আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৫, ০২:৩৫ এএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৫, ০২:৩৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঐতিহ্য

৫০১ বছরের ‘বাঘা শাহি মসজিদ’

৫০১ বছরের ‘বাঘা শাহি মসজিদ’

প্রাচীন ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক নিদর্শন রাজশাহীর ‘বাঘা শাহি মসজিদ’। ৫০১ বছর আগে বাংলার স্বাধীন সুলতান নুসরত শাহ সুন্দর কারুকার্যে খচিত এ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ‘১৫২৩-২৪ খ্রিষ্টাব্দে’ নির্মিত এ ঐতিহাসিক মসজিদটি আজও আপন মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে গৌরের এ মসজিদটির ইমাম-মোয়াজ্জিন কিংবা দেখাশোনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা সরকারিভাবে কোনো বেতন-সম্মানী না পাওয়ায় মনঃকষ্টে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক এ নিদর্শনটির প্রতি সরকার আরেকটু নজর দিলে মসজিদটির সুনাম সারাবিশ্বে আরও বেশি ছড়িয়ে যাবে।

জানা গেছে, ৫০১ বছরের পুরোনো এ শাহি মসজিদটি দেখতে দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে সবসময়। তবে রমজানের কারণে এখন দর্শনার্থীর আনাগোনা একটু কম। মসজিদটি সমতলের ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু একটি বেদির ওপর নির্মিত। নিচ থেকে এটির দিকে তাকালে সোজা চোখ চলে যায় চৌচালা গম্বুজের দিকে। মসজিদে চমৎকার কারুকাজ আর টেরাকোটার নকশা। বাংলাদেশের ৫০ টাকার পুরোনো নোট আর ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে দেখা মেলে প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এই মসজিদের। এটি রাজশাহীর ‘বাঘা শাহি মসজিদ’। এ মসজিদের সামনে খনন করা হয়েছিল বিশাল এক দিঘি। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীর আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা প্রতিনিয়ত ছুটে আসেন বাঘায়।

মসজিদটি রাজশাহী শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বাঘা উপজেলা সদরে। মসজিদের আঙিনা ঘিরে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। দুপাশেই রয়েছে বিশাল দুটি ফটক। দক্ষিণ পাশের ফটকটি এখনো রয়েছে। সেখানে দারুণ কারুকাজ। তবে উত্তর পাশেরটির অবস্থা আর আগের মতো নেই।

এ মসজিদের দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলে গেছে বাঘা-ঈশ্বরদী সড়ক। সেখান থেকে উত্তর দিকে মুখ ফেরালেই মসজিদের ১০টি গম্বুজের কয়েকটি দৃশ্যমান হয়। এরপর প্রধান ফটক থেকে এর নির্মাণশৈলী দর্শনার্থীদের টেনে নিয়ে যায় মসজিদের ভেতরে। দশ গম্বুজের এ মসজিদে রয়েছে পাঁচটি দরজা। মাঝখানের দরজার ওপর ফারসি হরফে লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। চার কোনায় রয়েছে চারটি চৌচালা গম্বুজ, ভেতরে ছয়টি স্তম্ভ, চারটি অপূর্ব কারুকার্যখচিত মেহরাব। এর নকশায় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী আম, গোলাপ ফুলসহ নানা রকম নকশা। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা সাড়ে ২৪ ফুট। দেয়াল চওড়া ৮ ফুট। গম্বুজের ব্যাস ২৪ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। সবখানেই টেরাকোটার নকশা। কিছু কিছু জায়গায় লোনা ধরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুরূপ নকশা প্রতিস্থাপন করেছে। সিরাজগঞ্জের টেরাকোটাশিল্পী মদন পাল কাজটি করেছিলেন। যারা আগের নকশা দেখেননি, মদন পালের নকশার সঙ্গে আগের নকশার পার্থক্য তারা বুঝতে পারবেন না।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ‘১৮৯৭ সালের এক ভূমিকম্পে স্থানীয় অন্যান্য ঐতিহাসিক ইমারতের সঙ্গে বাঘা শাহি মসজিদটিরও ক্ষতি হয়। ভেঙে পড়েছিল ওপরের ১০টি গম্বুজ। তার পর থেকে দীর্ঘদিন মসজিদের ভেতরটা পরিত্যক্ত ছিল। একসময় ভেতরে টিনের ছাপরা তৈরি করে নামাজ চলত। পরে গম্বুজগুলো পুনর্নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালের ৩১ আগস্ট থেকে কাজ শুরু হয়, চলে ১৯৭৭ সালের জুলাই পর্যন্ত।’ এরপর ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুরূপ নকশা প্রতিস্থাপন করে সিরাজগঞ্জের কারুশিল্পী মদন পালকে দিয়ে পুনরায় নকশাগুলো সংস্কার করে নেয়। জানা গেছে, শাহি মসজিদের উত্তর পাশে হজরত শাহদৌলা (রহ.) এবং তার পাঁচজন সাথীর মাজার অবস্থিত। এই মাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে হজরত শাহ (রহ.)-এর পরিবারবর্গের মাজার। শাহি মসজিদ প্রাঙ্গণের বাইরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে দুজন বাগদানি দরবেশের মাজার। এ ছাড়া এখানে আসা আরও অনেক সাধকেরও মাজার এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। বাঘা শাহি মসজিদ সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয় মহল পুকুর। ১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কাজের সময় ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট একটি বাঁধানো মহল পুকুরের সন্ধান মেলে। সেটি একটি সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিন দিক থেকে বাঁধানো সিঁড়ি ভেতরে নেমে গেছে। সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এখানে মানত করতে আসেন প্রচুর দর্শনার্থী।

গতকাল সোমবার (৩ মার্চ) এই মসজিদ দেখতে এসেছিলেন আমিনুল ইসলাম রিপন নামের এক দর্শনার্থী। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ঝিকড়া বাজার এলাকায় তার বাড়ি। তিনি বলেন, জায়গাটা অনেক সুন্দর। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই জায়গার গুরুত্ব অনেক। তাই সময় পেলেই মাঝে মধ্যেই এখানে ছুটে আসি। ওয়াক্তের নামাজের সময়ে আসলে পড়ে নেই সেই ওয়াক্তের নামাজ। আর নামাজের সময়ে না এলে দুই রাকাত নফল নামাজ আর দোয়া-দরুদ পড়ে চলে যাই।’ বাঘা মাজারের খাদেম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু জানান, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও এলাকার বিশিষ্টজনকে নিয়ে একটি কমিটি আছে। সেই কমিটি এই মসজিদ ও মাজার পরিচালনা করে। প্রতি শুক্রবার এই মসজিদে অসংখ্য মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে জুমার নামাজ আদায় করেন। এই মসজিদ ঘিরে প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর সুবিশাল দিঘি, আউলিয়াদের মাজার, মূল দরগাহ শরিফ ও জাদুঘর। সবই দর্শনীয়। শীতে অসংখ্য অতিথি পাখি আসে এখানে। ওই সময় দিঘির পাড়ে ভিড় করেন বহু দর্শনার্থী। গতকাল সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেল শীতের পাখি ফিরে গেছে। দর্শনার্থীদের আনাগোনাও কম।

মসজিদের মোয়াজ্জিন রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘মসজিদটি ৫০০ বছরের অধিক পুরোনো। এটি সারাবিশ্বের মানুষের কাছে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সরকারিভাবে মসজিদটি আরও সুন্দরভাবে দেখভাল করলে অনেক ভালো হতো। পুরোনো এ মসজিদে অনেক মানুষ তাদের মনের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসে থাকেন। এখানে আল্লাহর অনেক ওলি এসেছেন, নামাজ পড়েছেন। হজরত শাহ দৌলা (রহ.)-এর কবর ও তার ছেলের কবর এই মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত। এখানে একটি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা শিক্ষক-ওস্তাদ ছিলেন তাদের অনেকের কবর এখানে আছে। সুতরাং এই মসজিদ ও এর আশপাশের জায়গা অনেক দামি। আমার জানা মতে, সরকারিভাবে এই মসজিদে কোনো অনুদান আসে না। যদি আসত তাহলে মসজিদটি আরও সুন্দরভাবে পরিচালিত হতো।’

বাঘা শাহি মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ‘মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পরিচালনা করা হয়। সুতরাং এটি সংরক্ষণ কিংবা সংস্কার এই দপ্তরই করে থাকে। এর ভেতরটা শুধু তারা দেখভাল করে। মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিনসহ সাতজন স্টাফ রয়েছে। তাদের বেতন ও আনুষঙ্গিক সব খরচ জনগণের দান-অনুদানের টাকায় করা হয়। মসজিদ বাদে এখানকার রাস্তাঘাট, নারী ওয়াশরুমসহ যত সংস্কার হচ্ছে, সবকিছুই জনগণের সহযোগিতায় হচ্ছে।’

মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. আশরাফ আলী বলেন, ‘১১ বছর থেকে বাঘা শাহি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সরকারিভাবে আমরা বেতন পাই না। শুধু এলাকাবাসী কিংবা বিভিন্ন জায়গা থেকে যেসব লোকজন আসে তাদের দানের মাধ্যমে মূলত এ প্রতিষ্ঠানটি চলে। রমজানে বাইরে থেকে লোক আসে না। রমজান বাদে প্রতি সপ্তাহে বাইরে থেকে যারা আসে তারা গড়ে ৩৫-৪০ হাজার টাকা দান করেন। তবে সরকারিভাবে যদি আমাদের বেতন কিংবা যাবতীয় খরচ বহন করা হতো তাহলে প্রতিষ্ঠানটি আরও জাঁকজমকপূর্ণ হতো।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক আনিসুজ্জামান সিকদার কালবেলাকে বলেন, ‘পুরোনো কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসংবলিত মসজিদগুলো সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণের একটি প্রকল্প সামনে আসবে। আশা করছি, বাঘার শাহি মসজিদে যদি এমন কোনো সমস্যা থাকে তাহলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে এটি সংস্কার করার ব্যবস্থা করা হবে। অন্য সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়গুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে অবগত করা হবে।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমি খুব সম্প্রতি এই পদে যোগদান করেছি। মসজিদটি সংস্কারের প্রয়োজন আছে কি না আমি এখনো খোঁজ নিতে পারিনি। যদি থেকে থাকে কিংবা এ নিয়ে আগের কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না আমি দেখব। আমি অল্পদিনের মধ্যেই শাহি মসজিদ পরিদর্শনে যাবো। গিয়ে সরেজমিন দেখব যে, আসলে কী অবস্থা। বাঘা শাহি মসজিদ অনেক পুরোনো মসজিদ। এটি গৌরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং এটিকে সংরক্ষণ-সংস্কারের সব ব্যবস্থা তো অবশ্যই সরকার করবে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য সব শ্রেণির অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ : সানাউল্লাহ

ভোরবেলার স্বপ্ন কি আসলেই সত্য হয়?

বাবা হারানোর সময় ‘পাঁচ তারকা জেলে’ ছিল সিরাজ, দাবি বোলিং কোচের

গাজার সামরিক প্রধানের মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করল হামাস যোদ্ধারা

একই পরিবারের পাঁচজনসহ ৯ জামায়াত কর্মীর বিএনপিতে যোগদান

ভূমিকম্পের ক্ষতি থেকে বাঁচতে মালয়েশিয়ায় বিশেষ নামাজ

পিআর পদ্ধতিতে সংসদ নির্বাচন চেয়ে সরকারকে নোটিশ 

সুস্থ হওয়ার পর মামলা করবেন নুর : রাশেদ খান

নুরের ওপর হামলার দায় সরকারকেই নিতে হবে : উপদেষ্টা আসিফ

ভেনিসে ঝড় তুললেন এমা স্টোন

১০

বিয়ের আলোচনার জন্য ডেকে যুবককে পিটিয়ে মারল মেয়ের পরিবার

১১

‘রাজনীতিবিদরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অঙ্গীকার দিলে সেটাই হবে বড় সংস্কার’

১২

চবি ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি

১৩

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ম্যাচের টিকিটের মূল্য প্রকাশ, কিনবেন যেভাবে

১৪

খালেদা জিয়াকে ৫ বছর সাজা দেওয়া বিচারপতি আখতারুজ্জামানের পদত্যাগ

১৫

২৮ বছর পর সন্তানকে ফিরে পেলেন বাবা-মা

১৬

বিশ্বের দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে যে মাইলফলক স্পর্শ করলেন পোলার্ড

১৭

আইএসপিআরের বিবৃতি প্রত্যাখ্যান গণঅধিকার পরিষদের 

১৮

সমালোচনার মুখে ইব্রাহিম, জবাব দিলেন জেরিন

১৯

‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েছে’

২০
X