মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

দেশি সমস্যার বিদেশি সমাধান কেন

মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ

সেই ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি ‘: দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ’। সবার ওপরে দেশ। তাই দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের জন্য যুগে যুগে যারা নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তারা অমর হয়ে আছেন। পরিণত বয়সে শুনেছি ‘দেশীয় পণ্য কিনে হও ধন্য’। ‘বিদেশি পণ্য বর্জন করুন দেশের টাকা দেশে রাখুন’ ইত্যাদি। দেশের জন্য ভালোবাসার এ অমৃত বাণী শুনে বড় হয়েছি আমরা। তবে কাগজে লেখা সব শিক্ষাই মূল্যহীন যদি বাস্তবে তার প্রয়োগ না ঘটে। এ কথাগুলো মনে পড়ল পলাশীর যুদ্ধের কথা ভেবে। আজ থেকে ২৬৬ বছর আগে ঠিক এমনি এক জুন মাসের ২৩ তারিখে ইংরেজদের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলার যুদ্ধ হয়েছিল পলাশীর প্রান্তরে। সিরাজউদ্দৌলা তথা দেশের সঙ্গে পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরদের বেইমানের ফলে ১৯০ বছর ব্রিটিশদের গোলামি করেছি আমরা। তারপরও আমাদের দেশপ্রেম কোন পর্যায়ে তার একটি অবয়ব পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫২ বছরের ইতিহাসের পাতায়। মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী বা প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য তিন জাতীয় নেতা জেলের ভেতর খুন হন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে। তার আগে ১৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারপ্রধান ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ছয় বছর পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাসদস্যদের হাতে খুন হন এককালে সেনাপ্রধান ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১০ বছর পর ক্ষমতা হারিয়ে ও দুর্নীতির অপবাদ মাথায় নিয়ে জেলে ঢোকেন আরেক সেনাপ্রধান ও সরকারপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতাচ্যুত আরেক সরকারপ্রধান খালেদা জিয়া জেলে আছেন ২০১৮ সাল থেকে। মাঝে ‘১/১১’ নামের সেনা সমর্থিত এক অদ্ভুত সরকারের (২০০৭-০৮) প্রধান তার কুশীলবদের নিয়ে দেশ ছাড়া। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করেন। ‘১/১১’ সরকারের সময় তিনিও কিছুদিন সংসদ ভবন চত্বরে বানানো জেলে ছিলেন। এ সময় তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরে তার জেল বা অপমৃত্যু না হলেও বিরোধী দলের নেত্রী থাকাকালে গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর পুনরায় সরকার গঠন করেন। এক কথায় বলতে গেলে স্বাধীনতা লাভের পর গত ৫২ বছর এ দেশের সরকারপ্রধান থাকাকালে কিংবা সরকার পরিচালনার পর ক্ষমতা হারিয়ে সব কর্তাব্যক্তি বা সরকারপ্রধান খুন, জেল, দেশান্তর কিংবা হত্যার শিকার হয়েছেন। আর ইতিহাসের পাতায় এ কথা স্পষ্ট লেখা আছে যে, এ ধরনের প্রতিটি নির্মমতা, অঘটন ও অপচেষ্টার নেপথ্যে কোনো না কোনো বিদেশি শক্তি জড়িত ছিল। তাই আগুনে ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখে আঁতকে ওঠে, তেমনি মনের অজান্তে আমাদেরও আঁতকে উঠতে হয়, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ বিশেষত রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশিদের অতি উৎসাহ ও তৎপরতা দেখা যায়। দুৰ্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ বিদেশিদের আমরাই বারবার ডেকে আনি। চিঠি লিখি, ভিডিও ফুটেজ পাঠাই, মা ও শিশুদের প্ল্যাকার্ড হাতে তাদের সামনে দাঁড় করাই—কত কি? বিদেশিদের কখনো সরকার ডাকে, আবার কখনো বিরোধীরা। একেকবার একেক দেশের নাম এলেও আদতে আমাদের যারা সবক দেন, তারা বিদেশি। তাদের মাথায় দেশীয় সমস্যার যেসব সমাধান গিজগিজ করে বলে আমাদের নেতা-নেত্রীদের ধারণা, সে সমাধান কি এ দেশের কারও মাথায় নেই? এ দেশের বহু প্রাজ্ঞ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আছেন, যাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানভান্ডারে দেশীয় সংকটের সমাধানও আছে। তবে তাদের হাতে চাবুক নেই, যা আছে বিদেশিদের হাতে। আমরা কি তবে ক্রমেই গাধায় পরিণত হচ্ছি, যে পিঠে চাবুক না পড়লে আমরা চলব না? নাকি ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের গোলামি আর পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের গোলামির রক্ত আজও বহমান আমাদের শিরায় শিরায়? স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও কেন আজ সরকারি দলে থাকলে বিদেশিদের বিষোদ্গার, আবার বিরোধী দলে গেলে বিদেশিদের আমন্ত্রণের এই নগ্ন প্রচেষ্টা? তার জবাব দেওয়ার মতো এ দেশে কি কেউ নেই? দেশের এ ক্রান্তিকাল উত্তরণে এ দেশেরই দিকপালদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এবং দিকপালদের এগিয়ে আসার এখনই সময়। আমাদের একাধিক সাবেক সেনাপ্রধান, বিচারক, আমলা, শিক্ষক আছেন, যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনো সুস্থ আছেন এবং সুযোগ পেলে দেশকে অনেক কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সব সাবেক সেনাপ্রধানকে ডেকে রাষ্ট্রপতি গ্রহণযোগ্য একজনের নাম নিতে পারেন। বিভিন্ন দলে বিভক্ত বিচারক, আইনজীবী ও শিক্ষকরা অন্তত একজন সাবেক বিচারক, একজন প্রবীণ আইনজীবী ও আদর্শ শিক্ষকের নাম প্রস্তাব করুন। বিসিএস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সব সাবেক ও বর্তমান সভাপতি বসে একজন সাবেক আমলা খুঁজে দিন। একইভাবে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারদের সব সংগঠন একজন করে প্রতিনিধি দিন। একজন সালমান এফ রহমান এবং একজন আবদুল আউয়াল মিন্টু একসঙ্গে বসলে ঠিকই একজন শিল্পপতি খুঁজে পাবেন, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে বাধ্য। একইভাবে অন্যান্য পেশা থেকেও আসতে পারেন বরেণ্য ব্যক্তি ও আলোকিত নারীরা। মিডিয়া মোগলরা খুঁজে দিতে পারেন দেশ-অন্তঃপ্রাণ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। এভাবে দেশের সেরা সন্তানরা যে সমস্যার সমাধান দেবেন তা কি বিদেশিদের সমাধানের চেয়ে খারাপ হবে? চারদিকের পরিস্থিতি দেখে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা ও গানের কিছু কিছু অংশ আজকাল প্রায়ই কানে বাজে— “দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ/ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?.../অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ/কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!.../আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?/ দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার! বিশেষ দ্রষ্টব্য : আজ থেকে ঠিক ৯৭ বছর আগে এমনি এক জ্যৈষ্ঠ মাসের ৬ তারিখে জাতীয় কবি এ কথাগুলো লিখেছিলেন। তাহলে কি প্রায় শতবছরেও আমরা কিছু শিখলাম না? পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারলাম না? কে দেবে এসব প্রশ্নের জবাব? লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গ্রিজমানদের খালি হাতেই ফেরত পাঠালো ইন্টার মিলান  

একটি হুইল চেয়ারের আকুতি প্রতিবন্ধী সিয়ামের

ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে চবিতে ফুলের দাম বেড়েছে ৩ গুন

সীমান্তে শেষবারের মতো বোনের লাশ দেখলো স্বজনেরা

‘উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই’-প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী

‘ডাল ভাত খেয়েও যুদ্ধ করতে পারি’

ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

কোম্পানি রিটার্নের মেয়াদ ২ মাস বাড়ানোর দাবি এফবিসিসিআইর

ন্যায্যতা সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস / উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান 

এমপিদের থোক বরাদ্দের আগে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি টিআইবির

১০

চাকরি গেল জাবির আলোচিত সেই শিক্ষকের

১১

পঞ্চগড়ে বন্যহাতির আক্রমণে যুবক নিহত

১২

অনলাইনে ভিডিও দেখে গামছা বিক্রেতার ছেলের মেডিকেলে চান্স

১৩

বাড়ছে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম

১৪

‘দুই-তিনটা লাশ ফেলে দেব’- ছাত্রলীগ নেতার হুমকি

১৫

বোরকা পরে বোনের পরীক্ষা দিতে এসে আটক ভাই

১৬

ভক্তদের বিরাট-আনুশকার সুখবর

১৭

নতুন এমপিওভুক্ত মাদ্রাসায় রমরমা ‘ব্যাকডেট’ নিয়োগ বাণিজ্য

১৮

রাসেল ঝড়ে রংপুরকে হারাল কুমিল্লা

১৯

উত্তর বলে দেয় নাবিলা, খাতায় লিখে রহিমা

২০
X