কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জাল টাকার অভিযান ঘিরে ডিবি টিমে দ্বন্দ্ব

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
জাল টাকা। ছবি : ‍সংগৃহীত
জাল টাকা। ছবি : ‍সংগৃহীত

পুরান ঢাকার ওয়ারীতে একটি ফ্ল্যাটে জাল টাকা উদ্ধারের অভিযান নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার তেজগাঁও বিভাগে দুটি পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। অভিযানে থাকা দলটি বলছে, ওই বিভাগের ডিসির নির্দেশমতো উদ্ধার করা টাকা না রাখায় ঝামেলার সৃষ্টি। তবে আরেক পক্ষ বলছে, অভিযানের নামে বড় অঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে আভিযানিক দল। অবশ্য এই ঘটনার জের ধরে সোর্সকে অপহরণের পর হোটেল কক্ষে আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

ডিবি সূত্র, ঘটনার জিডি ও পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দিদারুল ইসলাম দিদার নামে এক সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ নভেম্বর ডিবির তেজগাঁও বিভাগের একটি দল পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে জাল টাকা উদ্ধারে অভিযান চালায়। সেখান থেকে ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল মুদ্রা ও ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। তবে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান অভিযান বন্ধ করে আভিযানিক দলকে চলে আসতে নির্দেশ দেন। আভিযানিক দল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘অবৈধ আদেশ’ অমান্য করে অভিযান অব্যাহত রাখে। অভিযোগ উঠেছে, এক পর্যায়ে ডিবি ডিসি আভিযানিক দলকে উদ্ধার করা ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার মধ্যে ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা জব্দ তালিকায় দেখাতে বলেন। সেই নির্দেশনাও উপেক্ষা করে জাল মুদ্রা রাখার ঘটনায় দুজনকে আটক করে এবং মামলা দেয় আভিযানিক দল। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন তেজগাঁও বিভাগের সহকারী কমিশনার তারেক সেকেন্দার।

পুলিশ ক্যাডারের ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাকিব খান অভিযানটি চালানোর সময় গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে অতিরিক্ত উপকমিশনার এবং তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার (ডিসি) ছিলেন। গত ৫ জানুয়ারি তাকে বদলি করে সিটিটিসির সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগে ভারপ্রাপ্ত ডিসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আর জাল টাকা উদ্ধারের অভিযানে নেতৃত্বে দেওয়া সহকারী কমিশনার (এসি) তারেক সেকান্দার অতিরিক্তি পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে রাঙামাটি জেলা পুলিশে কর্মরত।

অবশ্য ওই অভিযানের সূত্র ধরে কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার গিভেন্সি হোটেলের ৮০৫ নম্বর কক্ষে ওই অভিযানের সোর্স দিদারকে তিন দিন ধরে আটকে রাখা হয়। ডিবি তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই কক্ষে তাকে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুরো ঘটনা পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত গড়ায় তদন্ত কমিটি পর্যন্ত। বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির মধ্যে তোলপাড় চলছে।

ঘটনার নেপথ্যে জাল টাকা উদ্ধার ও চক্র ধরার অভিযান: ওয়ারী থানায় দায়ের মামলা ও ডিবির আভিযানিক সূত্র জানায়, ৮ নভেম্বর পুরান ঢাকার ওয়ারীর জুড়িয়াটুলী এলাকার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহ চক্রের সদস্যদের ধরতে অভিযান চালান গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের সদস্যরা। অভিযানে নূরুল হক ও সাইদুল আমিন নামে দুজন জাল টাকার কারবারি গ্রেপ্তারসহ ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল টাকা ও ১৯ লাখ ৭০ হাজার আসল টাকা উদ্ধার হয়।

ওই অভিযানে থাকা ডিবির একাধিক সদস্যের দাবি, উদ্ধার হওয়া টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা সরিয়ে রাখাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ছেড়ে দিয়ে পুরো বিষয়টিই চেপে যাওয়ার নির্দেশনা আসে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সহকারী কমিশনার তারেক সেকান্দারের কাছে। ডিবি তেজগাঁও বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান এই নির্দেশনা দেন। এমন অবৈধ নির্দেশনা অমান্য করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। এরপরই অভিযানের সোর্স দিদারকে তুলে এনে আভিযানিক দলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে নানা ঘটনার জন্ম দেন।

পুরো ঘটনা জানিয়ে ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া তারেক সেকান্দার পুলিশ সদর দপ্তরে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এর সূত্র ধরে তার কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘স্যার আমাকে পুরো বিষয়টাই (অভিযান শুরু থেকে মামলা করার আগ পর্যন্ত) এড়িয়ে যেতে বলেন। তখন আমি স্যারকে জানাই এটা অবৈধ, আমার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। পরে আমি গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করি। ডিসি স্যারের অবৈধ আদেশ না শুনে আইন অনুযায়ী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে উদ্ধার করা জাল মুদ্রা ও নগদ ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার জব্দ তালিকা করি।’

তারেক সেকান্দারের অভিযোগ, অভিযানের পরদিন তিনি ডিসির কক্ষে গিয়ে বিস্তারিত জানালে ডিসি হুমকি দেন যে, ‘বেশি বুঝলে চাকরি করতে পারবা না।’

অভিযানে থাকা ডিবির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তারা অভিযানের নেতৃত্বে থাকার এসির আদেশ মান্য করতে গিয়ে ডিসির অবৈধ আদেশ মানেননি। তবে অভিযানের পর ডিসির রোষানলে পড়েন। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযানের সোর্সকেই তুলে আনেননি, অভিযানের টিমকে রুমে ডেকে নিয়ে বাবা-মাকে উল্লেখ করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।

ডিবির এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘সোর্স দিদারুলের অবস্থান শনাক্তের পর স্ত্রী মমতাজের অনুরোধে ১ ডিসেম্বর রাতে গিভেন্সির সামনে যান এসি তারেক সেকান্দার। যদিও তিনি তখন পদোন্নতির পর যোগদানকালীন ছুটিতে ছিলেন। ঘটনাস্থলে তারেক সেকান্দারকে দেখে ডিসি রাকিব আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং তাকে মারধর করেন।’

জাল টাকার অভিযান থেকে শুরু করে গিভেন্সি হোটেলে দিদারকে উদ্ধার পর্যন্ত ঘটনার সবকিছুই পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা তারেক সেকান্দার। তাকে মারধর করার বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

সেই সূত্র ধরে অধস্তন কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার বিষয়ে ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তবে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে হেডকোয়ার্টারে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি আপনার কাছে থেকেই প্রথম জানলাম। যদি অভিযোগ হয়ে থাকে তাহলে সঠিক প্রক্রিয়ায় সেটি তদন্ত হবে।’

জাল টাকার অভিযান বন্ধ করা এবং উদ্ধার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা জব্দ তালিকায় না দেখানোর নির্দেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একজন ডিসি। আমি এ ধরনের অবৈধ আদেশ দিতে পারি না। ওই টিমটি অপকর্ম করে নানাভাবে ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে টিমের দুজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ওই অভিযানে উদ্ধার করা টাকা থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সহকারী কমিশনার তারেক সেকান্দারসহ অভিযানে থাকা অন্য সদস্যরা আত্মসাৎ করেছেন। কয়েক কোটি টাকা উদ্ধার করা হলেও তা সংখ্যায় কম দেখানো হয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে এরই মধ্যে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একটি অভিযোগ দিয়েছেন ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান। ওই অভিযোগ তদন্তে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে ডিবির পক্ষ থেকে। তদন্ত করছেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন।

জানতে চাইলে মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করব না। কাজ শেষ হোক, তারপর।’

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ওয়ারী জুড়িয়াটুলী এলাকার সেই বাসায় গিয়ে কথা হয় অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা কয়েকজনের সঙ্গে। তবে অভিযান চালানো সাততলার ফ্ল্যাটটি বন্ধ ছিল। জুড়িয়াটুলীতে আটতলা বাড়ির সাত তলায় অভিযান চালিয়ে জাল টাকা, আসল টাকা ও টাকা গণনার মেশিনসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করেছিল ডিবি পুলিশ। গতকাল সেই বাড়ির ছয়তলার বাসিন্দা রাসেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমার ফ্ল্যাটের ওপরের তলার ফ্ল্যাটেই অভিযান হয়। অভিযানের সময় এই বাসার বিভিন্ন তলার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বেশ কিছু জাল টাকা ও নগদ টাকা জব্দ করে ডিবি। তিনি বলেন, ডিবি প্রথমে তার বাসায় নক করেছিল। পরে ভুল ফ্ল্যাট বুঝতে পেরে ওপরের তলার ফ্ল্যাটে এসব পায়।

টাকা জব্দ করার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাড়ির তিন ও চারতলার বাসিন্দা আনোয়ারসহ কয়েকজন। আনোয়ার জানান, প্রায় দুই মাস আগের ঘটনা, ঠিক কত টাকা জব্দ হয়েছিল, এখন ঠিক সেটা মনে নেই। জাল ও আসল টাকা উদ্ধার হয়েছে।

যেভাবে উখিয়া থেকে হোটেল কক্ষে সোর্স দিদারুল: পারিবারিক সূত্র ও থানার জিডির তথ্যানুযায়ী, গত ২৯ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কোর্টবাজার এলাকা থেকে দিদারুল আলম দিদার নামে এক ব্যক্তিকে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে আনেন। ঘটনার তিন দিনের মাথায় গত ১ ডিসেম্বর দিদারের স্ত্রী মমতাজ বেগম উখিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে তার স্বামীর সন্ধান চেয়ে বলা হয়, তার স্বামীকে উখিয়ার কোর্ট বাজার এলাকা থেকে কে বা কারা অপহরণ করেছে। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা খোঁজ পান, কারওয়ান বাজারে হোটেল গিভেন্সিতে দিদারের অবস্থান, তাকে সেখানে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে উখিয়া থানায় যোগাযোগ করা হয় এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে উদ্ধারের অনুরোধ জানানো হয়। উখিয়া থানা ও জরুরি সেবার আহ্বানে ডিএমপির তেজগাঁও থানার টহল দল গত ১ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৩টা থেকে ৪টার দিকে হোটেল গিভেন্সিতে অভিযান চালায়। থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তেজগাঁও থানায় নিলেও ওইদিন ভোরে ডিবি কর্মকর্তা রাকিব খান তার টিম দিয়ে দিদারকে জোর করে ডিবি হেফাজতে নিয়ে যান। যদিও ডিবির ওই কর্মকর্তার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা নয়। তবে ডিবি হেফাজতে রেখে ৪ ডিসেম্বর তাকে উখিয়া থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

উদ্ধারের পর ডিবি হেফাজতে দুদিন রাখা হলেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে দিদারের পরিবারকে জানানো হয়নি। ২ ডিসেম্বর দিদারের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন তার বাবার সন্ধান চেয়ে ডিএমপি কমিশনারের কাছে আবেদন করেন।

দিদারুল আলমকে তুলে আনা এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার মাঝখানে কোনো আইনের ব্যত্যয় হয়েছে কি না—জানতে চাইলে ডিএমপির সাবেক কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি নাইম আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘কেউ নিখোঁজ হলে বা অপহরণ হলে সেই সংক্রান্ত কোনো জিডি যদি সংশ্লিষ্ট থানায় হয়ে থাকে, তাহলে তাকে উদ্ধারের পর সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে যদি বলি, তাকে আদালতে তুলে তারপর সংশ্লিষ্ট থানা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবে। যদি থানা পুলিশ মনে করে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিল, তাহলে আদালতে না তুলেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। এ ক্ষেত্রেও থানা-পুলিশ আদালতে একটি প্রতিবেদন দেবে।’

কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে হোটেল গিভেন্সির রেজিস্টার বইয়ে অতিথির নাম ইংরেজিতে লেখা ছিল—‘মিস্টার দিদার’। ব্র্যাকেটে ডিবি ও রেফারেন্সে লেখা ছিল ‘জিএম স্যার।’ রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, দিদার সেখানে পৌঁছান ৩০ নভেম্বর এবং বের হন ২ ডিসেম্বর। সেই হিসাবে দুই রাতের জন্য ভাড়াও পরিশোধ করা হয়েছে ৭ হাজার টাকা।

কক্ষের ভেতর একজন ব্যক্তিকে আটকে রাখার বিষয়ে জানতে হোটেল গিভেন্সিতে গিয়ে কথা হয় অভ্যর্থনা কক্ষের দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি ওই বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে হোটেলটির ব্যবস্থাপক আশিকের সঙ্গে কথা হয় কালবেলার। তিনি বলেন, ‘কামরুল নামে একজন ডিবির পরিচয়ে আমাকে বলেন, আমার একজন পরিচিত লোক থাকবে। তাকে যেন একটা রুম দেওয়া হয়। আমি বলেছি, পাঠিয়ে দিতে। সিঙ্গেল একজন পুরুষ মানুষ থাকবে, এজন্য আমি বিষয়টি নিয়ে আর অন্য কিছু ভাবিনি। কামরুল সাহেবের পদ-পদবি আমি শুনি নাই।’

হোটেল ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে ৮০৫ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেওয়া ‘ডিবি সদস্য’ কামরুলের খোঁজে নামে কালবেলা। একপর্যায়ে তার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। হোটেল কক্ষ ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বেমালুম অস্বীকার করেন। বলেন, ‘এই ব্যাপারে আমি অবগতই নই। আমি কিছু জানি না। আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।’ পুরো ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টির তথ্যপ্রমাণ পেয়েই তার বক্তব্য চাওয়া হচ্ছে, এমনটি জানানো হলে উল্টো তিনি বলেন, ‘আপনি যে নম্বরে কল দিয়েছেন, সেটি কামরুলের কী নাম এটা আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে?’

কামরুলের এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটির বিষয়ে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান করা হয়। তাতে দেখা যায়, তার ব্যবহৃত (০১৯১৯…) মোবাইল নম্বরটি রাজশাহীর শিবপুর এলাকার ৫৬ বছর বয়সী এক নারীর নামে তোলা।

এই কামরুল পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই)। ঘটনার সময় থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ডিবির তেজগাঁও বিভাগে এসআই পদে কর্মরত।

দিদারকে তুলে এনে ডিবি হেফাজতে না রেখে হোটেল কক্ষে আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাকিব খান কালবেলাকে বলেন, দিদারুল আলম নামে কাউকে তিনি চেনেন না। পাল্টা প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘ওই ব্যক্তিকে উখিয়া থেকে তুলে নিয়ে আসা এবং গিভেন্সিতে রাখার বিষয়ে ডিবির সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ আছে কি?’

কালবেলার হাতে সব ধরনের প্রমাণ আছে এবং ডিএমপি কমিশনারের কাছে দিদারের ছেলের অভিযোগে বলা হয়েছে, গিভেন্সি হোটেলে তার বাবাকে উদ্ধারের সময় তিনি (রাকিব খান) উপস্থিত ছিলেন—এমন তথ্য জানালে পুলিশ কর্মকর্তা রাকিব খান বলেন, ‘ওই অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য তার (দিদার) পরিবারের পক্ষ থেকে তো একটা অ্যাপ্লিকেশন দেওয়া হয়েছে। ওটা একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল।’

পুলিশ কর্মকর্তা রাকিবের কাছে জানতে চাওয়া হয়, হোটেল কক্ষ থেকে দিদারকে উদ্ধারের সময় গিভেন্সিতে আপনার উপস্থিতি ছিল, কেন গিয়েছিলেন? জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আমি ওখানে ছিলাম এটার কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’

অবশ্য দিদারকে উদ্ধার অভিযানে যাওয়া থানা পুলিশের সূত্র এবং হোটেলটির আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কালবেলা ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।

দিদারকে উদ্ধার অভিযানে হোটেল গিভেন্সিতে যান তেজগাঁও থানার এসআই গিয়াস। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। তবে দিদারের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি। আমাদের আগেই একটা পার্টি (টহল দল) সেখানে গিয়েছিল। আমরা গিয়ে হোটেলের সামনে রাকিব স্যারকে দেখেছি। (ঘটনাটা) ডিবির কোনো একটা বিষয় হয়তো। পরে রাকিব স্যার দিদারকে ডিবি হেফাজতে নিয়ে যান।’

গিভেন্সি থেকে ডিবি অফিসে নিয়ে নির্যাতন করে জিডি ও অভিযোগ তুলতে বাধ্য করা হয়: দিদারের স্বজনরা বলছেন, থানা পুলিশ দিদারকে উদ্ধারের পরও তাকে তাদের কাছে দেওয়া হয়নি। তাকে ডিবিতে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও অপহরণের পর তাকে উদ্ধারে পরিবারের পক্ষ থেকে ডিবির কোনো সহায়তা চাওয়া হয়নি। ডিবিতে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং পরিবারকে উখিয়া থানায় করা জিডি তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেন ডিবির রাকিব খান। তবে দিদারকে ডিবিতে নেওয়ার পর স্ত্রী মমতাজ ও ছেলে সাজ্জাদ হোসেন ডিবির তেজগাঁও বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে জানান এবং দিদারকে ছাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন।

গত ২ ডিসেম্বর সাজ্জাদ ও মমতাজের এ ধরনের অনুরোধ জানানোর একাধিক অডিও রেকর্ড কালবেলার হাতে এসেছে। ২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ৪০ মিনিটের একটি অডিও রেকর্ডে সাজ্জাদকে কক্সবাজারের স্থানীয় ভাষায় বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘জিডি তুলে নেওয়ার জন্য বারবার চাপ দিচ্ছে।’

দিদারের স্ত্রী মমতাজ বলেন, ‘এগুলো তো সমাধান হয়ে গেছে। এখন এসব আর কী বলব?’ কী ঘটেছিল আর কী সমাধান হয়েছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি মহিলা মানুষ, এত কিছু জানি না।’

অবশ্য দিদারের একাধিক স্বজন জানান, পুরো ঘটনাটি নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। এখনো চাপে আছেন।

ঘটনাকে বৈধতা দিতে ডিবির জিডি বই ফাঁকা রেখেছিলেন ডিসি রাকিব: দিদারের পরিবারকে উখিয়া থানায় করা জিডি তুলে নেওয়া এবং ডিএমপি সদর দপ্তরে দেওয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে কালবেলার অনুসন্ধানে। এর প্রমাণ হিসেবে কালবেলা সংগ্রহ করেছে ডিবির ‘সাধারণ ডায়েরি বহি’-এর ডিসেম্বরের ২ ও ৩ তারিখের পাতা। সেখানে দেখা গেছে, ২ ডিসেম্বরের বইটির ৭৮২১৪৯ পাতার ৬১ ক্রমিকের অংশটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। তবে সেই অংশে ইংরেজিতে ডিসি তেজগাঁও লিখে রাখা হয়েছে এবং সময় লেখা রয়েছে ৫টা ৫০ মিনিট। ভোর বা বিকেল কোনোটাই উল্লেখ নেই। একইভাবে ৩ তারিখে বইটির ৭৮২১৬২ নম্বর পাতাটির উপরের অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছে। সেই অংশটিতে অবশ্য ক্রমিক নম্বর ছিল না। একজন পরিদর্শকের স্বাক্ষর ছিল সেই অংশে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পুলিশের অনুশাসন অনুযায়ী জিডি বই ফাঁকা রাখা আইনসিদ্ধ নয়। অবৈধ আটককে বৈধতা দেওয়ার জন্য বা বর্তমান ঘটনাকে আগের দেখানোর জন্য এভাবে ফাঁকা রাখতে চান কেউ কেউ। তবে এটা সঠিক চর্চা নয়। অবশ্য কালবেলার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মোহাম্মদ রাকিব খানের বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাফসান-জেফারের ছবিতে সাফার আবেগঘন মন্তব্য

চবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগ চায় ছাত্রদল

ইসলামপন্থার একবক্স নীতি বহাল রাখতে আলোচনা চলমান : ইসলামী আন্দোলন

নতুন কর্মসূচি দিয়ে সড়ক ছাড়লেন ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা

মানুষ আমাকে ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে : তাহেরী

মস্তিষ্কে স্ট্রোক ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে সংকটাপন্ন হুজাইফা

গোধূলিতে নতুন ‘অস্ত্র’ পেলেন গার্দিওলা

স্ত্রীর দাবিতে ইউপি সদস্যের বাড়িতে ২ নারী, ঘরে আছে আরেক বউ

অনুদানের টাকা ফেরত দিচ্ছেন তাজনূভা জাবীন

ফুরফুরে মেজাজে পরী

১০

সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে স্বর্ণ, রেকর্ড গড়ল রুপা

১১

কাতারের মার্কিন ঘাঁটি ছাড়তে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা

১২

নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক অফিসে গুলি

১৩

ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কোনো প্রেমিক নেই : মিমি চক্রবর্তী

১৪

একযোগে ‘সুখবর’ পেলেন বিএনপির ১৩ নেতা

১৫

গাজায় গণহত্যায় ইসরায়েলকে মুসলিম দেশের সহায়তার গোপন নথি ফাঁস

১৬

ঋণখেলাপি / কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থীর রুল ২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ

১৭

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমিরকে শোকজ

১৮

মাকে জীবিত কবর দেওয়ার চেষ্টা ২ ছেলের

১৯

জীবন দিয়ে হলেও সীমান্ত রক্ষা করব : ফেলানীর ভাই

২০
X