বেশ কিছুদিন ধরে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। পরিস্থিতি ক্রমেই চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রতিদিন অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। মঙ্গলবার এক দিনে রেকর্ড ১৩ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং দেড় হাজারের অধিক ভর্তি হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালে। এরই মধ্যে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তব্যরতদের। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অচিরেই ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাসেবা পড়বে মহাসংকটে।
আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ভিড় করছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা ছাড়াও মেঝে, করিডোরে রোগীরা মাদুর পেতে অবস্থান নিচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক-নার্সরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে মারা গেছে ১২৭ জন। গত সোমবারও এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছিল আটজনের। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৮ হাজার ৩০৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সাড়ে পাঁচ হাজারের অধিক ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। তার মধ্যে ঢাকায় ৩ হাজার ৪৪৩ এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ২২৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। কোনো কোনো হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। যে হারে রোগী বাড়ছে, সে হারে আরও বাড়তে থাকলে সামনের দিনগুলোতে তাদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধির সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ওষুধ ব্যবহারের চেয়ে এডিস মশার জন্মস্থান যেন তৈরি না হয় এবং তৈরি হলে তা ধ্বংস করার মাধ্যমেই এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি আক্রান্তদের মশারির নিচে রাখতে হবে, অন্যথায় এটি আরও ব্যাপক আকারে ছড়াবে। শুধু লোক দেখানো বা দায়সারা গোছের কার্যক্রম দিয়ে যে ঢাকার মশক নিধন সম্ভব নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে আগেই। এখন প্রতিদিন মানুষ প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক চিত্র। অথচ ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে এবার খারাপ হতে পারে, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই বারবার সতর্ক করেছেন। গণমাধ্যমে এ নিয়ে যথেষ্ট লেখালেখি হয়েছে। রাজধানীতে এ দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। মশক নিধন কর্মসূচিতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বাজেট থাকে এবং তা খরচ করা হয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দুই সিটি করপোরেশন তাদের দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আমরা মনে করি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার এখন আর কোনোই বিকল্প নেই। এটি নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা দরকার, এ কথা সত্য। তাই বলে এ দায়িত্ব পালনের দায় যারা কাঁধে নিয়েছেন, তাদের তা এড়ানোর কোনোই সুযোগ নেই। কারণ এসব দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের রয়েছে পর্যাপ্ত বাজেট, লোকবল, অবকাঠামোসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। মনে রাখা জরুরি, জনগণের পকেটের টাকায় চলে এসব খরচ। সুতরাং জনগণের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের।
আমাদের প্রত্যাশা, ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
মন্তব্য করুন