রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩১ এএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৪৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারবিরোধী আন্দোলন

এখনই বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছে না বিএনপি

এখনই বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছে না বিএনপি

৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ বাতিল এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভোট বর্জন করা বিএনপি। তবে এখনই বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছে না দলটি। ঘুরে দাঁড়াতে আপাতত থেমে থেমে রুটিন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের নতুন করে সংগঠিত ও সক্রিয় করতে চান হাইকমান্ড। এ লক্ষ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, একদফার পাশাপাশি তারা এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের অভাব, নাগরিক হয়রানির ঘটনাসহ জনস্বার্থ ইস্যুতে মাঠে থাকবে। একই সঙ্গে নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলে তা নিয়ে তাৎক্ষণিক কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কালবেলাকে বলেন, বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ৭ জানুয়ারির একতরফা ও ডামি নির্বাচন বর্জন এবং প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং এই সরকার ও সংসদ অবৈধ। সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে রয়েছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতেই থাকবে।

বিএনপির আন্দোলন ও বর্জনের মধ্যেই গত ৭ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্ররা ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে মূল্যায়ন সভা ও বৈঠক করছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে গত শুক্রবার সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর এবং অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যৌথসভা করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সালাহউদ্দিন আহমেদ। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়।

জানা গেছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আগামী দিনের কর্মসূচি প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু এবং মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পবিত্র রমজান শুরু হওয়া ছাড়াও ঈদুল ফিতরের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তির বিষয়টিও প্রাধান্য দেওয়া হয়। এসব বিষয় মিলিয়ে আন্দোলনে এই মুহূর্তে ‘ধীরে চলো নীতি’ অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের সক্রিয় ও চাঙ্গা করতে দেশব্যাপী লিফলেট বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় স্থায়ী কমিটি। সরকার পতনের একদফা সামনে রেখে এক বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করলেও চূড়ান্ত সফলতা পায়নি বিএনপি। এতে করে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। বিএনপির হাইকমান্ডের আশা, লিফলেট বিতরণের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা যাবে। একদফার আন্দোলন ঘিরে এখনো আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরাও এখানে সক্রিয় হতে পারবেন।

চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে গতকাল রোববার দেশব্যাপী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সব জেলা শহরে এবং ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি সব উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ। এ ছাড়া ১৬ ফেব্রুয়ারি ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে সেসব দেশের সীমান্তরক্ষীদের ছোড়া গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের স্মরণে বাদ জুমা সারা দেশের সব মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে যৌথসভায় লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি সফলে সর্বোচ্চসংখ্যক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় ও চাঙ্গা করতে সারা দেশে সাংগঠনিক সফর এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে রমজানের আগে ঢাকায় সমাবেশের প্রস্তাব করেন নেতারা। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সংগঠন ও নেতাকর্মীরা সক্রিয় হবেন। এ ছাড়া নেতারা এসএসসি পরীক্ষার বন্ধে শুক্র ও শনিবার কর্মসূচি রাখা তথা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখারও প্রস্তাব করেন। সাংগঠনিক সম্পাদক এবং অঙ্গসহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের দেওয়া এসব প্রস্তাবনা নিয়ে শিগগির বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে।

৭ জানুয়ারির নির্বাচন ইস্যুতে দলের হাইকমান্ডের মূল্যায়ন নিয়ে গত ৭ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। বিএনপি মনে করে, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে ‘প্রহসনমূলক ও ডামি নির্বাচন’ হয়েছে। এতে জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল না। স্থায়ী কমিটির ওই সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, বিএনপির আবেদনে সাড়া দিয়ে নির্বাচন বর্জন ও ফল প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে জনগণ প্রমাণ করেছে, বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান গণআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। বিএনপির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গণমানুষের এই নীরব প্রতিবাদ, এই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন বস্তুত বিএনপির রাজনীতির সফলতা তথা বিজয়ের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে ইলেকশনের নামে সিলেকশন নাটক মঞ্চস্থ করতে আওয়ামী লীগের যে সহিংসতা-নাশকতা, প্রকৃত কোনো বিরোধীদলীয় প্রার্থী না থাকার পরও যে অনিয়ম-কারচুপি, ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের যে অদ্ভুত-অবিশ্বাস্য দাবি এবং এসব ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা-হতাশা, সেখানেই আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় নিহিত।

জানা গেছে, দলের হাইকমান্ডের এ মূল্যায়নের সারমর্ম নিয়ে লিফলেটের পাশাপাশি বুকলেট তৈরিরও চিন্তাভাবনা চলছে। সাংগঠনিক সফরের সিদ্ধান্ত হলে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মিসভা কিংবা বর্ধিত সভায় হাইকমান্ডের ওই মূল্যায়ন বুকলেট আকারে নেতাকর্মীদের কাছে তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া সেমিনারের মধ্য দিয়ে তা সুধী সমাজের কাছেও তুলে ধরার চিন্তা রয়েছে বিএনপির।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর গত ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি ঢাকাসহ দেশব্যাপী কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। দ্বাদশ সংসদ বাতিল, একদফা দাবি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ভোটের পর মাঠে নামে বিএনপি। এ ছাড়া সংসদ অধিবেশন শুরুর দিন গত ৩০ জানুয়ারি সংসদ বাতিল এবং একদফা দাবিতে ঢাকাসহ দেশব্যাপী একই কর্মসূচি ছিল দলটির। তবে পুলিশি বাধার মুখে অধিকাংশ স্থানে কালো পতাকা মিছিল করতে পারেনি বিএনপি।

বিএনপির দাবি, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের আন্দোলনের নৈতিক বিজয় হয়েছে। কিন্তু রাজপথের আন্দোলনে সরকারের পতন না হওয়াকে কার্যত আন্দোলনের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাই আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে তাদের কী ধরনের দুর্বলতা ছিল, আন্দোলন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত নেতাদের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, অঙ্গ-সংগঠনগুলো কেমন দায়িত্ব পালন করেছে—দলের ভেতরে এখনো সেসবের মূল্যায়ন চলছে। এর ভিত্তিতে রোজার পর সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে দলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ড এখনো দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানা গেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’

দুর্ভিক্ষ থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে গাজার ৬ লাখ মানুষ : জাতিসংঘ

অজানা রোগে ৪ দিনে ৮ গরুর মৃত্যু

এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, কারাগারে দুই শিক্ষক

ফরাসি অভিনেতার বাড়িতে মিলল ৭২টি বন্দুক

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের শপথ বিকেলে

নিলাম ছাড়াই সরকারি ব্যারাকের ঘর ভেঙে নিলেন ইউপি সদস্য

ঢাকা আইনজীবী সমিতির ভোটগ্রহণ শুরু 

মৌলভীবাজারে জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস পালিত

নিয়োগ দিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ

১০

তামিম নাকি সাকিব, ফাইনালে খেলবে কে

১১

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭টি পদে নেবে ১৮১ জন 

১২

ব্রিজ থেকে নদীতে পড়ল বাস, নিহত ৩১

১৩

লিপ ইয়ার নিয়ে যেসব তথ্য জানলে অবাক হবেন

১৪

আমের মুকুলে মিষ্টি সুবাস

১৫

ঢাকার যেসব এলাকায় আজ ১৫ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না 

১৬

ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন মৃৎশিল্পীদের

১৭

মধ্যপ্রাচ্যে টিকে থাকতে ইসরায়েলকে যা করতে বললেন বাইডেন

১৮

রাজপথ দখলে আবারও মাঠে নামছে ইমরান খানের পিটিআই

১৯

আ.লীগ নেতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার

২০
X