

জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র আলোচিত মুখ ওসমান হাদি এখন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। শুক্রবার তার সম্ভাব্য সংসদীয় আসন ঢাকা-৮-এ জনসংযোগে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
ওসমান হাদি গ্রামবাংলার নিভৃত আঙিনা থেকে উঠে এসেছেন। ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার হাড়িখালী গ্রামের মুন্সিবাড়িতে জন্ম তার। তিনি কেবল একজন ব্যক্তিমানুষ নন, তিনি একটি পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার। মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদির ছোট ছেলে হিসেবে শৈশব থেকেই তিনি ধর্ম ও জ্ঞানের আবহে বেড়ে ওঠেন। তার জন্মভূমির মাটি যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি তার মানসগঠনেও রয়েছে গ্রামবাংলার সহজ-সরল দৃঢ়তা।
মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ। তিনি একজন শিক্ষানুরাগী আলেম। তার পরিবার ছিল জ্ঞান ও আদর্শের এক পাঠশালা। তিন পুত্র ও তিন কন্যার পরিবারে বড় ভাই মাওলানা আবু বক্কর ছিদ্দিক আজ বরিশালের বাঘিয়া আল আমিন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং গুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদের খতিব। এই পরিবারের ছোট সন্তান হিসেবেই ওসমান হাদি নিজের পথ খুঁজে নেন ভিন্ন এক পরিসরে।
তিন বোনের সংসারও জড়িয়ে আছে শিক্ষা, দাওয়াহ ও জীবিকার নানা দায়িত্বে। বড় বোনের স্বামী ফুলহরি আব্দুল আজিজ দাখিল মাদ্রাসার সুপার। ছোট বোন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক, তার স্বামীও একজন আলেম—মাওলানা আমির হোসেন। এই পারিবারিক পরিমণ্ডলে ওসমান হাদির শেকড় দৃঢ়, বিশ্বাস গভীর।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি পিতার কর্মস্থল নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। এরপর ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়ন তার জ্ঞানচর্চাকে দেয় নতুন দিগন্ত। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন মেধাবী, স্পষ্টভাষী ও বক্তৃতায় পারদর্শী। তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস, কথায় যুক্তির দীপ্তি তাকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর অঙ্গনে নিয়ে যায়।
ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি পা রাখেন আধুনিক উচ্চশিক্ষার পথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে ওসমান হাদি নিজের চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করেন। এখানেই তার ভেতরে জন্ম নেয় সময় ও সমাজকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টি। তিনি হয়ে ওঠেন এমন এক মানুষ। তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাকে একই সূত্রে গাঁথতে চান।
২০২৪ সালের সরকার পতনের আন্দোলন ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা ওসমান হাদিকে এনে দেয় জাতীয় পরিচিতি। তার বক্তব্য, উপস্থিতি ও সাহসী উচ্চারণ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন গণমাধ্যম ও জনমানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—কারও কাছে প্রতিবাদের প্রতীক, কারও কাছে বিতর্কের নাম।
ব্যক্তিগত জীবনে ওসমান হাদি বরিশালের রহমতপুরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার সংসারে রয়েছে ১০ মাসের এক পুত্র সন্তান—ভবিষ্যতের প্রতি এক নতুন আশার নাম। বর্তমানে তিনি ঢাকার রামপুরায় বসবাস করছেন। বৃদ্ধা মাতাও এখন তার সান্নিধ্যে ঢাকাতেই অবস্থান করছেন যেন সংগ্রামী জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের দোয়া তার নীরব শক্তি।
ওসমান হাদি তাই কেবল একজন আন্দোলনের মুখপাত্র নন, তিনি একটি ধারাবাহিক জীবনের ফলাফল। গ্রাম থেকে নগর, মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সব পরিসরেই তার যাত্রা প্রশ্ন তোলে, আলোড়ন তোলে, ভাবায়। ইতিহাসে কীভাবে তিনি মূল্যায়িত হবেন, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে বর্তমানে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তিনি আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন, এই দোয়া করি।
লেখক: সমাজকর্মী
মন্তব্য করুন