধুনিক পেশাই বেছে নিচ্ছে।
ছামাদ বলেন, প্রতিদিন গড়ে হাজার ১২’শ টাকার হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে যে লাভ থাকে তা দিয়েই চলে তার পাঁচ সদস্যের পরিবার। এই বয়সে আর নতুন কোনো কাজ শেখার সুযোগ নেই। আর তাছাড়া দীর্ঘদিনের পেশায় এক ধরনের মায়া জমে গেছে। তাই আল্লাহ যতদিন সুস্থ রাখেন, ততদিন এই মিঠাইয়েই তার ভরসা।
ছামাদের রঙিন বাক্সে সাজানো গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই দেখতে শিশুসহ সববয়সী মানুষই গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই সাজানো বাক্সের কাছে এগিয়ে আসছে। কেউ কেউ কৌতূহল নিয়ে কাছে আসছে। কেউ আবার স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়ে কাছে আসছে। শিশুদের মধ্যেই যেন বেশি কৌতূহল।
স্থানীয় বাসিন্দা আলফু মিয়া বলেন, আমরা ছোটোবেলায় এমন বারোমজা (হাওয়াই মিঠাই) খেয়েছি। সে সময় আমরা প্রতিদিন আগ্রহ নিয়ে বারোমজা (হাওয়াই মিঠাই) ওয়ালার জন্য অপেক্ষা করতাম। এখন তো এদের খুব একটা দেখা যায় না। অনেক বছর পর আমি বারোমজা (হাওয়াই মিঠাই) ওয়ালা দেখলাম। তাকে দেখে ছোট বেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এই চিরচেনা দৃশ্য একসময় ছিল গ্রামবাংলার নিত্যদিনের অংশ। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে খুব পরিচিত ছিল বাক্সে নিয়ে ফেরি করে বিক্রি করা হাওয়াই মিঠাই। তবে এই হাওয়াই মিঠাই সেসময় বারোমজা নামে পরিচিত ছিল। বিক্রেতারা বাঁশের দুই পাশে রশি দিয়ে দুটি বাক্স ঝুলিয়ে ঘণ্টা বা বাঁশি বাজিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। তখনকার শিশুরা হাওয়াই মিঠাই খেতে বেশ আগ্রহী ছিল, অপেক্ষায় থাকতো।
তিনি আরও বলেন, তবে সময়ের ব্যবধানে এতেও এসেছে পরিবর্তন। এখন আর এই ফেরিওয়ালাদের দেখা যায় না। এখনকার শিশুরাও ততটা আগ্রহী নয়। আধুনিক সময়ের আধুনিক খাদ্যপণ্যের প্রতি শিশুদের আগ্রহ বেশি। তাই এই ঐতিহ্যটাও গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে আজও কোথাও কোথাও ভেসে ওঠে সেই পুরোনো দিনের রঙিন হাওয়াই মিঠাইয়ের গল্প।
মন্তব্য করুন