শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩৩
রুশাইদ আহমেদ
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৩ এএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:২২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম্পার ফলনই কি শেষ কথা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম্পার ফলনই কি শেষ কথা!

স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। হাজার হাজার স্কুল-কলেজের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে দেশে ১৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করে উচ্চশিক্ষার প্রসারে অবদান রাখছে। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, বহু বছর ধরে আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণার দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সাধন করতে পারছে না। পেছনের কারণ হিসেবে জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনীহা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে উচ্চশিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেট হতে নগণ্য বরাদ্দ প্রদান। তার ওপর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু অসাধু কর্তাব্যক্তির যৎসামান্য সেই বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাটের প্রবণতা তো আছেই।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক শিক্ষায়তন যেখানে জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান উৎপাদন এবং গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও সম্পৃক্ত থাকেন এ জ্ঞান উৎপাদন এবং গবেষণা কার্যক্রমে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক শাখা ইউনেসকোর আদর্শ মানদণ্ড মোতাবেক, একটি রাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই হার মাত্র ১.৭৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। উপরন্তু, এ বরাদ্দের অধিকাংশই আবার ব্যয় করা হয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে। ফলে গবেষণায় বরাদ্দের পরিমাণ হয় আরও নিম্নগামী।

আদতে নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা ক্ষেত্রে গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃজনে অবদান রাখা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। কিন্তু বিপরীতে, সাম্প্রতিককালে দেশব্যাপী বেশ কয়েক বছর ধরে পাইকারি দরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক শিক্ষা খাতে মানের অবনমন ঘটাতে নিয়ামক হয়ে উঠছে বলে অভিমত তাদের। কেননা, যেখানে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই পর্যাপ্ত গবেষণা কার্যক্রম এবং একাডেমিক অগ্রগতির প্রতি যথাযথভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে না; সেখানে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষাব্যবস্থার বোঝাকে আরেক ধাপ বৃদ্ধি করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সমন্বিত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দাবি এ সংকটকে নিয়ে যাচ্ছে আরও উঁচুতে। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা তো আরও এক ধাপ ওপরে উঠে ‘তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়ার দাবিতে শুরু করেছেন ব্যাপক আন্দোলন। অথচ ১১ একর আয়তনের কলেজটির শিক্ষার্থীরা ঢাবির মাধ্যমে কিংবা ঢাবি অধিভুক্ত হওয়ার পূর্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে গবেষণা খাতে বরাদ্দ পেতে এভাবে রাজপথে নেমেছিলেন কি না, তা এক অদম্য কৌতূহলের বিষয়!

উপরন্তু কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হলে সেখানে কর্মরত প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) শিক্ষা ক্যাডারে উন্নীত হওয়া ব্যক্তিরা কলেজে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পান। এর সঙ্গে কলেজগুলোর বর্তমান শিক্ষকরা গবেষণা কার্যক্রম ও জ্ঞান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে পারেননি এখনো। এসব কারণেই ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পর কলেজটির যৎসামান্য শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানটিতে পরবর্তীকালে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকেও শিক্ষার মান হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রসমূহ রাজনৈতিক বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ফলে প্রকৃত মেধাবীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন আর যোগ্যতা বিবেচনা না করে যারা প্রশাসনিক সুবিধা পাচ্ছেন, তাদের অনেকে গবেষণা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের বদলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হলে শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণার জন্য আলাদা তহবিল গঠন করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের অর্থায়নের ক্ষেত্রেও স্বনির্ভর হতে হবে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা প্রকল্প থেকে অর্থ উপার্জন করে এবং সেই অর্থ গবেষণার জন্য পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশেও যদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়, তাহলে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।

সার্বিকভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দেওয়া আরও বেশি জরুরি। এরপরও শিক্ষার্থীদের দাবির কারণে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে শুধু নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার মানের সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যে সফল হতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের জ্ঞান সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনের পথ আরও সুগম করতে হবে। একাডেমিক পাঠদানের সর্বোচ্চ মানোন্নয়ন এবং গবেষণা কার্যক্রমের ওপর জোর দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল গঠনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া উচ্চশিক্ষার খাতকে এ ধরনের সংকট থেকে বের করে আনার ভিন্ন কোনো উপায় নেই।

রুশাইদ আহমেদ, শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ওয়ারী পাস্তা ক্লাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, দগ্ধসহ আহত ৮

‘মেয়েদের মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ালেখা ফ্রি করবে জামায়াত’

শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপি নেতা মাহাবুবের জামায়াতে যোগদান

আগামীর জন্য বিনিয়োগ : সিঙ্গার বাংলাদেশের নতুন যুগ

মদিনায় ২১ লাখ বৃক্ষরোপণ করল সৌদি সরকার

এবার নিশিরাতে নির্বাচন করতে দেব না : তারেক রহমান

ফ্ল্যাট থেকে জনপ্রিয় অভিনেত্রীর মরদেহ উদ্ধার, গৃহকর্মী পলাতক

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ : হাবিব

যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে যাচ্ছে শক্তিশালী ‘বোম্ব সাইক্লোন’

পিটিয়ে মানুষ হত্যাকারীদের কাছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয় : গোলাম পরওয়ার

১০

প্রেমিক বিবাহিত, সন্তানও আছে! গোপন তথ্য ফাঁস করল চ্যাটজিপিটি

১১

টেলিগ্রামে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারকারী গ্রেপ্তার

১২

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান তারেক রহমানের

১৩

নেদারল্যান্ডসে প্রযুক্তি খাতে বছরে ৪০ হাজার কর্মীর চাহিদা, সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

১৪

ইরানে হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না আজারবাইজান

১৫

‘বি’ ইউনিটের মাধ্যমে শেষ জবির ভর্তি পরীক্ষা

১৬

ক্ষমতার রাজনীতি করতে আসিনি : মান্নান

১৭

ঘুম থেকে উঠে মানুষ নাম নেয় আল্লাহর, একজন নেন আমার : মির্জা আব্বাস

১৮

প্যারাডাইস ল্যান্ডের ‘আশুলিয়া আরবান সিটি’র শুভ উদ্বোধন

১৯

নিজের ছাড়া অন্যের ভোটের দিকে হাত বাড়াবেন না : জামায়াত আমির

২০
X