গত বছর ৫ আগস্ট নজিরবিহীন অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় দেশ পরিচালনার। এরপর শুরু হয় নানা কর্মযজ্ঞ। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন গণমাধ্যমে বেরিয়ে আসতে থাকে বিগত সরকারের টানা দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত একের পর এক যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও পাচারের খবর, তা এক কথায় অভাবনীয়।
সোমবার দেশের আলোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলমের আরও একটি অর্থসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় কালবেলায়। ‘রেমিট্যান্সে এস আলমের ভয়ানক ছোবল’ শীর্ষক প্রধান শিরোনামের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর তারা কীভাবে কালো থাবা বসিয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত চিত্র।
প্রতিবেদনটির দাবি, রেমিট্যান্স হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত এই ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে। এস আলম ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন দেশ; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে হুন্ডির ভয়ানক চক্র তৈরি করে। ওই চক্রের একটি দল প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে বিদেশি মুদ্রা কিনে নিত। আর বাংলাদেশে থাকা চক্রের সদস্যরা প্রবাসীর পরিবারকে টাকা পরিশোধ করত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ ও চলতি হিসাব থেকে টাকা তুলে নিয়ে ওইসব টাকা দিত এই এস আলম গ্রুপ। ব্যাংক খাতে ব্যাপক প্রভাব থাকায় দেশ থেকে টাকা পাচারের এই কৌশল কাজে লাগায় তারা। তারা রেমিট্যান্সের ডলার ক্রয় করে ওই অর্থ দেশের ব্যাংকগুলো থেকে বেনামি ঋণ নিয়ে পরিশোধ করত। এভাবে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নামে তুলে নেওয়া হয় ৩ হাজার কোটির বেশি। আর এসব করতে আশ্রয় নেওয়া হয় নানা অনিয়ম ও নয়ছয়ের। যুক্ত করা হয় মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টসহ এস আলমের হুন্ডি চক্রের মানি এক্সচেঞ্জ, ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারী ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ব্যক্তিদেরও।
আমরা জানি, অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের ১৫ বছরের আর্থিক অনিয়ম দুর্নীতি পাচারসহ আর্থিক কেলেঙ্কারি বের করতে একটি শ্বেতপত্র কমিটি করে। সেই কমিটির রিপোর্টে বিগত সময়ের আর্থিক অনিয়মের যে চিত্র দেখানো হয়, তা অচিন্তনীয়। দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি সীমাহীন দুর্নীতি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত ধ্বংস, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা তছরুপসহ অসংখ্য অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা সংঘটিত হয়। এসব অনিয়ম সম্ভব হয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। আর যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ, তাদের মধ্যে এস আলমের নাম প্রথমদিকে। দেশের বাইরে কোনো একটি দেশের ধনীর তালিকায় প্রথমদিকে রয়েছে তাদের নাম। অভিযোগ উঠেছে, এসব টাকা অবৈধভাবে পাচার করা। এভাবেই কেউ বিদেশে কিনেছে শত শত বাড়ি। গড়ে তুলেছে বড় ব্যবসা।
এই চিত্র নিঃসন্দেহে বিগত সময়ের দুঃশাসন-অপশাসনেরই সাক্ষ্য বহন করে। এস আলমের বিরুদ্ধে ওঠা রেমিট্যান্সে ছোবলের অভিযোগ তদন্ত করা হোক। তদন্তসাপেক্ষে অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমাদের বিশ্বাস, একদিন সমাজ বদলাবে। দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, ন্যায়সংগত সমাজ গড়ে উঠবে। এজন্য দরকার সত্যিকার গণতন্ত্রের চর্চা। জরুরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এমন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার।