আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৬ এএম
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৯ এএম
অনলাইন সংস্করণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারে উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থার ভিত্তি হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই যুগে নির্বাচন আর শুধু ব্যালট, কেন্দ্র কিংবা ভোট গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচন এখন ডিজিটাল স্পেসে স্থানান্তরিত হয়েছে—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (এআই) একদিকে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করছে ভয়ংকর সংকট।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ অমূলক নয়; বরং বলা যায়, এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের শঙ্কা সময়ের আগেই সতর্ক হওয়ার একটি দায়িত্বশীল প্রয়াস।

এআই : আশীর্বাদ না অভিশাপ—নির্ভর করছে ব্যবহারের ওপর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বরং সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এআই নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও গতিশীল করতে পারে। ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ফলাফল বিশ্লেষণ—এসব ক্ষেত্রেই এআই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই প্রযুক্তি রাজনৈতিক স্বার্থে অপব্যবহৃত হয়। ভুয়া ভিডিও, বিকৃত অডিও, মিথ্যা তথ্য ও পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হলে এআই গণতন্ত্রের জন্য এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়।

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ও এআই গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিও (Yoshua Bengio) এক সতর্কবার্তায় বলেছেন— “Artificial intelligence can be used to amplify truth, but it can just as easily amplify deception at an unprecedented scale.”

অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন সত্যকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি অভূতপূর্ব মাত্রায় প্রতারণাকেও ছড়িয়ে দিতে পারে।

এআই অপব্যবহারের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো ডিপফেক প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখাবয়ব ও কণ্ঠ নকল করে এমন বক্তব্য তৈরি করা যায়, যা বাস্তবে তিনি কখনো বলেননি। সাধারণ ভোটারের পক্ষে এসব সত্য-মিথ্যা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—“Deepfakes represent one of the most serious emerging threats to democratic discourse, particularly during elections.”

অর্থাৎ ডিপফেক গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য, বিশেষ করে নির্বাচনের সময়, সবচেয়ে গুরুতর উদীয়মান হুমকিগুলোর একটি।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডিপফেক দ্রুত ছড়ায় কিন্তু ডিজিটাল যাচাইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল। ফলে ডিপফেকের প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।

বর্তমান নির্বাচনী বাস্তবতায় এআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, টার্গেটেড বিজ্ঞাপন, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আবেগ উসকে দেওয়া—এসব এখন নিত্যদিনের কৌশল। এর ফলে একটি কৃত্রিম জনমত (Manufactured Public Opinion) তৈরি হয়, যা প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন নয়।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন— “Social media manipulation powered by এআই has become a routine strategy in elections across the world.”

অর্থাৎ এআই-চালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ম্যানিপুলেশন বিশ্বজুড়ে নির্বাচনে একটি নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতাই নির্বাচন কমিশনকে ভাবিয়ে তুলছে—নির্বাচনের মাঠ শুধু দৃশ্যমান নয়, অদৃশ্য ডিজিটাল যুদ্ধেও পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন ও ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এআই-এর মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কমিশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে আমি মনে করি। কারণ এই সংকট প্রযুক্তি, আইন, রাজনীতি ও সামাজিক আচরণের সম্মিলিত ফল।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন—“Without safeguards, এআই can undermine trust in institutions and erode democracy itself.”

অর্থাৎ যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং গণতন্ত্রকেই ক্ষয় করে দিতে পারে।

এই বক্তব্য নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও অর্থবহ করে তোলে।

আইন ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন থাকলেও এআই ও ডিপফেক নির্ভর নির্বাচনী অপরাধ মোকাবিলায় এখনো সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক নীতিমালার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ আইন প্রতিক্রিয়াশীল—অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে। অথচ নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ক্ষতি হয়ে গেলে তা আর পূরণ করা যায় না।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই EU এআই Act প্রণয়ন করেছে, যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় উদাহরণ

এআই অপব্যবহার রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই ছাড়া কোনো ভিডিও, অডিও বা তথ্য প্রচার করলে গণমাধ্যম নিজেই গুজবের বাহকে পরিণত হয়।

একই সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হান্না আরেন্ট একবার বলেছিলেন— “The ideal subject of totalitarian rule is people for whom the distinction between fact and fiction no longer exists.”

অর্থাৎ যেখানে সত্য ও কল্পনার পার্থক্য বিলুপ্ত হয়, সেখানেই স্বৈরশাসনের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়। এআই অপব্যবহার সেই বিভ্রান্তিকর বাস্তবতাকেই আরও গভীর করে তুলছে।

নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ না নেয়, তাহলে তা শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সুতরাং নির্বাচন কমিশনের এখনই করণীয় হচ্ছে—এআই ও ডিপফেক শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।

নির্বাচনকালীন বিশেষ ডিজিটাল মনিটরিং সেল গঠন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে বাধ্যতামূলক সমন্বয়। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ডিজিটাল আচরণবিধি। নাগরিক পর্যায়ে মিডিয়া লিটারেসি কার্যক্রম।

প্রযুক্তিকে শাসন করতে না পারলে, প্রযুক্তিই শাসন করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো শত্রু নয়। কিন্তু নৈতিকতা, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বাইরে গেলে সেটিই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ তাই ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ভোটকেন্দ্রে নয়, ডিজিটাল দুনিয়াতেও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ব্যালট বাক্স নিরাপদ থাকলেও জনগণের মন ও মত দখল হয়ে যাবে—এআই-এর অদৃশ্য কারসাজিতে।

গণতন্ত্র রক্ষার এই নতুন যুদ্ধে সচেতনতা, সমন্বয় ও সাহসী সিদ্ধান্তই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা। [email protected]

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুখবর পেলেন মোস্তাফিজুর রহমান

স্থায়ী পুনর্বাসন ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি আমিনুল হকের

রবিনের ধানের শীষেই আস্থা সাধারণ ভোটারদের 

হাদি হত্যা / ফয়সালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রুবেল ফের রিমান্ডে 

বেকার সমস্যা সমাধানে বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে বিএনপি : মিন্টু

ভোটাধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির আহ্বান হাবিবের

পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা উত্তর কোরিয়ার

‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া এক জাদুকর মেসি’

সোহেল হত্যায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের যাবজ্জীবন

আন্তর্জাতিক মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় সেরা ৮-এ কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

১০

নিজ দলের প্রার্থীকেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা গণঅধিকারের নেতাকর্মীদের

১১

লক্ষ্মীপুরে যাচ্ছেন জামায়াত আমির

১২

বিয়ের আগে যে ৭ প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি

১৩

প্রতিটি মুসলিম যেন এই অনুভূতি পায় : মারিয়া মিম

১৪

রমজানে বিনামূল্যে ইফতার পাবেন ১২ লাখ মানুষ

১৫

মুক্তিযোদ্ধা চাচাকে বাবা বানিয়ে চাকরি, কারাগারে জেষ্ঠ্য সহকারী সচিব

১৬

বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকে শোকজ

১৭

ইরানে মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একজনের মৃত্যদণ্ড কার্যকর

১৮

সাত সাগর আর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে মুখোমুখি জায়েদ-তানিয়া

১৯

দেশে ফিরতে চান সালাউদ্দিন

২০
X