প্রখ্যাত সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনের এক বাস্তবতার নাম। এখানে ফুটে উঠেছে বাস্তুচ্যুত শিল্পীর যন্ত্রণা। এ উপন্যাসের জন্য লেখক খ্যাতির শীর্ষে উন্নীত হন। এখানে গ্রামের দরিদ্র জেলে শ্রেণির মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তার অসম্ভব আন্তরিক অনুভূতি দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তী সময়ে এ উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক।
উপন্যাসটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে মুদ্রিত হওয়ার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় হারিয়ে যায়। বন্ধুবান্ধব ও অত্যাগ্রহী পাঠকদের আন্তরিক অনুরোধে লেখক পুনরায় কাহিনিটি লেখেন। কাঁচড়াপাড়া হাসপাতালে ভর্তির আগে এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধুবান্ধবকে দিয়ে যান। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামের এ উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৩ সালে এর কাহিনিকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে ঋত্বিক ঘটক বলেন, তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এরকম লেখা দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলি, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সংগীতের টুকরো—সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অনুভূতির সৃষ্টি হয়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। ...অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুনর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরও এ পুনর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার তারুণ্যে উজ্জীবিত। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা। অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা উপন্যাসের একজন অকৃত্রিম শিল্পী। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাই তার শিল্পের সারাৎসার। গোকর্ণঘাটের তিতাস-তীরবর্তী অঞ্চল যেখানে তিনি জন্মেছিলেন সেই মালোপাড়াই তার উপন্যাসের পটভূমি। তাই উপন্যাসটিতে ঘিরে রয়েছে শিল্পীর নিজস্ব জগতের এক গভীর অভিব্যক্তি। শুধু ঘটনা লিপিবদ্ধ করার জন্য নয়, জেলেজীবনের গভীর ও গোপনতম ব্যথা ও বেদনার সুর। পটভূমির সত্যতা ছাড়াও জেলেসমাজের অভ্যন্তরীণ মানুষের আবিষ্কার, পরিবেশগত ঘনিষ্ঠতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের নানামাত্রিক রূপায়ণ এ উপন্যাসে ঘটেছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার সীমাহীন সংগ্রাম, দুষ্ট-খল সমাজজীবনের ঘূর্ণিপাকে মানবিকতার বিরাট পরাজয়ও সেখানে বৃহত্তর ব্যাপ্তি লাভ করেছে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ দেখিয়েছেন, মানুষের জীবনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও অমোঘ প্রকৃতি ও প্রবহমানকালের সত্যই তার ট্র্যাজিক জীবনের মূল।
মন্তব্য করুন