কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নারীরা যখন সুযোগ পায় ভবিষ্যৎ বদলে দেয়

দেশে জনপরিসরে প্রথম বক্তব্যে জাইমা রহমান
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ছবি : কালবেলা
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ছবি : কালবেলা

বাংলাদেশের সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন চাইলে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে শুধু শিক্ষা, অফিস বা নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; তাদের ঘর, প্রতিষ্ঠান এবং মানসিকতায়ও পৌঁছাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তিনি বলেছেন, ‘যখন নারীদের দূরে না ঠেলে স্বাগত জানানো হয়, তখন তারা শুধু নিজেদের জীবনই বদলায় না; তারা তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং জাতির ভবিষ্যৎও বদলে দেয়।’

গতকাল রোববার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শীর্ষক’ পলিসি ডায়লগের বক্তব্যে এসব কথা বলেন ব্যারিস্টার জাইমা। দেশে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জনসমক্ষে এটি তার প্রথম বক্তৃতা। অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নারীর ক্ষমতায়নে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরেন। উপস্থাপক কাজী জেসিনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) চেয়ারম্যান, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী হক চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদসহ বিভিন্ন পেশার নারীরা।

ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যের শুরুতেই জাইমা রহমান বলেন, ‘আমাদের আদর্শ আলাদা, অভিজ্ঞতা আলাদা, দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। তারপরও আমরা একসঙ্গে বসেছি, আলোচনা করছি। কারণ, আমরা সবাই ভাবছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। আর এই ভিন্নতা নিয়েই একসঙ্গে কথা বলা, একে অন্যকে শোনা, এটাই তো গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য! বাংলাদেশের পলিসি লেভেলে এটাই আমার প্রথম বক্তব্য। আমি বিশ্বাস করি, নিজের ছোট জায়গা থেকেও সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবারই থাকা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আমার দাদা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বুঝতেন, নারীদের বাদ দিলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। তিনি নারীদের বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে এবং জনজীবনে সক্ষম অবদানকারী হিসেবে দেখতেন। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি নারীদের নেতা হিসেবেও তৈরি করতেন। তার নেতৃত্বে, পোশাক খাতের সম্প্রসারণের ফলে লাখ লাখ নারী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক কাজে প্রবেশ করে আয় এবং স্বাধীনতা অর্জন করে।

মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় তৈরির মাধ্যমে এই দৃঢ় বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছিল যে নারী ও মেয়েদের জীবন উন্নত করার জন্য ইচ্ছা এবং কাঠামো প্রয়োজন। এগুলো শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, এগুলো ছিল ব্যক্তিগতভাবে তিনি যে মূল্যবোধের দ্বারা জীবনযাপন করেছিলেন তার একটি সম্প্রসারণ।’

জাইমা আরও বলেন, ‘সেই ভিত্তিটি আমার দাদি খালেদা জিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। যিনি শিক্ষার রূপান্তরকারী শক্তি বুঝতেন, যা নারীদের কণ্ঠস্বর, আত্মবিশ্বাস এবং পছন্দ প্রদান করে। তার শাসনামলে মেয়েদের শিক্ষাকে সুযোগের পরিবর্তে অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিনামূল্যে মাধ্যমিক শিক্ষা, শিক্ষার জন্য খাদ্য এবং শিক্ষার জন্য নগদ অর্থের মতো কর্মসূচির পাশাপাশি, লাখ লাখ মেয়েকে স্কুলে রাখতে সাহায্য করেছিল এবং সারা দেশে পরিবারের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে বসবাস আমাকে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিখিয়েছে; নীতি এবং প্রবেশাধিকার শুধু সমতা তৈরি করে না। আপনি শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে পারেন, আইন পাস করতে পারেন এবং জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। যদি সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন প্রত্যাশা এবং মানসিকতা অসম থাকে, তাহলে ক্ষমতায়ন ভঙ্গুর থাকে। বাংলাদেশে নারীরা এখনো প্রায় ৮৫ শতাংশ অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজ করেন। প্রতিদিন পুরুষের তুলনায় সাত গুণ বেশি ঘণ্টা এই শ্রমে ব্যয় করেন। আমাদের জিডিপির প্রায় ১৯ ভাগ মূল্যের এই কাজটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূলত অদৃশ্য রয়ে গেছে। লিঙ্গ সমতা শুধু নারীদের বিষয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক এবং জাতীয় বিষয়।’

জাইমা রহমান বলেন, ‘সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা আমার পরিবার থেকেই এসেছে। আমার বাড়িতে একজন নারী নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি দেশব্যাপী সমাজকল্যাণ সংস্থা গড়ে তুলতে পারেন কি না, তা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। আমার মা সরকারি হাসপাতালে প্রায়ই পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পেশাদারভাবে দক্ষতা অর্জন করে চলেছেন। কারণ, তিনি বাড়িতে উৎসাহ এবং সমর্থন পেয়েছিলেন ক্যারিয়ার এবং পরিবার উভয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য।’

এ সময় নিজের নানির (সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু) ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন জাইমা। তিনি বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী, সক্ষম, সফল এবং এমন অসাধারণ নারীদের দ্বারা বেষ্টিত থেকে বড় হয়েছি। আমি সমানভাবে ভাগ্যবান যে আমার বাবা এবং আমার দাদাসহ যারা নারীদের মূল্য দিতেন এবং তাদের শক্তি বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার দ্বারা কখনো হুমকি বোধ করেননি। প্রকৃতপক্ষে, আমার বাবার জীবনের চারজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন নারী এবং তিনি তাদের সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে আচরণ করেছেন; ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, বরং আদর্শ হিসেবে।’

নিজের পরিবারের উদাহরণ দিয়ে জাইমা রহমান বলেন, ‘আমি একমাত্র সন্তান এবং কখনো আমাকে এমনটা অনুভব করতে দেওয়া হয়নি যে আমার বাবা-মা একটি পুত্র কামনা করেন। আমার বাবা একবার কাউকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্যও তিরস্কার করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বাড়িতে আমার সঙ্গে সম্মান এবং যত্নের সঙ্গে আচরণ করা হলেও বাইরের পৃথিবী সব সময় একই রকম থাকবে না। বক্তৃতা নয়, বরং তার ধারাবাহিকতাই আমাকে গড়ে তুলেছে। তার দৈনন্দিন পছন্দের মাধ্যমে তিনি আমাকে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর কাছ থেকে আমার কী আশা করা উচিত? এভাবেই পরিবর্তন টেকসই হয়। যখন পুরুষরা সততার সঙ্গে অবচেতন পক্ষপাতের মুখোমুখি হয় এবং তাদের কর্মের মাধ্যমে সম্মানের মডেল তৈরি করে, তখন তারা নারীদের শুধু বেঁচে থাকার জন্যই নয়, বরং উন্নতির জন্যও জায়গা তৈরি করে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকারি কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিলের মুনাফার হার নির্ধারণ

খামেনিকে বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করলেন ইরানের নির্বাসিত নেতা

এবার ম্যাচ বয়কটের হুমকি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখলেন প্রধান উপদেষ্টা

জামায়াত-এনসিপিসহ ৪ দলকে সতর্ক করল ইসি

অর্ধশতাধিক আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, কারণ জানাল খেলাফত মজলিস 

মোটরসাইকেলে ভারতীয় সেনাদের ব্যতিক্রমী কসরত

আগামী দিনে জাতির নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান : মান্নান

এবার ভারত মহাসাগরে বিতর্কিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জে নজর ট্রাম্পের

চেতনানাশক মিশ্রিত জুস খাইয়ে লুট, গ্রেপ্তার ৫

১০

এভাবেই তো নায়ক হতে হয়!

১১

জঙ্গল সলিমপুরে শিগগিরই অভিযান : র‍্যাব ডিজি

১২

সমর্থকরা আটকে রাখলেন প্রার্থীকে, ভিডিও কলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার

১৩

জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন : উপদেষ্টা রিজওয়ানা

১৪

ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে জমিয়তের বৈঠক

১৫

আইসিসি থেকে মিলল সুখবর

১৬

যে নিয়মে বাড়িভাড়া বাড়াতে হবে মালিককে

১৭

কড়াইল বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাট ও ক্লিনিক স্থাপনের আশ্বাস তারেক রহমানের

১৮

আমরা বুড়ো হয়ে গেছি—চঞ্চলকে বললেন পরী

১৯

রূপায়ণ সিটির বার্ষিক বিক্রয় সম্মেলন ২০২৫ অনুষ্ঠিত

২০
X