সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে দেশে প্রতি লাখে ১৩৬ জন প্রসূতির মৃত্যু হয়। যদিও বাস্তবে এই হার অনেক বেশি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। মৃত্যুর অর্ধেক ঘটে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে। এ ছাড়া গর্ভকালীন সেবা না নেওয়া, বাড়িতে প্রসব ও খিঁচুনিতে মায়েদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে প্রসূতিমৃত্যু প্রতি লাখে ৭০ জনে নামিয়ে আনতে হবে। চলতি বছরের মধ্যে এই মৃত্যুর সংখ্যা ৮৫ জনে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই। কারণ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স-২০২৩ এর তথ্য অনুযায়ী, এখনো বছরে ৩২ দশমিক ৭৭ শতাংশ নবজাতকের জন্ম হয় বাসাবাড়িতে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়ম হচ্ছে একজন মাকে সন্তান প্রসবের আগে চারবার নিয়মমাফিক চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। গর্ভাবস্থায় মাত্র ৩৯ দশমিক ০৮ শতাংশ মা চারবার চিকিৎসকের কাছে যান। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রসূতি নিয়মিত চেকআপের বাইরে থাকেন। এ ছাড়া শতভাগ সন্তান প্রসব হাসপাতালে না হলে মাতৃমৃত্যু কমবে না। মায়েদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রসবপূর্ব সেবার প্রথম ধাপে যত মা সেবা নেন, তার তুলনায় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে সেবা নেওয়ার হার অনেক কমে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, ২০২২ সালে উপজেলা থেকে নগর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের তুলনায় চতুর্থবার সেবা নেওয়ার হার ছিল ৬৪ শতাংশ কম। আর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জানাচ্ছে, ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের তুলনায় চতুর্থবার পর্যন্ত নারীদের সেবা নেওয়ার হার ছিল ৬০ শতাংশেরও কম।
এমন বাস্তবতায় আজ ২৮ মে বুধবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মাতৃস্বাস্থ্যে সমতা; বাদ যাবে না কোনো মা’। দিবসটি ঘিরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, দেশি-বিদেশি বেসরকারি সহায়তা সংস্থা একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিল বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব পড়তে পারে মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লাখে জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন প্রসূতি মারা যান। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫৩। ২০২১ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৬৮। স্বাধীনতার পর প্রতি লাখ প্রসূতির মধ্যে মৃত্যু হত ৫০০ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে সন্তান জন্মদানের সময় যেসব নারী মারা গেছেন, তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোনো নারীর প্রাণহানি হলে তা মাতৃমৃত্যু বলে বিবেচিত হয়। গর্ভধারণজনিত জটিলতার কারণে, প্রসবকালে এবং প্রসব-পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে প্রাণহানি হলে তা মাতৃমৃত্যু। প্রতি এক লাখ গর্ভধারণে নারী মৃত্যুর সংখ্যাকে মাতৃমৃত্যু হার হিসেবে ধরা হয়। একজন নারীকে সন্তান গর্ভধারণের আগে থেকে প্রসব পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হয়। এ সময় জটিলতা তৈরির শঙ্কা বেশি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মাতৃত্বকালীন সেবা আটবার দেওয়ার পরামর্শ দিলেও বাংলাদেশে সেটি চারবার করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক নারী এই চারবারের সেবাও গ্রহণ করছেন না। যার কারণে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এর চিকিৎসকরা বলছেন, নারীদের জীবনের দাম, মতামতের দাম কম। শুধু কম নয়, নারীদের মতামতের গুরুত্ব নেই, নেওয়াই হয় না মতামত। যার কারণে যখন তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন সেটা অনেক বেশি দেরি হয়ে যায়।
এদিকে জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, দেশে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বাড়ছে। প্রায় ১০ লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে এই অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। আর তার বেশিরভাগই হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। এ জন্য বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১০০ গর্ভধারণে ১০ থেকে ১৫ জন মায়ের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং প্রসবকালে জটিলতা হতে পারে। আর মা ও সন্তানের জীবন রক্ষায় প্রসবের সময় অস্ত্রোপচার করতে হয়। তখন এটি জীবনরক্ষার জন্যই করা হয়। কিন্তু সেটা যদি ১৫ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে তা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ-২০২২ অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩৬ লাখ শিশুর জন্ম হয়। তার মধ্যে ১৬ লাখের মতো শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারে। এর মধ্যে আবার ১০ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জন্ম অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে হচ্ছে। আর এই অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের বেশিরভাগই হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যত শিশুর জন্ম হয় তার মধ্যে ৮৪ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বাকিদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে হচ্ছে ১৪ শতাংশ আর ২ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয়। জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালেই অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে কমপক্ষে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। ফলে হাসপাতালগুলোয় সন্তান জন্মদানে আগ্রহ হারাচ্ছেন মায়েরা। আর হাসপাতালে যান না বলে তাদের গর্ভকালীন চেকআপও হয় না ঠিকমতো।
বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরামের জেনারেল সেক্রেটারি ও শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মাতুয়াইল, ঢাকার পরিচালক ডা. মো. মজিবুর রহমান মুজিব বলেন, এন্টিনেটাল কেয়ার বা প্রসূতি নারীদের সন্তান জন্মদানের আগে চারবার চিকিৎসকের পরামর্শ ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রীলঙ্কাতে প্রসূতিদের এই সেবা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ সন্তানের জন্ম হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। গর্ভধারণের পর ওই নারীর নম্বর দিয়ে একটি রেজিস্ট্রেশন করা হয়। এরপর চেকআপের সময়ের আগে বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়। কোনো কারণে ওই নারী অনুপস্থিত হলে ফোন করে তারা হাসপাতালে নেয়। এসব কারণে সেখানে মাতৃমৃত্যুহার কম।
তিনি আরও বলেন, দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকার পরও প্রসূতিদের সেবা নেওয়ার প্রবণতা কম। এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান জন্মদানকে উৎসাহিত করতে হবে। নয়তো মায়েরা বাসাবাড়িতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু বাড়তেই থাকবে। এক্ষেত্রে সচেতনতায় কাজ না হলে সন্তানের জন্মসনদ ও টিকার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। বাসাবাড়িতে সন্তান জন্ম নিলে তাদের এসব সেবা পেতে জটিলতায় পড়তে হবে। এমন শর্ত আরোপ করলে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান জন্মদানে আগ্রহী হবে। এক্ষেত্রে হাসপাতালে মায়েদের নিরাপত্তা, জরুরি পরিষেবা (পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ) ও জনবল বৃদ্ধি করতে হবে।
মন্তব্য করুন