বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মিলন কান্তি দে
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:১৫ এএম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৪১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্গাপূজা যুগে যুগে

দুর্গাপূজা যুগে যুগে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেবী দুর্গাকে আনন্দময়ী বলে অভিহিত করেছেন। কারণ আনন্দের মাঝেই আসে জীবনের পরিপূর্ণতা। অসুর বিনাশিনীরূপে দশভূজা দেবী দুর্গার আগমন ঘটে প্রতি বছর, প্রতি শরতে। দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব।

পণ্ডিত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ তার ‘দেবী দুর্গা’ প্রবন্ধে বলেছেন, প্রাচীনকালে ঋষিরা ধ্যানের সময় আগুন না জ্বালিয়ে সেখানে ‘দক্ষকন্যা’ বা কুণ্ডের ওপর গীতবর্ণের মূর্তি স্থাপন করতেন। মূর্তিটি ছিল অগ্নির প্রতীক এবং তার নামকরণ করা হয়েছিল ‘হব্যবাহনী’। এই মূর্তিই পরে পরিণত হলো দুর্গায়। ‘কুণ্ডের দশদিক দুর্গার দশহাত’ এবং বৈদিক যুগের শেষ দিকে দেখা যায় ‘দক্ষকন্যা’ ক্রমশ: উমাতে পরিণত হলেন। রমাপ্রসাদ চন্দ্র তার এক নিবন্ধে বলেন, দুর্গাপূজার যত প্রাচীন উৎসবই খুঁজি না কেন, সবচেয়ে প্রাচীন যে মহিষমর্দিনীর মূর্তিটি পাওয়া গেছে, তা পঞ্চম শতাব্দীর। গবেষকদের আলোচনায় জানা যায়, সভ্যতার তিনটি পর্যায়ে মানুষ তিন রকমের পূজা করতেন। সাত্ত্বিকী পূজায় দেওয়া হয় নৈবেদ্য। তবে তা আমিষ নয়, করা হয় জপ ও যজ্ঞ। রাজসী পূজায় দেওয়া হতো বলি এবং নৈবেদ্য হতো আমিষের। তাপসী পূজায় জপ, যজ্ঞ, মন্ত্র কিছুই লাগত না।

তবে নৈবেদ্য দেওয়া হতো মদ-মাংস দিয়ে। দুর্গোৎসব সম্পর্কে একটি মূল্যবান গ্রন্থ আছে বিমল চন্দ্র দত্তের। ওই গ্রন্থে দেখা যায়, প্রথম শতকে কুষান যুগে, চতুর্থ-পঞ্চম শতকে গুপ্ত যুগে, সপ্তম শতকে পল্লব যুগে এবং ১১-১২ শতকে সেন বংশের আমলে দেবীর মহিষমর্দিনীর রূপ ছিল। সেই সময়ের দুর্গা প্রতিমার কিছু চিত্র এখনো আঁকা আছে মধ্য এশিয়ার তাজিকিস্তানের পেনজিকেন্ট শহরে দুটি মন্দিরের দেয়ালে। কুষান যুগে দুর্গা ছিলেন লাল পাথরের তৈরি, হাত ছিল দুটি। পায়ের নিচে সিংহ, বাঁ হাতে ত্রিশূল, ডান হাতে অভয়মুদ্রা। পাল যুগে অর্থাৎ ১২৮৯ সালে দেবীর তিনটি চোখ এবং চারটি হাত ছিল। দশভূজা অর্থাৎ দশ হাত দুর্গার আত্মপ্রকাশ ঘটে আঠারো শতকে।

বাংলাদেশে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন হয় মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। সম্রাটের বিদূষক কুল্লুক ভট্টের পিতা উদয় নারায়ণ কুলোপুরোহিত রমেশ শাস্ত্রীর কাছে যজ্ঞানুষ্ঠানের পরামর্শ নিয়ে পূজা করেন। পরে উদয় নারায়ণের পৌত্র অর্থাৎ কুল্লুক ভট্টের পুত্র কংসনারায়ণ তাহিরপুরের রাজা হন (এখন রাজশাহী জেলায়)। পণ্ডিতরা এ বিষয়ে সবাই একমত যে, রাজা কংসনারায়ণই এ দেশে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা। এই পূজার ব্যয় হয়েছিল সেই আমলের ৯ লাখ টাকা।

বাংলাদেশের সব জেলায় ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসবের বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরা বক্ষ্যমান নিবন্ধে সম্ভব নয়। তবু কিঞ্চিত উল্লেখ করছি। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় বিক্রমপুর পরগনার ভাগ্যকুল জমিদারবাড়ির রাজা ব্রাদার্স এস্টেটের এবং সাটুরিয়া থানার বালিহাটি জমিদারবাড়ির দুর্গাপূজা আয়োজনের ব্যাপকতায় কিংবদন্তি হয়ে আছে। ঢাকা শহরে সর্বপ্রথম দুর্গোৎসবের ব্যাপক প্রচলন ঘটে নবাব সলিমুল্লাহর আমলে। সে সময় সিদ্ধেশ্বরী জমিদারবাড়ি ও বিক্রমপুর হাউসে জাঁকজমক সহকারে পূজা হতো। ১৯২২-২৩ সালে আরমানিটোলার জমিদার ছিলেন বিক্রমপুরের রাজা ব্রাদার্সের বাবা শ্রীনাথ রায়। রায়বাড়ির পূজা দেখার জন্য প্রতিদিন প্রচুর বিদেশি নাগরিক মণ্ডপে উপস্থিত থাকতেন। সমসাময়িককালে আরও যেসব জমিদার পূজার আয়োজনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন, তারা হলেন ফরাশগঞ্জের রূপলাল দাশ, রঘুনন্দন দাশ, বাংলাবাজারের শিরিশ দাশ, আরএন দাশ, কে এম দাশ, অভয় দাশ, প্যারী দাশ ও প্রেমময় দাশ। পুরান ঢাকার অনেক রাস্তাঘাট, অলিগলি এখনো সে যুগের অনেক জমিদারের নামের সাক্ষ্য বহন করছে।

লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজাও অনেক পুরোনো। অনুমান করা হয়, প্রায় ৯২ বছর ধরে এখানে নিয়মিত পূজা হয়ে আসছে। ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা ১৯১৬ সালে। সেই হিসাবে এবারে পূজার বয়স ১০৩-এ পড়ল। দুর্গাপূজার কথা বলতে গেলে শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারের নাম আসবেই। শাঁখারীবাজারে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু হয় ইংরেজ আমলের একেবারে শেষের দিকে। এককভাবে পূজাটি করেন সুরেশ্বর ধর নামে এক ব্যবসায়ী। ১৯৫৫ সালে বারোয়ারী পূজা শুরু হয় ৪৭ নম্বর বলরাম ধরের বাড়িতে। এরপর ’৭০ সালে গঠিত শাঁখারীবাজারের শারদীয় পূজা সংসদের উদ্যোগে পূজা অনুষ্ঠান শুরু হয়। তাঁতী বাজারের মোক্তার ফণীভূষণ ধর নিজ বাড়িতে একক উদ্যোগে একটানা ২৫-২৬ বছর ধরে পূজা করতেন। তার শেষ পূজা ছিল ’৭২ সালে। এখানকার আরও উল্লেখযোগ্য পূজা ছিল বাগানবাড়ি ও কোতোয়ালি শিবমন্দিরে। ’৭১-এ মন্দিরটি পাকিস্তানি বাহিনী ধ্বংস করে। এক সময় ঢাকা শহরে কেমন প্রতিমা উঠত ১৯৪০-এর একটি পরিসংখ্যানে তা জানা যাবে। সূত্রাপুরে ১১টি, রায়েরবাজারে ৮টি, রথখোলায় ৩টি, লক্ষ্মীবাজারে ৪টি এবং ওয়ারীতে ২টি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর দুর্গাপূজার ঐতিহ্যগত ধারারও বিচ্যুতি ঘটে।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের জমিদারবাড়ি, পাবনার জমিদারবাড়ি, টাঙ্গাইলের আর পি সাহার বাড়ি, নেত্রকোনার আশুজিয়া, নওপাড়া, বাড়বি প্রভৃতি তালুকদার অধ্যুষিত গ্রামে ব্যয়বহুল পূজার আয়োজন ছিল গর্ব করার মতো। ১৯৭১-এর পর শৃঙ্খলমুক্ত মাতৃভূমিতে ‘মাতৃবন্দনায়’ নতুনভাবে আন্দোলিত হয় সনাতন সমাজ। বারো মাসে তেরো পার্বণের বাংলাদেশে উৎসবের বান নামে। স্বাধীনতার পর প্রথম পূজা উদযাপনের উদ্যোগ নেয় শাঁখারীবাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যগোষ্ঠী। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি গঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। সংঘ মিত্র সংসদ ১৯৮২ সাল থেকে এবং নবকল্লোল গোষ্ঠী ’৮৪ সাল থেকে শাঁখারীবাজারে পূজার আয়োজন করে আসছে। ২০০৮ সাল থেকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বনানী-গুলশান পূজামণ্ডপে। এ উপলক্ষে এ বছর তারা যুগপূর্তির বিশেষ অনুষ্ঠান করছে। সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে ১৯৯১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহালয়া। প্রতি বছরই প্রতিমার সংখ্যা বাড়ছে। এবার সারা দেশে প্রতিমার সংখ্যা ৩১ হাজার ১০০। ঢাকা শহরে এবার পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ২৩৭। এবার দেবীর আগমন ও বিদায় একইভাবে, ঘোটকে। ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দুর্গাতিনাশিনী দুর্গাকে আবাহন করে প্রতি বছর।

লেখক: যাত্রা ব্যক্তিত্ব

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘ফিল্মি স্টাইলে’ হামলা চালিয়ে পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনতাই

অবশেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা-দাফনের সময় জানাল ইরান

বিশ্বকাপের আগেই সুসংবাদ / নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির বার্তা

মাঝ আকাশে বিমানের জানালার কাচ ভাঙলেন যাত্রী!

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

১০

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

১২

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

১৩

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১৪

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১৫

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১৬

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৭

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৯

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

২০
X