ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় আলোচনায় আসে। এর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্র সংস্কার, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। স্বাধীন বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের আগে নব্বইয়ে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয়েছিল। ওই অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তৎকালীন তিন জোট একটি রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। তিন জোটের ওই রূপরেখায় স্বৈরাচারী এরশাদকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এ অঙ্গীকার পালন করেনি। উপরন্তু তারা এরশাদকে দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরে পরিণত করেছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নানা কারণে বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ বৈকি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ৫ আগস্ট (মঙ্গলবার) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘৩৬ জুলাই উদযাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন। এতে তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতি, এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করেছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে বাকশালের নামে সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে এবং মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে।
পরিশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তপশিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে এবং ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এ ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।
দেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে একটি জটিল রাজনৈতিক সংকটের আপাত সমাধান হয়েছে। এজন্য জুলাই ঘোষণাপত্রকে আমরা স্বাগত জানাই। অন্যদিকে অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, ছাব্বিশের জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আসছে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত হয়। তবে এ নিয়ে সংশয় যেন কাটছিল না। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আগামী বছর ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। সেজন্য তিনি বুধবার থেকেই সবাইকে নির্বাচনের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আমাদের প্রত্যাশা, ঘোষিত সময়ের মধ্যে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ ধরে দেশ এগিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন