তিন দিন ধরে জ্বলছে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী এলাকায় দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চিনি পরিশোধন কারখানায় লাগা আগুন। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসছে চিনির কাঁচামাল। আগুন নিয়ন্ত্রণে এখনো (গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭টা) কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন পুরোপুরি নেভানো না গেলেও ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। এদিকে কারখানাটিতে পুড়ে যাওয়া চিনি ও রাসায়নিক বর্জ্য পানিতে মিশে গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। মারা যাচ্ছে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী। গবেষকরা বলছেন, অপরিশোধিত চিনি আগুনে পুড়ে গলে পরিণত হয় বিষাক্ত রাসায়নিকে। এসব রাসায়নিক পানির সঙ্গে মেশার কারণে মাছ মরে ভেসে উঠছে।
গতকাল সকালে কর্ণফুলী থানাধীন এস আলম সুগার মিলের পেছনে থাকা কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয়রা কেউ হাতজাল দিয়ে, আবার কেউ হাত দিয়ে ভেসে থাকা মৃত এবং অর্ধমৃত মাছগুলো ধরছেন। মাছ ধরা স্থানীয় রুহুল আমিন বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত থেকে নদীতে মাছ মরে যাচ্ছে। পোড়া চিনি নদীতে পড়ার পর মাছ মরছে। পোড়া চিনির বর্জ্য কারখানা থেকে সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। এভাবে থাকলে নদীর মাছ একটিও থাকবে না। সব মরে ভেসে উঠবে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, এস আলমের পোড়া চিনির বর্জ্য কারখানা থেকে সরাসরি ড্রেনের মাধ্যমে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। কর্ণফুলী নদীর কয়েক কিলোমিটারজুড়ে পানির রং পরিবর্তন হয়েছে। যেসব স্থানে পানি দূষিত হয়েছে শুধু সেখানেই মরছে মাছসহ অন্যান্য জীব।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, সুগার মিলের পোড়া চিনি কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে—এমন তথ্য পেয়ে মঙ্গলবার আমাদের ল্যাব থেকে লোকজন গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ল্যাবের রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছসহ অন্যান্য প্রাণী মারা যাচ্ছে বা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অবশ্যই এটি নদীর জন্য ক্ষতির কারণ।
পরিবেশবিদ ড. ইদ্রিস আলী বলেন, শিল্পকারখানা গড়ে তোলার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত ছিল। তারা ডাম্পিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখেনি। এ কারণে কারখানা থেকে পোড়া বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এতে নদীর পানি দূষিত হবে।
হালদা নদী গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, পুড়ে যাওয়া চিনি নদীতে পড়লে অবশ্যই নদীর ক্ষতি হবে। এ কারণে পানিতে থাকা জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তাই এসব যাতে নদীতে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে জোয়ার-ভাটার কারণে এই সমস্যা একসময় পূরণ হবে। তাও সময়সাপেক্ষ।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারখানার গুদামের ভেতরে পুড়ে গলে যাওয়া অপরিশোধিত চিনি না সরালে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হবে না। এ ছাড়া পুড়ে গলে যাওয়া অপরিশোধিত চিনির গরম তরলের মধ্যে কাজ করতেও কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। আগুন নেভাতে প্রায় ৪৭ ঘণ্টা পালাবদল করে কাজ করছেন তারা। ফলে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, ‘ভেতরে এখনো আগুন আছে। ওখানে সব দাহ্য পদার্থ। যতক্ষণ না ওগুলো সব সরানো যাবে ততক্ষণ আগুন জ্বলতে থাকবে। আমরা চেষ্টা করছি অন্য জায়গায় যাতে আগুন ছড়িয়ে যেতে না পারে। তিনি আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করছে। টানা কাজ করে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। গুদামের ভেতরে আগুনে পুড়ে গলে যাওয়া অপরিশোধিত চিনির গরম তরলে পা সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেফটি বুট পড়লেও পায়ে গরম লাগছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন এস আলম গ্রুপের হেড অব স্টেট মোস্তান বিল্লাহ আদিল। তিনি বলেছেন, এটি দেশের সুগার মিলে সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড। এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। প্রায় ৩০টি ডাম্প ট্রাক দিয়ে গলিত র-সুগার আমাদের নিজস্ব জায়গায় ডাম্পিং করা হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি র-সুগার যাতে নদীতে না পড়ে। আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। এর পরও ফায়ার সার্ভিসের ছিটানো কিছু পানি গড়িয়ে নদীতে পড়েছে। এতে আমাদের দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।