

বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় ব্যাপকভাবে এই নিরাপদ বিনিয়োগমাধ্যমে টাকা ঢালছেন বিনিয়োগকারীরা।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ধাতুটি প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি (৩১ দশমিক ১০৩ গ্রাম প্রায়) পাঁচ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে এবং অল্প সময়ের জন্য পাঁচ হাজার ৫০০ ডলারের ঘর ছুঁয়ে ফেলে। রুপা ও প্লাটিনামের দামও একইভাবে বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। শুক্র ও শনিবার (৩০-৩১ জানুয়ারি) দুই দফায় ভরিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমেছে দাম।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললে এসব ধাতুর দাম দ্রুতই নেমেও আসে, যদিও গত বছরের এই সময়ের তুলনায় দাম এখনো অনেক উঁচুতে।
ট্রাম্পকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় বদলাচ্ছে বিনিয়োগ প্রবণতা
যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য করতে আগ্রহী হলেও যেসব দেশকে অনুকূল মনে করেন না, সেসব দেশের পণ্যের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তা বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানকারী কোম্পানি হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, ‘ট্রাম্পের এই বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা সোনার দামের উল্লম্ফনে ভূমিকা রাখছে।
জানুয়ারিতে সোনা ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে। কিন্তু শেয়ারবাজার পড়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ পরিকল্পনায় অনমনীয় থাকা আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিতে প্রতিক্রিয়া জানায়।
ক্যাপিটাল ইকনমিক্সের অর্থনীতিবিদ হামাদ হোসেন বলেন, ‘ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও আর্থিক নীতির ঝুঁকির বিপরীতে স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এ কারণেই এই মূল্যবান ধাতুটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।’
যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে হুমকি অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে
ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ সামগ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘনভূত করেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার ঘটনা স্বর্ণের দামকে আরও উপরের স্তরে নিয়ে যায়।
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের হুমকি বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং ডলারের প্রতি আস্থা কমে যায়; ফলে বিনিয়োগকারীরা অধিক নিরাপদ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়েন। ট্রাম্পের ক্ষমতাকালে ডলারের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে গত বসন্তে ঘোষিত তার তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতির পর।
এমা ওয়াল বলেন, “দুনিয়া যখন অস্থির হয়ে উঠে, স্বর্ণ তখন তার স্বভাবসুলভ কাজটাই করে। বাণিজ্যিক উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক ফাটল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে লাফিয়ে দাম বাড়ায়।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, এমনকি ওয়াশিংটনে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণকেই রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে এতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ ইউক্রেনের সমর্থক বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দ্বারা বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই কিছু দেশ লক্ষ করেছে এবং তারপর থেকেই তারা স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে।”
হুসেইন বলেন, ‘যদিও ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় এখনো বেশি স্বর্ণ কিনছে। ধারণা করা হয় যে, ২০২৫ সালে তাদের চাহিদা কিছুটা কমে এসেছে।’
অন্যান্য ক্রেতার মধ্যে রয়েছে চীন, যারা সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রেতা— যেখানে চাহিদা আসে ব্যক্তিগত গয়না ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী উভয়ের কাছ থেকে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও বাড়ছে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা, বিশেষ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত স্বর্ণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে।
হুসেইন আরও বলেন, ‘বাজারে নতুন ক্রেতারাও বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনছে, যা সাম্প্রতিক নাটকীয় মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি টেথারের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি একটি ডিজিটাল মুদ্রা কোম্পানি, যারা এত বেশি স্বর্ণ কিনেছে যে তাদের মজুত এখন কিছু ছোট দেশের রিজার্ভকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা যায়।’
সম্প্রতি স্বর্ণ ও রুপার দাম কেন কমেছে?
গত কয়েক দিনে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। এর একটি কারণ বা আশঙ্কা ছিল যে, ট্রাম্প এমন একজন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে পারেন যিনি তার সুদের হার কমানোর দাবিতে নতি স্বীকার করবেন। এতে ডলারের দরপতন এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতিতে স্বর্ণ কেনাকে সুরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পরে যখন খবর আসে যে প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ার্শকে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যিনি অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বলে বিবেচিত, তখন স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎই কমে যায়।
চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিদ্যমান শুল্ক এবং ট্রাম্পের আরও শুল্ক আরোপের হুমকি, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সংঘাত— এসব কারণে মূল্যবান ধাতুর দাম এখনো গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ খুঁজতে থাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ ও রুপার আকর্ষণ আগের চেয়ে আরও বেশি।
স্বর্ণের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর তুলনামূলক দুর্লভতা।
এবিসি রিফাইনারির বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক বাজার প্রধান নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, ‘আপনি যখন স্বর্ণের মালিক হন, এটি কারও ঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। যেমন, বন্ড বা শেয়ারে কোম্পানির পারফরম্যান্সের মান ঠিক করে দেয়। অতি অনিশ্চিত সময়ে এটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম।’
সূত্র : বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন