ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৪, ১০:৫১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

টেকনাফ-উখিয়ায় পানি ও আবাসস্থল সংকটে বন্যপ্রাণীকূল

টেকনাফ, শিলখালী ও হোয়াইক্যং এলাকার শুকিয়ে যাওয়া ছড়া, খাল, ঝিরি ও কুয়োর খণ্ডচিত্র। ছবি : কালবেলা
টেকনাফ, শিলখালী ও হোয়াইক্যং এলাকার শুকিয়ে যাওয়া ছড়া, খাল, ঝিরি ও কুয়োর খণ্ডচিত্র। ছবি : কালবেলা

এক যুগ আগেও নানা প্রজাতির বৃহদাকার গাছ-গাছালিতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল উখিয়া টেকনাফের বনাঞ্চল। সে সময় শুষ্ক মৌসুমেও বনের ছড়া, খাল ও জলাধারে পানি ছিল। কিন্তু অব্যাহতভাবে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত গভীর নলকূপ ও শ্যালো দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং অনাবৃষ্টির ফলে দিন দিন পানির স্তর নিচে নামছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। শুষ্ক মৌসুমে বনের ছড়া ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর খাওয়ার পানি সংকট তীব্র হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও খাবারের জোগান না থাকার কারণে প্রাণীগুলো লোকালয়ে বেরিয়ে নানা সময়ে মৃত্যুমুখে পড়ছে। আর পাখিগুলো কিছু মানুষের খাবারে পরিণত হচ্ছে।

সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোডেকের এক সেমিনারে পাহাড়ি ছরা বিলুপ্ত হওয়ায় বন্যপ্রাণীর পানি সংকটের তীব্রতার চিত্র তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের প্রফেসর ড. মোশাররফ হোসেন।

এ অবস্থায় টেকনাফে বনাঞ্চল রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জাননো হয় সেমিনারে। যদিও বরাবরের মতো বন বিভাগের পক্ষ থেকে বনাঞ্চল ধরে রাখতে কাজ করছে তারা।

প্রফেসর ড. মোশাররফ জানান, টেকনাফে শুকিয়ে গেছে পাহাড়ি ছড়া-প্রাকৃতিক পানির উৎস। এতে ভোগান্তিতে পড়া বন্যপ্রাণী ও পানির উৎস নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের এক পাশে বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে নাফ নদী। মধ্যখানে পাহাড়ি বনাঞ্চল। মিঠা পানির জন্য পাহাড়ের ছড়া, ভূ-গর্ভস্থল ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমে নিচে নামছে। ফলে বাড়ছে স্যালাইনের মাত্রা। আর অনাবৃষ্টি ও বন উজাড়ের কারণে বনের ছরা ও জলাধারগুলো অব্যাহতভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বন্যপ্রাণী তীব্র পানি সংকটে ভুগছে। অনেক প্রাণী ইতোমধ্যে মারা পড়ছে। অনেক প্রাণী অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছে। খাবার পানি, খাদ্য সংকট আর আবাসস্থল হারিয়ে লোকালয়ে বেরিয়ে পড়ে হাতি, সাপসহ বিভিন্ন পশু-পাখি। শুধু তাই নয়, স্থানীয় অনেক পরিবার পানি সংকটের কারণে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বসতি স্থানান্তর করেছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দেশের দক্ষিণ সীমান্ত জেলার বনাঞ্চল প্রতিনিয়ত দখল হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। বন উজাড়ের ফলে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে গাছপালা। পরিবেশ বিপর্যয়ে নষ্ট হচ্ছে বাস্তুসংস্থান। একইভাবে কমতে শুরু করেছে পশুপাখির খাদ্য। পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রভাব, আবাসস্থল, খাদ্য ও পানির সংকটসহ নানা কারণে লোকালয়ে আসছে বন্যপ্রাণী। এদের শত্রু ভেবে লোকজন ধরছে এবং আঘাত করছে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নানা প্রজাতির প্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি হারাচ্ছে আপন নীড়। এ থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

টেকনাফের বাহার ছড়া শিলখালী এলাকার শফিউল আলম বলেন, দুই দশক আগেও শুকনো মৌসুমে বনের ছড়া ও খালে পানি থাকত। এখন পানি দূরে থাক ছরার চিহ্নও নেই। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এমনটা হচ্ছে।

টেকনাফ শামলাপুরে বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করা শাহাজাহান বলেন, অব্যাহত বন উজাড় হওয়ায় খাদ্য ও পানি সংকটে নানা সময়ে অজগরসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী লোকালয়ে বেরিয়ে পড়ে। আমরা অনেক প্রাণী উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছি।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা কোডেক’র ন্যাচার অ্যান্ড লাইফ প্রজেক্ট ডিরেক্টর ড. শীতল কুমার নাথ বলেন, টেকনাফ পানি সংকট দূর করতে সমন্বিত পদক্ষেপ খুবই জরুরি। কারণ এ সংকট বন্যপ্রাণী নয়, স্থানীয়দের জন্য তীব্রতর হচ্ছে দিন দিন। এজন্য বনায়নের পাশাপাশি পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ক্রমে পাকা ও আধা পাকা দালান তৈরি হওয়ায় পান ও ব্যবহারে ভূ-গর্ভস্থ পানির চাহিদা বেড়েছে। তাই দিন দিন সুপেয় পানি সংকট তৈরি হচ্ছে। এটি দূর করতে রেইন ওয়েটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়া-টেকনাফকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে উখিয়ার পালংখালীতে ৬০০ একর জমি লিজের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে, বনের ভেতর প্রাকৃতিকভাবে পানি সংরক্ষণে খাল-ছড়া সচল করা জরুরি।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সরোয়ার আলম বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়ে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি জীববৈচিত্র্য হারিয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতার অভাবে পাহাড়ের ওপর-নিচে সব অংশ থেকেই নির্বিচারে গাছ কেটে নিয়ে যায় গাছ চোরেরা। পাশের গাছ কেটে নেওয়ায়, ছড়াগুলো সব মারা যাচ্ছে। পাহাড়ের সব অনুষঙ্গ উজ্জীবিত রাখতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো শুরু করে তা অব্যাহত রয়েছে। গবেষণার সুপারিশ মতে, পূর্বে জারি থাকা ছড়ার উভয় পাশে ১৫ ফুট পর্যন্ত জায়গায় দ্রুত গাছ লাগানো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বন কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে না এলে প্রকৃতি ও বন রক্ষা কঠিন হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় শঙ্কা দূর হয়েছে : যুবদল নেতা আমিন

আহত নুরের খোঁজ নিলেন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণে ৩১ দফার বিকল্প নেই : লায়ন ফারুক 

চবির নারী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

অবশেষে জয়ের দেখা পেল ম্যানইউ

আ.লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

আসিফের ঝড়ো ইনিংসও পাকিস্তানের জয় থামাতে পারল না

খুলনায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১৫

বাবা-মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত ভাইরাল, মুগ্ধ নেটিজেনরা

ডাচদের বিপক্ষে জয়ে যে রেকর্ড গড়ল লিটনরা

১০

সাকিবের রেকর্ডে ভাগ বসালেন লিটন

১১

বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নতুন কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগ

১২

জয়ের কৃতিত্ব কাদের দিলেন লিটন?

১৩

চায়ের দোকানে আ.লীগ নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৪

ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে যা বললেন তাসকিন

১৫

বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে জাপা অফিসে ভাঙচুর

১৬

প্রতিটি জেলা থেকে ট্যালেন্ট হান্ট চালু করবে বিএনপি : আমিনুল হক 

১৭

ফুল হয়ে ফোটে খাদ্য-অর্থের অভাব মেটাচ্ছে শাপলা

১৮

এফইজেবি’র নতুন সভাপতি মোস্তফা কামাল, সম্পাদক হাসান হাফিজ

১৯

নুরের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য জানালেন চিকিৎসকরা

২০
X