

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি এ হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়েছে। কেবল তার মতো আরও একাধিক রাজনীতিবিদের এমন পরিণতি হয়েছে।
শনিবার (০৩ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সরকার এখনো মাদুরো ও তার স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় তিনি বলেন, মাদুরো ও ফ্লোরেস জীবিত আছেন— এর প্রমাণ দাবি করছে সরকার।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রাণঘাতী হামলা। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত নৌযানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া কথিত ভেনেজুয়েলার মাদকবাহী নৌযানের একটি ডকিং এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর কথিত আটক হওয়ার ঘটনা ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলোকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র পানামার সাবেক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগা ও ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনকে আটক করেছিল।
ম্যানুয়েল নোরিয়েগা
১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির সামরিক শাসক ও কার্যত নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় পানামায় মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, গণতন্ত্রের অভাব, দুর্নীতি ও মাদক পাচারকে অভিযানের কারণ হিসেবে তুলে ধরে।
এর আগে ১৯৮৮ সালে মায়ামিতে নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর ক্ষেত্রেও এমনটি করা হয়েছে। নোরিয়েগা ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস আরদিতো বার্লেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এরপর ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর পানামা অভিযান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে ছিলেন। পরে তাকে ফ্রান্সে এবং সেখান থেকে পানামায় পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হুসেইন
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনকে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আটক করে। তার ৯ মাস আগে মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে—ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এমন অভিযোগ তুলে—যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালায়।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম ছিলেন ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে ২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, সাদ্দাম আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি ইরাকে কখনোই গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
সাদ্দামকে তার জন্মস্থান তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় আটক করা হয়। পরে ইরাকি আদালতে বিচার শেষে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির দ্বিচারিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে তেগুসিগালপায় নিজ বাড়ি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট ও হন্ডুরাস বাহিনী আটক করে।
পরবর্তীতে তাকে দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জুনে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের শীর্ষ কৌঁসুলি হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন, যা রাজনৈতিক ও আইনি অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
মন্তব্য করুন