মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জাইমা রহমান: নীরব পদচারণায় শক্তিশালী আগমন

আরিফুজ্জামান মামুন
জাইমা রহমান: নীরব পদচারণায় শক্তিশালী আগমন

রাজনীতির মাঠ সবসময় বজ্রকণ্ঠের অপেক্ষায় থাকে না। কখনো কখনো ইতিহাস গড়ে ওঠে নীরবতার ভেতর দিয়ে—বিনয়ী কণ্ঠে বলা কয়েকটি বাক্যেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক উপস্থিতি ঠিক তেমনই এক নীরব অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা দেননি। উচ্চকিত স্লোগান কিংবা কঠোর ভাষার আশ্রয় নেননি। খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে, শান্ত কণ্ঠে তিনি শুধু বলেছেন—তিনি শিখতে এসেছেন। কিন্তু এই একটি বাক্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার অঙ্গীকার, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। জাইমা রহমানের বক্তব্যে সরাসরি রাজনীতি ছিল না, কিন্তু রাজনীতির গভীর অর্থ ছিল প্রতিটি শব্দে। এটি ছিল এমন এক আগমন, যা উচ্চারণের চেয়ে উপলব্ধিতে বেশি শক্তিশালী।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দিয়েছিলেন। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আপসহীন অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। আর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসনেও দল পরিচালনা করেছেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রেখে রাজনীতিকে সচল রেখেছেন। এ তিনটি নাম শুধু একটি পরিবারের ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের শক্ত স্তম্ভ। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সে ইতিহাসেরই উত্তরাধিকার। কিন্তু তিনি উত্তরাধিকারকে নামের ভারে বহন করতে আসেননি; তিনি এসেছেন তা বুঝতে, শিখতে এবং নিজের মতো করে আত্মস্থ করতে। তার বক্তব্যে কোনো অহংকার ছিল না। ছিল না ‘আমি আসছি নেতৃত্ব দিতে’ এমন কোনো ঘোষণাও। বরং ছিল বিনয়ী স্বীকারোক্তি—রাজনীতি শেখার আগ্রহ, মানুষের কথা শোনার মানসিকতা এবং সময়কে বুঝে চলার প্রত্যয়।

তারেক রহমান যখন রাজনীতির ময়দানে এসেছিলেন, তা ছিল প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট। কিন্তু জাইমা রহমান সেই পথ অনুসরণ করেননি। তিনি যেন ইতিহাসের পাঠশালা থেকে প্রথমে পাঠ নিতে চেয়েছেন। এটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এক ধরনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। কারণ, রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী হওয়া মানেই সবসময় আগে কথা বলা নয়, অনেক সময় আগে শুনতে শেখাটাই বড় শক্তি। তিনি রাজনীতির অংশ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। গত ১৭ বছর ধরে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কীভাবে তার বাবা তারেক রহমান বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি, রাজনৈতিক কৌশল এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে দল পরিচালনা করেছেন। এ নীরব পর্যবেক্ষণই জাইমা রহমানের রাজনৈতিক পাঠ্যক্রম।

জাইমা রহমানের রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রথম দৃশ্যমান মুহূর্তটি আসে এক গভীর শোকের সময়ে। দাদি, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাতি যখন শোকাহত, তখনই প্রকাশ্যে আসেন জাইমা রহমান। দাদির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, তা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। এ শোকের মুহূর্তেই জাইমা রহমানের উপস্থিতি ছিল দৃঢ় ও সংযত। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা যখন ঢাকায় এসে শোক জানাচ্ছিলেন, তখন বাবার পাশে তার সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল নিছক প্রটোকল নয়, তা ছিল রাজনীতির ভাষায় এক নীরব ইঙ্গিত। শোকের মুহূর্তে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো আলোচনায় যাননি। কিন্তু তার উপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল, তিনি প্রস্তুত হচ্ছেন দায়িত্ব নিতে।

রাজনীতিতে নতুন মুখ মানেই অনেক সময় অতীতের ছায়া, এমন ধারণা থাকে। কিন্তু জাইমা রহমান সেই ছায়ার ভেতর থেকেও নিজের আলোর সম্ভাবনা তৈরি করছেন। তিনি কাউকে অনুকরণ করতে আসেননি, আবার কাউকে অস্বীকার করতেও নয়। তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ছিল আত্মপরিচয়ের স্পষ্টতা। তিনি জানেন তিনি কোথা থেকে এসেছেন, আবার এটাও জানেন যে সামনে যেতে হলে শিখতে হবে, বুঝতে হবে, সময় নিতে হবে। এ বিনয়ই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ, রাজনীতিতে বিনয় বিরল, আর বিরল জিনিসই সাধারণত সবচেয়ে মূল্যবান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নতুন নয়, কিন্তু জাইমা রহমানের উপস্থিতি এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। তিনি আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে; উত্তরাধিকার দিয়ে নয়, প্রস্তুতি দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে।

জাইমা রহমান এখনো কোনো পদে নেই, কোনো দায়িত্বে নেই। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তার হাতেখড়ি হয়ে গেছে। আর এ হাতেখড়ি হয়েছে কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়; একটি বিনয়ী উচ্চারণে, একটি শান্ত উপস্থিতিতে। রাজনীতির ইতিহাস বলে, যারা চিৎকার দিয়ে শুরু করে, তারা অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর যারা নীরবে শেখে, তারা অনেক দূর যায়। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান দ্বিতীয় পথের যাত্রী বলে মনে হচ্ছে। তার পথচলা হয়তো ধীর, কিন্তু গভীর। হয়তো এখনো প্রস্তুতির পর্ব, কিন্তু সেই প্রস্তুতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর শক্ত ভিত। এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, এ নীরবতা কি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি ভবিষ্যতের প্রস্তুতির প্রথম ধাপ? রাজনীতিতে নীরবতা চিরস্থায়ী হয় না। একসময় কথা বলতে হয়, অবস্থান নিতে হয়, সিদ্ধান্ত জানাতে হয়। তবে সেই কথার ওজন নির্ভর করে প্রস্তুতির গভীরতার ওপর। আপাতত জাইমা রহমান সেই প্রস্তুতির পথেই হাঁটছেন বলেই প্রতীয়মান।

জাইমা রহমান এখনই সক্রিয় রাজনীতিতে নামছেন না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে তাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট। দলীয় ফোরাম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নীতি-সংলাপ এবং ধীরে ধীরে সাংগঠনিক পরিচিতি পথে তার অগ্রযাত্রা হতে পারে। এটি বিএনপির জন্যও কৌশলগতভাবে নিরাপদ। কারণ, এতে নতুন নেতৃত্ব আসবে ধীরে, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছাড়াই। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এখনো রাজনীতির মঞ্চে পূর্ণাঙ্গ চরিত্র নন, তিনি একটি সম্ভাবনার নাম। তবে এ সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি শব্দের চেয়ে নীরবতা বেছে নিয়েছেন, দাবি করার চেয়ে শেখার কথা বলেছেন। রাজনীতিতে কখনো কখনো এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী আগমনের সূত্র।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ইমেইল: [email protected]

(প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব)

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১০

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১১

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১২

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৩

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৪

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৫

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৬

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৭

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৮

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৯

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

২০
X