কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৪, ০২:৫৫ এএম
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৪, ০৬:২০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশেষ সাক্ষাৎকার

একটি সুন্দর দেশের ভিত্তি গড়ে দিতে চাই

ফরিদা আখতার
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। সৌজন্য ছবি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। সৌজন্য ছবি

ফরিদা আখতার; অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তিনি একাধারে লেখক, গবেষক ও আন্দোলনকর্মী। উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা)-এর নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ফরিদা আখতারের জন্ম বাংলাদেশের হারলা গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, লক্ষ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়সহ তার পরিকল্পনা নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন।

"দুর্নীতিটা প্রশাসনের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করেছে, যার মধ্য থেকে তাকে বের করে আনা বেশ কঠিন। অনেকেই মনে করেন, প্রশাসনের একটি বিশেষ পদে যেতে পারলে বেতনটা আর মুখ্য নয়। তারা টেবিলের তলার সংস্কৃতি এমনভাবে তৈরি করেছেন, যা ভাঙা বেশ কঠিন। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সার্বিকভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনোরকম ছাড় দেওয়া যাবে না। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে যদি এ কঠোর অবস্থান বোঝাতে পারি, তাহলে হয়তো এই সংকট আমরা মোকাবিলা করতে পারব"

কালবেলা: আপনি বাংলাদেশের সম্প্রতি গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাই?

ফরিদা আখতার: বাংলাদেশে এর আগেও আমরা এমন সরকার দেখেছি। তবে সেটা ভিন্ন ফর্মে ছিল। এবারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশে একটি বিপ্লব ঘটেছে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে এ নতুন সরকার এসেছে। সুতরাং অন্য সব সময়ের থেকে ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট। ছাত্রছাত্রীরা যখন আমাকে এ সরকারে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তখন আমি অনেক সম্মানিত বোধ করেছি। তারা যখন এ সম্মানটা আমাকে দিয়েছে, সেটা আমার জন্য অবশ্যই আনন্দের। আমি এখনো মনে করি, এ বিপ্লব ছাত্ররা, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ জনগণ নিয়ে এসেছে। আর তাদের চাওয়ায় এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশ হতে পেরে তাদের প্রতি আমি অনেক দায়বোধ করছি। আমি এ দায়বদ্ধতাটি ধরে রাখতে চাই।

কালবেলা: আপনাদের সামনে লক্ষ্যগুলো কী?

ফরিদা আখতার: প্রথমত, এখন এমন একটি পরিস্থিতি চলছে যেটাকে কোনোভাবেই সাধারণ অবস্থা বলা যাবে না। আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি ভালো না, মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কিন্তু তারপরও যে ছাত্ররা একদিকে মাঠে আন্দোলন করেছে, স্লোগান দিয়েছে এখন তারাই রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছে। তারা রাস্তা পরিষ্কার করছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাহারা দিচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছে। একটা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়েও যে তারা দায়িত্ব নিতে জানে, তা আমরা দেখলাম। নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল যে, তারা দেশ সম্পর্কে ভাবে না, তারা নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে, তাদের সম্পর্কে আমরা যে ধারণা করেছিলাম, তা ভুল। ছোট ছোট বাচ্চারা রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ করছে। এসব দেখে আমরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছি।

এই মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব হলো, খুবই দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেওয়া। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর এবং তাদের সম্পদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ হয়েছে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আমরা বলতে চাই, এই ধরনের হামলা সার্বিকভাবে সারা দেশে হচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় যা কিছু ঘটছে, তা আবার এমনভাবে প্রচার হচ্ছে যাতে দেশটাকে অস্থিতিশীল দেখানো যায়। একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এটা করছে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী এবং বিশেষ দেশগুলোকে একটা গোষ্ঠী বোঝাতে যাচ্ছে যে, এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা খারাপ অবস্থায় আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, তাদের একটি গোষ্ঠী যেমনটা দেখাচ্ছে বিষয়টা আদতে তা নয়। এই দেশে আমাদের, নারী-পুরুষ ধর্ম-জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবার।

এ ছাড়া এখানে সংবিধানের একটি প্রশ্ন রয়েছে। এই সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় নয় বরং একটি বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। সংবিধানকে সামনে রেখেই কাজ হচ্ছে এবং এখানে আমাদের অনেক কাজ করার আছে। আমরা সেটা কখন এবং কীভাবে করব তা এখনো ঠিক করা হয়নি। এখন পর্যন্ত এটা একটা প্রশ্ন হয়েই আছে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের প্রতি আমাদের আরেকটি দায়বদ্ধতা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। গোটা বাজার ব্যবস্থায় সিন্ডিকেটের আখড়া তৈরি করার কারণে পণ্য, সেবা এবং দ্রব্যের দাম অস্বাভাবিক রকমের বেশি। বাজারে গেলেই মানুষের ভোগান্তি দেখা যায়। সুতরাং পণ্য ও দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য প্রথম অগ্রাধিকার। মানুষের দুর্ভোগ ও কষ্টগুলো যদি লাঘব না করা যায়, তাহলে তো আমরা হেরে গেলাম। তাই তাৎক্ষণিকভাবে না পারলেও, সেই প্রক্রিয়াটা আমরা অতি দ্রুত শুরু করব। আশা করি মানুষের জন্য আমরা ভালো কিছু দিতে পারব।

কালবেলা: বিদ্যমান রাষ্ট্রের কাঠামো কীভাবে ঠিক করবেন?

ফরিদা আখতার: রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় ভিত্তি হলো সংবিধান সংস্কার করা অথবা নতুন করে লেখা। আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোটি কী হতে পারে সেটা সংবিধান সংস্কার দিয়েই বোঝাতে হবে। একটি নিপীড়নমূলক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের যে চরিত্র গড়ে উঠেছিল তার জন্য শুধু সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা দায়ী ছিল না বরং সমাজেও একটি ফ্যাসিবাদী চিন্তা গড়ে উঠেছে। সমাজ থেকে এ ফ্যাসিবাদী সমর্থন পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্রযন্ত্রে এ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাটি টিকে গিয়েছিল। ফলে একজন প্রধানমন্ত্রীর চলে গেছেন বলে এ ফ্যাসিবাদী সিস্টেম ঠিক হয়ে গেছে, সেটা আমরা মনে করি না। আমরা মনে করি, এ ফ্যাসিবাদী কাঠামোটি এখনো বিদ্যমান। এ কাঠামোর অতি দ্রুত সংস্কার হবে। ছাত্র-জনতা যেভাবে চায় এবং এতদিন যারা এ বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, সবার সঙ্গে মিলে এ সংস্কার করতে হবে। এটা আমাদের অন্যতম একটি অগ্রাধিকার।

কালবেলা: সমগ্র সিস্টেমে পরিবর্তন নিয়ে আসা কতটুকু সম্ভব হবে বলে মনে করেন?

ফরিদা আখতার: আমি মনে করি, সমগ্র সিস্টেমের পরিবর্তন নিয়ে আসতে একটু কষ্ট হবে, কিছুটা সময়ও লাগতে পারে। দেশের গণমাধ্যম, সরকারি প্রশাসন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সবকিছু নতুন করে সাজাতে হতে হবে। বিগত সরকারের আমলে দেশের গণমাধ্যমকে যেভাবে কুক্ষিগত করে ফেলা হয়েছিল, তা আমরা দেখেছি। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, কারও মুখ দিয়ে যে কথা উচ্চারিত হচ্ছে আর তার মনে কী আছে সেটা আমরা বুঝতে পারছিলাম না। যারা পত্র-পত্রিকায় লিখছেন তাদের আসল কথাটা আমরা পাচ্ছিলাম না।

আমরা যদি মানুষকে এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাতে পারি যে, এখন আপনারা মুক্তভাবে ও মুক্ত নিঃশ্বাসে কথা বলতে পারবেন। আইসিটি আইনসহ অন্যান্য ফ্যাসিবাদী আইন অতিসত্বর বাতিল করতে হবে। আমার মনে হয়, আমরা যদি মানুষকে ভরসা দিতে পারি তাহলে পরিস্থিতি খুব জলদি উন্নতি হবে।

কালবেলা: আপনারা কি বিদ্যমান আইনের সংস্কার করতে চাইছেন?

ফরিদা আখতার: অবশ্যই বিদ্যমান অনেক আইনের সংস্কার করতে হবে। এখানে বলতে চাই, অনেকেই মনে করেন আইনের কাজ করবেন শুধু আইনজীবীরা। এটা একটি ভুল ধারণা বলে আমি মনে করি। আমি মনে করি, আইনের উপাদানগুলো সমাজের সর্বস্তর থেকে আসে। একজন মানুষ জানেন, তিনি কি অধিকার হারাচ্ছেন। সুতরাং আমরা চাচ্ছি, জনগণের যতজন, যত ধরনের অংশীদার রয়েছেন, তাদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে আইনের সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার।

কালবেলা: আপনারা একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। কীভাবে এগোতে চান এবং কতটা সফল হবেন বলে মনে করেন?

ফরিদা আখতার: সেটা নির্ভর করবে দেশের জনগণ আমাদের কীভাবে এবং কতটুকু সাপোর্ট দিচ্ছে তার ওপর। একই সঙ্গে গণমাধ্যম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের গণমাধ্যম যদি আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে এবং আমরা যদি জনগণের থেকে আস্থা অর্জন করতে পারি তাহলে কঠিন হবে না। কিন্তু যদি আমরা শুধু কিছু প্রশাসনিক কাজ করি এবং রুটিন কাজের মধ্যে আটকে যাই, তাহলে আমরা ব্যর্থ হব। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি যে লক্ষ্যগুলো রয়েছে তার কাজ আজ থেকে শুরু করতে হবে। আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে যারা আছেন তারা মোটামুটি বিভিন্ন সেক্টরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ। আমরা একত্রে কাজ করতে পারলে এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেলে আমি মনে করি রাষ্ট্র সংস্কার কঠিন হবে না।

কালবেলা: আমরা এর আগেও দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে পরবর্তীকালে নির্বাচিত সরকার সেগুলোতে গুরুত্ব দেয়নি। সে ক্ষেত্রে এবার বিষয়টি কেমন হবে?

ফরিদা আখতার: আমি এখানে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পার্থক্যটি দেখাতে চাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো, একটি নির্বাচিত সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর আরেকটি নির্বাচিত সরকার আসার আগমুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে এমন একটি সরকার। তাদের মূল কাজ থাকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্ন শুধু তখনই আসে, যখন এটি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

অন্যদিকে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়েছে একটি বিপ্লবের হাত ধরে। জনগণের আন্দোলনের পর এবং জনগণের দ্বারা নির্ধারিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ পূর্তির পরে আসেনি। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে একটি গুণগত পার্থক্য রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে জনগণের। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এখানে সম্পর্কিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোনো দলীয় মানুষ নেই। আমরাও একটি সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেব। আমরা এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলা শুরু করিনি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি এ চিন্তাভাবনা থাকে যে, আমরা অতি দ্রুত একটি নির্বাচন দিয়ে দেব এবং তারা ক্ষমতায় আসবে তাহলে সেটা ঠিক হবে না। আমরা একটি নির্বাচন দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারটুকু করতে চাই। আমরা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ঠিক করতে চাই যাতে পরবর্তী সময়ে যে ক্ষমতায় আসুক, সেখানে কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না।

যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের আগেই একটি নির্বাচন আয়োজন ও রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিই, তাহলে এই বিপ্লব ব্যর্থ হবে। এতে রক্ত ঝরল, এত মানুষের প্রাণহানি হলো, এত মানুষ আহত হয়ে এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, এত পরিবার স্বজনহারা হয়েছে, তাদের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা কী? সুতরাং তাদের এ ত্যাগকে সম্মান জানানোর জন্য হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার আমরা করে যেতে চাই।

কালবেলা: কাজ করতে আপনারা প্রশাসনের কতটুকু সহযোগিতা পাবেন?

ফরিদা আখতার: আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা পাব বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছি তারা আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিষয়টা আমার ভালো লেগেছে। আমার মনে হয়েছে, প্রশাসনের কর্মীরাও বিগত সরকারের ফ্যাসিজমের মধ্যে এক ধরনের গুমোট পরিবেশের মধ্যে ছিল। এসব মন্ত্রণালয় দলীয় নিয়োগে যারা এসেছেন তারা কতটুকু সহযোগিতা করবেন আমি জানি না। তবে সব কর্মী দলীয় নিয়োগে এসেছেন তেমনটা নয়। অনেকেই মেধার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই এসেছেন। কিন্তু তারা কাজ করতে পারছিলেন না।

আমার মনে হয়, আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে পারি তাহলে প্রশাসনের অনেকেই আমাদের সঙ্গে থাকবে। অন্তত আমি যে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়’, সেখানে আমি সহযোগিতা পাব বলে আশা রাখি।

কালবেলা: দুর্নীতির কারণে প্রশাসনের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। সেটা ফিরিয়ে আনার জন্য আপনারা কী করবেন?

ফরিদা আখতার: এটা আসলেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমার মনে হয়, দুর্নীতিটা প্রশাসনের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করেছে, যার মধ্য থেকে তাকে বের করে আনা বেশ কঠিন। অনেকেই মনে করেন, প্রশাসনের একটি বিশেষ পদে যেতে পারলে বেতনটা আর মুখ্য নয়। তারা টেবিলের তলার সংস্কৃতি এমনভাবে তৈরি করেছেন, যা ভাঙা বেশ কঠিন। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সার্বিকভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনোরকম ছাড় দেওয়া যাবে না।

আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে যদি এ কঠোর অবস্থান বোঝাতে পারি, তাহলে হয়তো এই সংকট আমরা মোকাবিলা করতে পারব। আপনারা জানেন, আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ আমরা সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে খুবই কঠিন। সুতরাং দুর্নীতি করে কেউ ছাড় পাবে না।

কালবেলা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি?

ফরিদা আখতার: যেহেতু এই সরকার মাত্রই শপথ গ্রহণ করেছে, তাই এসব নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। তবে যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয় এখনো প্রধান উপদেষ্টার হাতে রয়েছে সুতরাং উপদেষ্টা পরিষদে নতুন সদস্য আসতেও পারেন। মূলত এটা প্রধান উপদেষ্টাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এটি তার এখতিয়ারে রয়েছে।

কালবেলা: আপনি একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই মন্ত্রণালয় নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

ফরিদা আখতার: বাংলাদেশ একটি প্রাণবৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশ। এটি মাছের দেশ। অথচ আমরা দেশের নদীগুলোকে নষ্ট করে ফেলেছি। এ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্যান্য অনেক মন্ত্রণালয়ের কাজের সম্পর্ক রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ আরও অনেক মন্ত্রণালয় এখানে যুক্ত।

পুষ্টির প্রধান উৎস মাছ, মাংস, ডিম প্রভৃতি। অথচ এগুলোর বাজার সিন্ডিকেট ও চড়ামূল্যের কারণে অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আমার প্রথম লক্ষ্য হবে পুষ্টির প্রধান উৎসগুলো মানুষের নাগালে নিয়ে আসা। অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্য সস্তায় উৎপাদন করতে গিয়ে একে বিষাক্ত করে ফেলছিলাম। সুতরাং বিষমুক্ত করাটাও আমাদের একটি লক্ষ্য হবে। আমরা শুধু সংখ্যার দিক থেকে এক নম্বরে যেতে চাই না, নিরাপদ গুণমানের দিক থেকেও এক নম্বরে যেতে চাই। সেটাই আমার ইচ্ছা। আমাদের শুধু পণ্য ও দ্রব্যসামগ্রীর দিকে তাকালে হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত মানুষদের দিকেও তাকাতে হবে। যে মানুষগুলোর জীবিকা এখানে যুক্ত তাদের দিকে তাকাতে হবে।

কালবেলা: শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছেন। আপনি কি মনে করেন তাদের মনের মতো একটি দেশ আপনারা দিতে পারবেন?

ফরিদা আখতার: আমরা একা এটা পারব না। তবে আমরা তাদের জন্য একটি সুন্দর দেশের ভিত্তি গড়ে দিতে চাই। আমাদের দিক থেকে আন্তরিকতার কোনো অভাব থাকবে না। এ দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এ সরকারে যুক্ত হয়েছি। আমি ধন্যবাদ দিতে চাই ছাত্র-জনতাকে যারা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছেন একটি সুন্দর আগামীর জন্য। আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই, তারা জয়ী হয়েছেন। তবে আমি বলব, তারা যেন এটা না মনে করেন যে তাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এই দেশকে সুন্দর একটি ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সব বাধা দূর করার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই দেশটি আমার, আপনার, সবার, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের। আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে এ দেশকে রক্ষা করব।

আমাদের সব থেকে বড় আশার বাণী হলো, এই দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ তরুণ বয়সের। আমাদের আগামীর বাংলাদেশ এ তরুণরাই। তারাই আগামী ১৫ বছর পর এ দেশকে নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং তাদের কাছে আমার অনুরোধ, একটা সুন্দর দেশ গড়ার সুযোগ আপনাদের হাতে এসেছে, আপনারা সেই সুন্দর দেশটি গড়ে তুলবেন।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রিউমর স্ক্যানার / নুরকে নয়, অন্য কাউকে পেটাচ্ছিলেন লাল টি-শার্ট পরা ব্যক্তি 

আইনি বিপাকে অঙ্কুশ,আদালতে হাজিরার নির্দেশ

গুগলের নতুন এআই মোড ব্যবহার করবেন যেভাবে

অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য দলের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ

ঘরের সামনে পড়েছিল ছাত্রলীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ

নুর ইস্যুতে ভুয়া অডিও নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর বার্তা

সপ্তাহে দুদিন ছুটিসহ পপুলার ফার্মায় চাকরির সুযোগ

নুরের খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা

লাল টি-শার্ট পরা যুবককে নিয়ে পোস্ট রাশেদ খানের

‘স্যার, নাটক আর কত’, আসিফ নজরুলকে নীলা ইসরাফিল

১০

ভারত সফরে যাচ্ছেন পুতিন

১১

নুরকে দেখতে গেলেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল

১২

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে চিঠি / ‘নির্বাচন চাই না, দরকার ইউনূস সরকার’

১৩

ফিফা প্রকাশিত র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে ব্রাজিল, বাংলাদেশ ৪৪তম

১৪

‘ওই নারী যদি ভাগ্যে থাকে দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন’

১৫

টানা ৫ দিন বজ্রবৃষ্টি হতে পারে যেসব জেলায়

১৬

গাজায় প্রতিরোধের মুখে ইসরায়েলি সেনারা, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৭

মাথায় আঘাত পেলে কী করবেন

১৮

নুর-সম্রাটদের ওপর হামলা চালানো লাল টি-শার্ট পরা কে এই যুবক?

১৯

কমলা হ্যারিসের রাষ্ট্রীয় সুবিধায় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ

২০
X