রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২০ পৌষ ১৪৩২
প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৫, ০৭:২৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ ও খেলাপি সংস্কৃতি

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ ও খেলাপি সংস্কৃতি

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বলা হয় অর্থনীতির হৃদযন্ত্র। এ হৃদযন্ত্র যদি রক্ত পাম্প না করে, রাষ্ট্র নামের দেহব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়বে। কিন্তু বাংলাদেশে এই হৃদযন্ত্রে পচন ধরেছে। হিসাবের খাতা বলছে, আমরা ঋণ দিয়েছি। বাস্তবতা বলছে, টাকা আর ফেরত আসবে না। খেলাপিদের শ্বেতশুভ্র করপোরেট মুখাবয়ব যেন রাষ্ট্রের নরম হাতের আশ্রয়ে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ব্যাংকের দেয়ালে ‘আস্থা’, ‘নিরাপত্তা’, ‘সেবা’ এ শব্দগুলো ধ্বনিত হয় ঠিকই কিন্তু বাস্তবে তা যেন এক নিষ্ঠুর পরিহাসে পরিণত হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত রেগুলেটরি কাঠামো এবং দুঃসাহসী দুর্বৃত্তায়ন সব মিলিয়ে যেন ধ্বসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টর।

এটা শুধুই অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা নয়; রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার এক গোপন দেউলিয়াত্বও। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে যে টাকা সাধারণ জনগণের আমানতের ভান্ডার থেকে ধার দেওয়া হয়েছিল, তার একটি বিশাল অংশই আর ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। এটা শুধু সংখ্যা নয়, বরং অর্থনীতির রক্তক্ষরণ। ঋণখেলাপের বেড়াজালে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ধারণাটিই আজ বিকৃত হয়েছে। এখান ঋণ হলো একশ্রেণির জন্য মূলধনের প্রবেশপথ আর অন্যশ্রেণির জন্য দেউলিয়াত্বের পূর্বাভাস।

করপোরেট খেলাপিদের দীর্ঘ তালিকায় নাম আছে নামি-দামি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, প্রভাবশালী শিল্পপতি ও রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের। তারা কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিনিয়োগ তো করেনইনি বরং বিভিন্ন চ্যানেলে পাচার করেছেন। অথবা লোকদেখানো প্রকল্পের নামে সেই টাকায় আত্মীয়-পরিজনের নাম নথিভুক্ত করে রেখেছেন। এটি দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগত ক্ষমতার অপব্যবহারের নামান্তর হয়ে উঠেছে।

ব্যাংক খাতের এ সংকটের মূলে রয়েছে সুশাসনের অভাব। মূলত ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি—এ সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছে। ব্যাংকগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার করে। ফলে অযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ পায়। এ ঋণগুলোর বেশিরভাগই পরে খেলাপি হয়ে যায়। কারণ এগুলো প্রদান করা হয় অপ্রতুল জামানত এবং দুর্বল ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, গত দশকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রকৃত ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়নি। এ অবিবেচনা শুধু ব্যাংকের সম্পদ নষ্ট করেনি, বরং অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর অক্ষমতা এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বাংলাদেশে আইনি প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘসূত্র যে, একটি খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে ঋণখেলাপিরা তাদের সম্পদ স্থানান্তর করে ফেলে। ফলে ব্যাংকের ব্যবস্থা নেওয়ার কিছুই থাকে না। এ পরিস্থিতি একটি বিষাক্ত সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে ক্ষমতাশালীদের ঋণ পরিশোধ না করাটাই একটি সামাজিক আচরণে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল ব্যাংক খাতের এ অরাজকতা কঠোর হাতে দমন করা। কিন্তু বাস্তবে ঋণখেলাপিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ধরনের নীরব অবস্থান লক্ষ করা গেছে। এক রিপোর্টে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে মাত্র ১২টি উল্লেখযোগ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, যেখানে প্রতি বছর গড়ে ৫০টিরও বেশি অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এ রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার দুর্বলতা প্রকাশ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতপশিলকরণ নীতি খেলাপি ঋণের সমস্যা আরও জটিল করেছে। এ নীতিতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখায়, যা তাদের আর্থিক দুর্বলতা আড়াল করছে। ফলে সমস্যার মূল কারণ সমাধানের পরিবর্তে এটি শুধু স্থগিত হয়ে ফাইল বন্ধ থাকছে।

ব্যাংকগুলোর মূলধন ক্ষয়ের কারণে ঋণ প্রদান ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, যা শিল্প ও বাণিজ্যে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে। আরও গভীর ক্ষত হচ্ছে জনগণের আস্থায়। একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪০ শতাংশ আমানতকারী ব্যাংকে তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ আস্থার সংকট ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটকে তীব্র করছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করে তুলছে। গত পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য মুনাফা হারিয়েছে। এ অর্থ যদি অর্থনীতিতে পুনঃবিনিয়োগ করা যেত, তাহলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত। এ ক্ষতি শুধু ব্যাংকের নয়; এটি পুরো দেশের ক্ষতি। তবে এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব যদি আমরা এখনই সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারি। ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে হবে। ঋণ বিতরণে ঝুঁকি বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া সহজ করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। ঋণখেলাপিদের নাম প্রকাশ করতে হবে যেন সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয়। ঋণ পরিশোধে বাধ্য হয় খেলাপিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাও এ সংকট সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যাংকগুলোকে তাদের সেবার মান বাড়াতে হবে। চালু করতে হবে গ্রাহকদের জন্য স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা। পাশাপাশি আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাত আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। অনিয়ন্ত্রিত ঋণ ও খেলাপি সংস্কৃতি এ খাতকে এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। এটি শুধু একটি সিস্টেমের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রেরও। তাই এ সংকটকে এখনই ঠেকাতে হবে। সঠিক সংস্কার, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সমাজের সব স্তরের সচেতনতার মাধ্যমে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। একটি পুনর্গঠিত ব্যাংক খাত শুধু অর্থনীতিকেই পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ যে কোনো সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের পেছনে থাকে একটি দৃঢ় ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ভিত্তি। এটাই হতে পারে আমাদের আগামী অর্থনৈতিক মুক্তির ভিত্তি।

প্রজ্ঞা দাস, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ

ইডেন মহিলা কলেজ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোস্তাফিজ ইস্যুতে আসিফ নজরুলের কড়া বার্তা

ঢাকার পাঁচ আসনে ১৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, ৩১ জনের বৈধ

টানা ৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে সাইকেল পেল ১১ কিশোর

বরিশালে আটকে গেল বিএনপি প্রার্থী সান্টুর মনোনয়ন

ছাত্রলীগের জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার

মাদুরোর ছবি প্রকাশ, জানা গেল সঠিক অবস্থান

নিরাপত্তা ও মুস্তাফিজ ইস্যুতে আইসিসিকে চিঠি দিতে যাচ্ছে বিসিবি

কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন আ.লীগ নেতার মৃত্যু

জুলাই যোদ্ধাদের ত্যাগে ভোটাধিকার ফিরেছে : মেজর হাফিজ

প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা

১০

ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা যাবে কার হাতে?

১১

মুস্তাফিজ–আইপিএল ইস্যুতে যা বলছেন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটাররা

১২

অভ্যুত্থান হয়েছিল দেশের গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার জন্য : জুনায়েদ সাকি

১৩

এনসিপির ১ নেতাকে অব্যাহতি

১৪

মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

১৫

তারেক রহমানকে সমবেদনা জানালেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা

১৬

চবিতে ভর্তি পরীক্ষায় উপস্থিতি ৯১.৯৯ শতাংশ, এক অভিভাবকের মৃত্যু

১৭

দেশের মালিকানা জনগণের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই গণভোট : উপদেষ্টা রিজওয়ানা

১৮

জাগপা ছাত্রলীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী রোববার

১৯

ছুরিকাঘাতের পর গায়ে আগুন / শরীয়তপুরের সেই ব্যবসায়ী খোকন দাসের মৃত্যু

২০
X