শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০
এস. এম. আব্রাহাম লিংকন
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
এস. এম. আব্রাহাম লিংকনের নিবন্ধ

ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়

bangabandhu-and-Vasha-Andalan
ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের ভাষার সংগ্রাম একদিনের কোনো ঘটনা ছিল না। ১৯৫২ সালের আগে পরে কয়েকটি মিছিল বা ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করাই শুধু ভাষার সংগ্রাম না। তবে ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহিদ রফিক, শফিউর, সালাম, বরকত, জব্বারের জীবনদান ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার মানুষের চূড়ান্ত ক্ষোভের প্রকাশ ছিল। এই হত্যাকাণ্ড মানুষের মুখে নতুন করে প্রতিবাদের ভাষাও জুড়ে দিয়েছিল। যার প্রভাব পরবর্তীতে সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে প্রবলভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। এই ক্ষোভকে জ্যোতিষীর মতোন কাজে লাগিয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষকে স্বাধীকারমুখী করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। অথচ তিনি ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে কৃত ভূমিকা বা অবদানের তুলনায় খুব কমই উল্লিখিত হয়েছেন। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনো তাঁর জীবদ্দশায় কারো প্রতি অভিযোগ বা অনুযোগ করেননি। বরং বঙ্গবন্ধু তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্টদের অবদানকে উদার ও নির্মোহভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে শৃঙ্খলিত করার চেষ্টা পাকিস্তানি শাসকদের শুরু থেকেই ছিল । বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাকিস্তানি ভাবধারার খুনিচক্র মৃত বঙ্গবন্ধুর ওপর এখনো হামলে পড়ে। তারা মৃত বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা থেকেও তিরোহিত করতে নিরন্তর নির্মম প্রচেষ্টায় ক্রিয়াশীল । যেমনটি তারা অনুপ্রবেশ করাতে চেষ্টা করে ২৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার এক পাঠেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তেমনি শুধু ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে যা হয়েছে শুধু সেটি ভাষার লড়াই। ২৭ মার্চ ১৯৭১ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর কোনটিতে বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন না। দু'টি পর্বের দু'টি দিনে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গরাদে বন্দি ছিলেন। এই কারাবাসকে স্বাধীন বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি হিসেবে দেখাতে সচেষ্ট। ভাষার সংঘাে আমাদের ভাষা সংগ্রামীরা একেকজন একেক পর্বে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কি এ কথা দালিলিকভাবে বলা যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন সংগ্রামী যিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাষার লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। ভাষা সংগ্রামে শরীরী ও অশরীরী দু'ভাবেই প্রবল সংযুক্তি ছিল তাঁর।

আমাদের ভূখণ্ডে ভাষার ওপর আক্রমণ নতুন নয়। পরোক্ষ আক্রম শতাব্দীকাল আগেও হয়েছে। এগুলোর পিছনের কারণই হচ্ছে বাংলার পৃথ সত্তার সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনষ্ট করা। বহুজাতিক ও বহুভাষিক ভারতব যখন ব্রিটিশদের বিদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ, তখন ব্রিটিশ রাজন্যবর্গ ঐক্যব ভারতকে বিভক্তির নকশা প্রণয়ন করে ঠাণ্ডা মাথায় তা কার্যকর করতে এগুতে থাকে। এজন্য তারা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে তাদের অনুগত ও অনুসারী তৈরি করতে থাকে। একইসঙ্গে ভারতের ভেতরে প্রিন্সলি স্টেটগুলোকেও তারা কাজে লাগাতে থাকে। যে প্রক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে অবিভক্ত ভারত অরক্ষণীয় হয়ে ওঠে। শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে এ অঞ্চলকে একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। যেখানে অবিভক্ত থাকার সুযোগ ছিল।

এ কথাতো অনস্বীকার্য ১৭৫৭ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যা ইংরেজ করতলগত না হলে বা বহিঃশত্রু দ্বারা পরিচালিত না হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম এ দু'জন নেতা ঐক্যবদ্ধ বাংলার (Greater Bengal)-এর পক্ষে ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তিনি স্বাধীন অখণ্ড বাংলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যে উদ্দোগে সামিল ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যেহেতু বাঙালি এবং বাংলা রাজনীতি অর্থনীতি সমাজে সমগ্র ভারতে শীর্ষস্থানীয় ছিল, সঙ্গত কারণে ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি নেতৃত্বের বিরুদ্ধ একটি শক্তি বিকাশমান হচ্ছিল। তারা ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করে। যদিও আন্দোলনের ফলে সেটি আবার ১৯১১ সালে রদ হয়েছিল। তবে তারা কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়। একইচক্রের ষড়যন্ত্রে সুভাষ বসুও কংগ্রেস থেকে ছিটকে পড়েন। ফলে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগে জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহেরু প্রবল ও ক্ষিপ্র হয়ে ওঠেন। তারা বিভক্ত ভারত রচনায় নিয়ামক হন। ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পাকিস্তান ও ভারত কায়েম হয়। যার মধ্য দিয়ে বাঙালি ও বাংলা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলত ১৯৪৭ সালে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। বাংলার বিভক্তি বঙ্গবন্ধু মানতে পারেননি। বিষয়টি তাঁর লেখা থেকেই পরিষ্কার হওয়া যায়- 'কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। বাংলাদেশের কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলিও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা না-ও পেতে পারি। কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল । আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম । আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে, কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এই ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।' ২ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে এও পরিস্কার হওয়া যায় ১৯৪৭ সালেই বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল । স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েম হলে তারাই ঠিক করতো তারা ভারত না পাকিস্তানের সাথে যাবেন নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করবে। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ঘোষণা করেছিলেন 'আমার রক্তের উপর দিয়ে বাংলাদেশ ভাগ হবে। আমার জীবন থাকতে বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না। সমস্ত বাংলাদেশই পাকিস্তানে যাবে। সোহরাওয়ার্দী আকরাম খাঁ, শরৎ বসু, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমূখের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ : বিভক্ত বাংলা নিয়ে পাকিস্তান কায়েম হয়। স্বপ্নের শহর কলকাতার হাতছাড়া হয়ে যায় । সে সময় ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়ে উঠে মুখ্য।

পাকিস্তান কায়েমের পর নব্য শাসকরা বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত করতে থাকে। যার অংশ হিসেবে বাংলা ভাষার ওপর প্রথমেই আঘাত শুর করে। বাংলা ভাষার ওপর ষড়যন্ত্র অবশ্য এর আগেও হয়েছে। ১৮৮৬ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রতিষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় শিক্ষা সম্মেলনে বাঙালি ও অবাঙালি প্রতিনিধিদের মধ্যে বাংলার মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বাহন বাংলা, উর্দু না ফার্সি এ বিতর্ক দেখা যায়। সামাজিক ভিত্তি ন পেলেও ১৯২৬ সালে নবাব সলিমুল্যাহর পুত্র খাজা হাবিবুল্ল্যাহ পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি শিক্ষার্থীদের মাঝে উর্দু প্রসারে অল বেঙ্গল উ এসোসিয়েশন তৈরি হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিখি ভারত মুসলিম লীগের লক্ষ্ণৌ সম্মেলনে দলের কার্য পরিচালনায় দলের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। শেরে বাংল ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলার শতাধিক কাউন্সিলর তার বিরোধিতা করলে সেটি প্রত্যাহার হয়।

পাকিস্তান নামক একটি অসম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই পূর্ব বাংলা কার্যত পাকিস্তানের কলোনি হয়ে পড়ে। এ ভূখণ্ডের নাগরিকরা হয়ে যায় পরাধীন। ফলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র হয়ে পড়ে নাগরিকের জীবনে হয়ে খড়গ। বঙ্গবন্ধুসহ তরুণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেন পাকিস্তান একটি ভুল রাষ্ট্র। কমিউনিস্টরা পরিবে পরিস্থিতিকে বিবেচনায় ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়, লাখো ইনসান ভূখা হায় শ্লোগান তুলে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের বিরুদ্ধাচারণ করলে শাসক দল জনমানস বিবেচনায় কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে। ফলে ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত পরপরই পূর্ব বাংলা কার্যত বিরোধী দল শূন্য হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে শাসকচক্র সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুসলিম লীগের লড়াকু শক্তিটিকে দলের মধ্যে কোণঠাসা করে ফেলে। তারা নিজ দলে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকেন।

একটি রাষ্ট্রের জন্মের পরই সে রাষ্ট্রের শেষ পরিণতি বুঝতে পারা কঠিন দূরদর্শিতার বিষয়। যেটি রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু ৪৭'-এ বুঝেছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন। যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন 'আমরা শেষ হয়ে গেছি। নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হবে। ওই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও শহিদুল্লাহ কায়সার, আখলাকুর রহমান, রাজশাহীর আতাউর রহমান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একমাসের মধ্যেই ৬-৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ গড়ে তোলেন অসাম্প্রদায়িক যুব সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ' ।

নতুন শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে অবনত রাখার জন্যই বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত করে। প্রথম আঘাতটাই আসে ১৯৪৭ সালে। ২৭ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর ১৯৪৭ শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব গৃহিত হয়। এর প্রতিবাদে খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারি বাসভবনের সামনে ছাত্র শিক্ষক বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ মিছিল হয়। যার অগ্রভাগে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন। পরিস্থিতির অনুধাবনে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে ছাত্রদের সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয় । ছাত্রলীগ প্রণীত প্রথম পুস্তিকাতেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানের সক্রিয় ভূমিকায় সমস্ত জেলায় এক মাসের মধ্যে সংগঠনটির শাখা গঠিত হয় দেশজুড়ে প্রচুর সাড়া পরিলক্ষিত হয়।

৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার বৈঠক যেখানে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়ে মুসলিম লীগ নেতারা স হয়ে ওঠে। বিষয়টিতে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক মহল বেশ নড়ে-চ ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। যে প্রস্তাব ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ শাসকদলের প্রবল বিরোধিতায় বাতিল হয় যায়। এর প্রতিবাদে ২৯ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় ছাত্র ধর্মঘট হয়। এরপর। মার্চ তমুদ্দিন মজলিস ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে বিভিন্ন হল ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি ও অন্যান্যদের নিয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংল ভাষার ওপর আঘাতকে পুঁজি করে পূর্ব পাকিস্তানে সরকার বিরোধ রাজনীতির শক্ত গোড়াপত্তন হতে শুরু হয়। যার পিছনে তরুণ নেতা শেষ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা লক্ষণীয়। ২ মার্চ ১৯৪৮ ফজলুল হ মুসলিম হলে প্রতিনিধি সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পনগঠিত হয়। যে সভায় বঙ্গবন্ধু ও নঈমুদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় ছাত্রলীগ নেতা শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করা হয়। ১১ মার্চ বাংলা ভাষা দাবি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি সফল করার জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান শাসকদের দেয়া ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে যুক্তিসম্মত বক্তব্য তুলে ধরেন। পরদিন ১১ মার্চ পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদসহ অনেককে পিকেটিং করাবস্থায় গ্রেফতার করে। পরে তাঁরা ১৫ মার্চ তারিখ মুক্ত হন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর এ ছিল প্রথম কারাবাস। এই গণগ্রেফতারের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সারাদেশে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়। শাসকগোষ্ঠী যে অন্যায্য করছে সেটি সম্পর্কে জনমানসে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মানুষের মধ্যে আন্দোলকারীদের পক্ষে সহানুভূতির সৃজন হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পরদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে একটি স্মারকলিপি আইনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়।

ক্ষমতাসীন নেতারা ভেবেছিল উর্দুকে সহজেই রাষ্ট্রভাষা করতে পারবে। তাদের সে আশায় বাঙালিরা বাধ সাধে জনসমর্থন না পেয়ে তারা ঘাবড়িয়ে গেলেও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেকে বিরত হয়নি। তারা গভর্নর জেনারেল জিন্নাহকে উর্দুর পক্ষে শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। জিন্নাহ ঢাকায় এলে তার মুখ দিয়ে উর্দুর পক্ষে বলাতে পারলে বাঙালিরা বিষয়টি মেনে নেবে তারা মনে করেছে জিন্নাহ যেহেতু দল মত নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় তাই তিনি বললেই কেল্লাফতে। শাসক দলের ভুল ছিল এখানে। জিন্নাহর ঘোষণায় বাঙালি সাড়া দেয়নি। ২১ মার্চ যখন ঘোড়দৌড় মাঠে জিন্নাহ বললেন- ' একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রইভাষা। তারএঘোষণার তাক্ষণিক পতিক্রিয় হয়েছিল माনি ना মানি না বলে। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ মার্চের কনভোকেশনে গিয়ে জিন্নাহ একই কথার দ্বিরুক্তি করে বললেন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সেখানে ছাত্ররা চিৎকার করে বলেছিল না, না, না।

এর পরে জিন্নাহ পাকিস্তানে ফিরে গেলে সাময়িকভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা নিয়ে কৌশলগত নীরবতা কিছুদিন দেখা যায়। পাকিস্তানিরা যখন নীরব তখন পূর্ব পাকিস্তানে পৃথকভাবে রাজনৈতিক সংগঠন বিনির্মাণে সচেষ্ট হন। মুসলিম লীগের একটি প্রগতিশীল অংশ যাঁদেরকে পাকিস্তানিরা আমলে নেয়নি এবং রাজনৈতিক স্থান না দিয়ে পাকিস্তান বিরোধী হিসেবে আখ্যা দিতে থাকে। যাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেকে ।

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে স্থায়ীভাবে চলে আসেন। তিনি ডেরা পাতেন ১৫০ মোগলটুলি পার্টি হাউসে। সেখান থেকেই তিনি নিত্যদিন নানা কর্মসূচি নিয়ে এগুতে থাকেন। বউ, সংসার, মা, বাবা দেশে চেয়ে তাঁকে বেশি টানেনি। দেশের টানে তিনি ঢাকায় অবস্থান নি পুরোদস্তুর হোলটাইমার পলিটিশিয়ান হয়ে পড়েন। রাজনীতির কোনো কিছুই তাঁর মাথায় ছিলো না। পিতার পরামর্শে ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল আইনে ভর্তি হন বটে। সেখানে যতটা না পড়া তার চেয়ে বেশি ছিল তাঁ অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তিনি ছাত্রলীগের কর্মীবাহিনীসহ হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বছরব্যাি আন্দোলনে। যে আন্দোলন ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৯৪ সালের প্রথমার্ধ অব্দি চলে। শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবের নানাবি কাজগুলোকে গভীরভাবে ফলো করতে থাকে। তাঁকে বিরত করার নানামু ষড়যন্ত্রও করতে থাকে । বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২৯ মার্চ ১৯৪৮ শেখ মুজি রহমানসহ ২৭ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। ১৫ টা জরিমানা ও মুচলেকা দেয়ার শর্ত পালনে অপরাগতা দেখালে বিশ্ববিদ্যাল কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবুর রহমানকে বহিষ্কার করে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ কে দেয়া হয়। ১৯৪৯ সালের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হলে ছাত্রদে শাস্তি বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে ১৮ এপ্রি উপচার্যের বাসভবনে ছাত্র অবস্থান নিলে পরদিন সেখান থেকে ছাত্রনে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি মুক্তি পান ২৬ জুন। তাঁ মুক্তির মাত্র তিনদিন পূর্বে পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে মোড় ঘুরিে আওয়ামী মুসলীম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। যা সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদ হন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ অবস্থায় সেই নবগঠি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করেন। তিনি সে সময়ের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। কমিটি নির্বাচনকালে তাঁর মত নেয় হয়েছিল। একজন ছাত্রনেতা সরাসরি রাজনৈতিক দলের ৩য় গুরুত্বপ ব্যক্তি হিসেবে কমিটিতে স্থান পান। যা তার গুরুত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার বহিপ্রকাশ ছিল। লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনায় মনোযোগ দেন। তিনি বলেন ইসলামী আদর্শের ওপর পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হবে। এ নিয়ে সংখ্যালঘু ও অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসীদের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। একই সময়ে আবারো বাংলা ভাষা সংস্কারের নামে তাতে আরবি হরফ বসানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সরকারি ব্যর্থতার বিরুদ্ধেও সে সময় স্বোচ্চার হন। ফলে তাঁকে আটক রেখে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ক্রিয়াশীল হয় সরকার। সরকার ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে জননিরাপত্তা আইনে। তিনি বন্দি হয়ে পড়েন লম্বা সময়ের জন্য । তাঁর অনুপস্থিতিতে এরপর ১৯৫০ সালের ৭ মার্চ গণপরিষদে উত্থাপিত রিপোর্টে আবারো উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয়। এতে বাঙালিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়।

আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে ১৯৫০ সালের ৪-৫ নভেম্বর গ্রান্ড ন্যাশনাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় যেখানে, সেখানে পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে পূর্ব বাংলার পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসন দেবার দাবি তোলা হয়। স্বায়ত্বশাসনের দাবি তোলার মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাতন্ত্র্যকে প্রথম ইঙ্গিত করা হয়। ভাষা আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য ১৯৫১ সালে ভাষা মতিনকে আহ্বায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের ২৫-২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এরপর ৩১ জানুয়ারি ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে (বার লাইব্রেরি) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, তমুদ্দিন মজলিশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ ৬২টি রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রকেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়। যার আহ্বায়ক হন কাজী গোলাম মাহাবুব। কারা অভ্যন্তরীণ শেখ মুজিব তখন চিকিৎসার জন্য মেডিকেলে। তিনি সেখানেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের নির্দেশ দেন এবং নিজে কারা অভ্য অনির্দিষ্টিকালের জন্য অনশন শুরু করবেন সেটিও তাদের জানিয়ে। এতদবিষয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান পৃষ্ঠা- ১৯৮ থেকে বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতাংশ উল্লেখ করা হলো- 'আমি হাসপাতালে অ সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ।--- আমি ওদের রাত পরে দেখা করতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে বাইরে আইবরা পাহারা দিত। রাত অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছন বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। --- পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে ভাগব না। বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম সর্বদ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে।'

উপর্যুক্ত বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হাসপাতালে বন্দি অবস্থাতেই শেখ মুি রহমান শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে নেতা কর্মীদের ভাষা সং করণীয় নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। হাসপাতালে থেকে বন্দি শেখ মুজি রাজনীতির বিষয়টি গোয়েন্দা চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি ফলশ্রুতিতে ত দ্রুত জেলাখানায় ফিরিয়ে নিয়ে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রি শফিক, জব্বার, বরকত, সালাহউদ্দিন শহিদ হন, আহত হন অনেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলা ও গ্রেফত পরোয়ানা জারি হয় ৷ গ্রেফতার হয়ে যান মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগী খয়রাত হোসেন, আব্দুর রশিদ, খান সাহেব ওসমান আলী, কাজী গোলাম মাহাবুব, খালেক নেওয়াজ, আব্দুল মতিন, অলি আহ আবুল হাি দেশরক্ষা আইনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি হয়ে যান। বন্দি বঙ্গ নেতাদের দেয়া কথা অনুয়ায়ী টানা দশদিন অনশন করেন, তিনি গুরুত অসুস্থ হয়ে পড়লে সরকার ২৬ মাস পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তাঁকে মু প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার আন্দোলন গড়ে তোলায় নিজেকে বিপুল বেগে যুক্ত করেন। এই সময়ে ২৬ এপ্রিল ১৯৫২ বামপন্থিরা ছাত্র ইউনিয়ন নামক একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে একটা ধোয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেটিকে পরিষ্কার করেন। শাসকদল যাতে সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে নোংরামো করতে না পারে সেজন্য তিনি ১৯৫২ সালের ২১ মে করাচি সফরকালে সোহরাওয়ার্দীর নিকট থেকে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত বিবৃতি আদায় করেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সভা সমাবেশেও সোহরাওয়ার্দী বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বঙ্গবন্ধুর দাবিকে সমর্থন করে বক্তব্যও প্রদান করেন। যা বিপুল জনসমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়। এর পরে ৩০ মে করাচিতে ও জুনের মাঝামাঝি লাহোরে বঙ্গবন্ধু পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেন।

বঙ্গবন্ধু ৭ এপ্রিল রংপুরের জনসভায় উর্দুকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে তিনি বক্তব্য দেন। ২৭ এপ্রিল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি সভায় এবং ২৯ এপ্রিল বিবৃতি দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেন। ২৮ আগস্ট ১৯৫৩ তিনি বিবৃিতি দিয়ে বলেন- সরকার প্রদেশের বিদ্যালয়গুলোতে উর্দুকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার চক্রান্ত হইতে বিরত না হলে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে বর্জন করা হবে।

ভাষা আন্দোলনকে ধরে সমগ্র পূর্ববঙ্গে দেশের রাজনৈতিক বিকল্প আন্দোলন গড়ায় বঙ্গবন্ধু মনোনিবেশ করেন। তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠায় যেমন ছুটেছেন তেমনি আন্দোলন-সংগঠন-আন্দোলন পদ্ধতিতে এগুতে থাকেন। সমগ্র দেশে ৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের বিষয়টি আমাদের অজানা নয়। জেলায় জেলায় শহিদ মিনার, নগ্নপায়ে প্রভাতফেরি প্রভৃতি কাজও বাঙালি জাতিসত্তাকে বিকশিত করায় বেশ কাজে দেয়। স্বয়ং মওলানা ভাসানী, আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশসহ বঙ্গবন্ধুর নগ্নপদে প্রভাতফেরির সেই বিখ্যাত ছবি সে কথাকেই স্মরণ করিয়ে পাকিস্তানিদের অপশাসন, বায়ান্নর রক্তদান ও ভাষার দাবিকে পুঁতি বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিতভাবে এগুতে থাকেন। পরিকল্পিতভাবে সংগঠন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঝড় তোলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শুধু তিনি নিজেই জিতেননি সমগ্র দেশে মুসলিম লীগের কবরও রচনা কর যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার প্রথমটিই ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার। ১৬, ১৭ ও ১৮ নং দফা ও ভা আন্দোলন সংক্রান্ত। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি এক পলিটিশিয়ান হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন। জনগণ গ্রহণ করছে পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে মেনে নিতে পারেনি। তারা ১৯ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২/ক ধারা বলে ফজলুল হক এর সরকার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় বাতিল করে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে তারা পরিকল্পিতভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রী হিসেবে শপথের দিে আদমজীতে দাঙ্গা বাধিয়ে মানুষ হত্যা করে কেন্দ্রীয় শাসন জারির প্রস্তুত করে। তাঁর শপথের দুই সপ্তাহের মধ্যেই মন্ত্রিসভা বাতিল হয় এ শেখ মুজিবুর রহমানকে ওইদিনই গ্রেফতার করেন ।

পাকিস্তানিরা শুধু ভাষার উপর আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা পূর্ব বাংল নামও পরিবর্তন করে ফেলে। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষে অধিবশনে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রবল আগ তোলেন। ২১ সেপ্টেম্বরের আলোচনায় স্বায়ত্বশাসনের বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়া পুনরায় পূর্ব পাকিস্তানে তিনি গণপরিষদে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের সুযোগ করে দেয়ার জন্য স্পিকা সি ই গিবনের নিকট জোর দাবি জানান। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ভাষা শহীদদের প্রদি শ্রদ্ধা জানাতে ৫ মিনিট সংসদ অধিবেশন মূলতবি করার প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধু এবং তা গৃহীত হয়, ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ৫ মিনি যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শ করে। ৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বাংলায় ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করার দাবি করেন। অনেক লড়াই সংগ্রামের পর অবশেষে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এই জয় বাংলা ও বাঙালি সত্তাকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সরকার ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস, ভাষা শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দান, শহিদ মিনার নির্মাণে অর্থ সাহায্য করে। শুধু তাই নয় বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করে ১লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পদক্ষেপগুলো তখন গৃহিত হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারি ও ১লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের দিন হিসেবে বিকশিত হতে থাকে। মাহবুব উল আলম চৌধুরীর একুশের প্রথম কবিতা 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখিত শহিদ আলতাফ মাহমুদের সুরে গীত অমর সৃষ্টি 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি সমগ্র জাতিসত্তাকে নাড়া দেয়। ভাষার সংগ্রাম চলার মাঝেই ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানিরা। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্র চর্চায়। এর বিরুদ্ধেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গনে লড়াই হয়। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীকে ধরে সংস্কৃতির লড়াই গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলগুলোর মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়। সে সময়ে রাজনীতি ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে- বিচ্ছিন্নতা ঘটেনি। আইয়ুবের সামরিক শাসনসহ বাংলা ও বাঙালির গণসংগ্রামে সংস্কৃতি কর্মীরাও বঙ্গবন্ধুকে আস্থায় নিয়ে এগুতে থাকেন। ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন শিল্পী সংগ্রামীদেরও নেতা। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তীতে ৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির ৬ দফা ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন অবিসংবাদিত নেতা। শাসকগোষ্ঠী মরিয়া হয়ে ওঠে শেখ মুজিবকে রুখতে। মামলায় মামলায় জর্জরিত করে তোলা হয় তাঁকে। সর্বশেষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর অপচেষ্টা করে। কোনো কিছুই তাঁকে রুখতে পারেনি। শত অত্যাচারে বঙ্গবন্ধু নুয়ে পড়েননি। তিনি দৃঢ়তার সাথে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নিয়েছেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনী ম্যান্ডেট তাঁকে সর্বব্যাপি তোলে। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে আগ্রহী না হয়ে বাঙালির মুক্তি, ও স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবায়নে বিভোর ছিলেন।

রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রের ও আদালতের ভাষা কী হবে সে নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। আদালত পাড়ার দুর্ভেদ্য ভাষা নিয়েও কথা বলেছেন। বিচার আচারে যাতে বাংলা ভাষা ব্যবহার হয় সে কথা তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি আমি ঘোষণা করছি, আমাদের ১৯৭১ বইমেলার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষ চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে- সে হবে না।১০ এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু বলতে তিনি বাংলাদেশ ভূখণ্ড এবং তার ভাষাকেই বুঝিয়েছেন। যার নিয়ামকই ছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তিনি কথা রেখেছিলেন, মুক্ত স্বদেশে ফিরেই তিনি বাংলায় দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি ৪ নভেম্বর ১৯৭২ তারিখে গৃহিত সংবিধান বাংলায় প্রণয়ন করেছেন। যেখানে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের ক্ষেত্রে বাংলা প্রাধান্য পাবে। এখানেই শেষ ছিল না। জাতিসংঘে প্রদত্ত তাঁর বাংলায় ভাষণ, ভাষা ও নবীণ রাষ্ট্রের মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছিল।

ত্রিশ লক্ষ শহিদের স্বপ্ন বীজ আমাদের স্বাধীনতা। যা একজন উর্দি পরা আধা বাঙালির একদিনের এক বেতার ঘোষণা পাঠে আসেনি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কায়েমে বাঙালি জাতিকে নানা পর্বে নানা লড়াই করতে হয়েছে। যে লড়াইয়ে সমগ্র বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ভূমিকাই বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের জন্মের পিছনে প্রধান হয়ে উঠেছিল ।

তথ্যসুত্র:

১. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা- হারুন-অর-রশিদ, অন্যপ্রকাশ

২০২০ পৃষ্ঠা-২০

২. অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান, পঞ্চম মুদ্রণ পৃ ৭৩ ৩. অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান, পঞ্চম মুদ্রণ পৃ ৭৪

৪. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা- হারুন অর রশীদ, অন্যপ্রকাশ ডিসেম্বর ২০২০ পৃষ্ঠা ১১৭

৫. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা- হারুন অর রশীদ, অন্যপ্রকাশ ডিসেম্বর ২০২০ পৃষ্ঠা ১১৭

৬. অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান, পঞ্চম মুদ্রণ পৃ ৮৯

৭. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা- হারুন অর রশীদ, অন্যপ্রকাশ ডিসেম্বর ২০২০ পৃষ্ঠা ৭৮

৮. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা- হারুন অর রশীদ, অন্যপ্রকাশ ডিসেম্বর ২০২০ পৃষ্ঠা ১২৭

a. Secret Documents, Vol. 3 Page 359

১০. বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন: ১৯৪০-১৯৮২, অধ্যাপক সাঈদ- উর-রহমান (ঢাকা: অনন্যা, ২০০১) পৃ. ১৪

১১. মাতৃভাষায় বিচাকার্য, এস.এম. আব্রাহাম লিংকন, দৈনিক সমকাল ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পাতা-৯

১২. তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড,

১৩. পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক- অমলেন্দু দে, পারুল প্রকাশনী, ৮/৩ চিন্তামণি দাস লেন, কলকাতা

১৪. পথরেখা স্বাধীনতার ৪০ বছর- সম্পাদনা নূহ-উল-আলম লেনিন

এস. এম. আব্রাহাম লিংকন: গবেষক, সমাজকর্মী [একুশে পদক প্রাপ্ত]

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলা-গুলি, ছাত্রলীগের ৪ কর্মী আহত

চৈত্রসংক্রান্তি আজ

১৩ এপ্রিল : নামাজের সময়সূচি

দুদিন বন্ধের পর আজ থেকে মেট্রোরেল চালু 

মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার হুমকি ইরানের

বিমান থেকে সংকেত দেখেই দ্বীপ থেকে তিন নাবিককে উদ্ধার

বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুই মাদ্রাসাছাত্র নিহত

সৌদি আরবে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ গেল বাংলাদেশির

এবারই প্রথম স্বস্তিতে মানুষ ট্রেন ভ্রমণ করছেন : রেলমন্ত্রী

খুলনায় ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ গেল শিশুর

১০

দিনদুপুরে তরুণীকে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল

১১

ঈদে পর্যটকে মুখরিত মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত

১২

‘বাঙালিত্বের সঙ্গে ধর্মের কোনো সংঘর্ষ নেই’

১৩

খুলনায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আ.লীগের তিন নেতা গুরুতর আহত

১৪

সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াল বান্দরবান প্রশাসন

১৫

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা চরমে, মার্কিন রণতরীর অবস্থান পরিবর্তন

১৬

দুঃসংবাদ দিল আবহাওয়া অফিস

১৭

মসজিদের টাকার হিসাবকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ১২

১৮

স্ত্রী-সন্তানকে মাংস কিনে খাওয়াতে না পারায় চিরকুট লিখে আত্মহত্যা

১৯

মারাঠা বর্গীদের মতো দেশে লুটপাট চলছে : বিএসপিপি 

২০
*/ ?>
X