

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এলপিজি এখন আর শুধু একটি পণ্যের ঘাটতির বিষয় নয়, এটি পরিণত হয়েছে একটি গভীর নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবিতে। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে সেই গ্যাস আড়াই হাজার টাকায়ও মিলছে না। কোথাও কোথাও তা একেবারেই উধাও। প্রশাসনের অভিযানের মুখে দোকান বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, যার চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
২০১০ সাল থেকে আবাসিক পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ কার্যত বন্ধ থাকায় শহর ও মফস্বলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শীত মৌসুমে নগরের অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। ফলে পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও মানুষকে এলপিজির শরণাপন্ন হতে হয়। এ বাস্তবতায় এলপিজি এখন বিলাস নয়, বরং একটি মৌলিক প্রয়োজন। অথচ সেই প্রয়োজনীয় পণ্যটির সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার খবর নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির দায়ে ডিলারদের শাস্তি দেওয়া আইনানুগ ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কি সংকটের সমাধান হবে? বাস্তব চিত্র বলছে, মোবাইল কোর্টের ভয়ে অনেক বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে এবং গোপনে দ্বিগুণ দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন যে তথ্য দিয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। দেশে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল হচ্ছে। বহু কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন দর ঘোষণা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নীতিনির্ধারণে অংশীজনের উপেক্ষা করলে তার নেতিবাচক ফল ভোক্তাদেরই ভোগ করতে হয়। বর্তমান সংকটও তারই প্রমাণ।
অন্যদিকে রাজধানীর চায়ের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ এলপিজিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয় বলে অনেকেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান ও জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। একদিকে যেমন দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ন্যায্য কমিশন নির্ধারণের মাধ্যমে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনিক নজরদারি অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে না দেয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যায্যমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। শীতের মৌসুমে পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের বাস্তবতা মাথায় রেখে এলপিজিকে একটি কৌশলগত জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নইলে গ্যাস সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে, যার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
মন্তব্য করুন