

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে পদ্মা পাড়ের জেলা রাজবাড়ীর রাজনীতিতে বইছে উৎসবের হাওয়া। দুটি সংসদীয় আসনের এ জেলায় বিএনপির জয়ের সম্ভাবনাই দেখছেন ভোটাররা। বিশেষ করে রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনে ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে রাজবাড়ী-২ (পাংশা, কালুখালী ও বালিয়াকান্দি) আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির সঙ্গে বিএনপির। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মো. হারুন অর রশিদ। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. নাসিরুল হক সাবু।
রাজবাড়ী-১: এ আসনে বিএনপির জনপ্রিয়তার পাল্লাই ভারী। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম দীর্ঘদিন রাজবাড়ীর গণমানুষের সঙ্গে মিশে আছেন। রাজবাড়ী পৌর মেয়র এবং সংসদ সদস্য থাকাকালীন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ তার ওপর আস্থা রাখছে। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে খৈয়মের বিজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধানের শীষের প্রচারণায় মুখর শহর থেকে গ্রাম—প্রতিটি প্রান্ত।
অন্যদিকে, ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মো. নুরুল ইসলাম। তাকে ঘিরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী নিয়ে তিনি ভোটের লড়াইয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
এ আসনে আরও রয়েছেন জাতীয় পার্টির খোন্দকার হাবিবুর রহমান (লাঙল) ও জাকের পার্টির মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস (গোলাপ ফুল)। তবে সাধারণ ভোটাররা বলেছেন, তারা এমন একজনকে প্রতিনিধি হিসেবে চান, যিনি এলাকার নদীভাঙন রোধ এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। এ ক্ষেত্রে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম তাদের কাছে আদর্শ প্রার্থী।
সাধারণ ভোটারদের এ কথার সত্যতা দেখা গেল আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের নির্বাচনী প্রচারে মানুষের ব্যাপক সাড়া। তিনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই দেখা যাচ্ছে জনস্রোত।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম কালবেলাকে বলেন, রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত। আমাদের প্রাণের দাবি হচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। রাজবাড়ীর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর বিকল্প নেই। আমি নির্বাচিত হলে ইনশাআল্লাহ তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাগ্রে কাজ করব।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হচ্ছে ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের প্রতীক। আমি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়েছি, তাদের অভাব-অভিযোগ শুনেছি। বিজয়ী হলে আমি কৃষকের অধিকার রক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে কার্যকর পদক্ষেপ নেব। রাজবাড়ীর সার্বিক কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই।
রাজবাড়ী-২: এখানে লড়াইটা যতটা না প্রতিপক্ষের সঙ্গে, তার চেয়েও বেশি ‘নিজের ঘরের’ মানুষের সঙ্গে। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার মুখোমুখি লড়াইয়ে দলটির দুই হেভিওয়েট নেতা। একদিকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. হারুন অর রশিদ, অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. নাসিরুল হক সাবু। দীর্ঘদিন রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে হারুন ও সাবুর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছিল। নির্বাচনের আগমুহূর্তে সেই যুদ্ধ এখন প্রকাশ্য রাজপথে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। কার মিছিলে যাবেন আর কাকে ভোট দেবেন—এ দ্বিধায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলো। হারুনের ভরসা ‘প্রতীক’, সাবুর শক্তি ‘ব্যক্তি ইমেজ’।
সাধারণ ভোটারদের মতে, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা লড়াইয়ে অন্য দলের প্রার্থীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে পারে। ভোট যদি দুই নেতার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তবে তার ফল কী হবে, তা নিয়ে পাংশার চায়ের দোকানে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এক কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা ধানের শীষও চাই, আবার সাবু ভাইকেও চাই। কিন্তু ব্যালট পেপারে তো আর দুই জায়গায় সিল মারা যাবে না। এই লড়াইটা না হলে জয় নিশ্চিত ছিল।’
ধানের শীষের প্রার্থী হারুন অর রশিদ কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল পরিবার, এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতীকটি আমার ব্যক্তিগত নয়, এটি তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমানের আমানত। যারা নিজেকে দলের প্রকৃত সৈনিক মনে করেন, তারা কখনোই ধানের শীষের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো প্রতীকে ভোট দিতে পারেন না। ব্যক্তি বড় নয়, দিন শেষে ধানের শীষের বিজয়ই হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিজয়। আমি আশাবাদী, সাধারণ ভোটার ও কর্মীরা সব বিভ্রান্তি দূরে ঠেলে ধানের শীষকেই বেছে নেবেন।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসিরুল হক সাবু বলেন, ‘‘রাজনীতি করি মানুষের জন্য। রাজবাড়ী-২ আসনের তৃণমূল নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের চাপেই আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। দল বড় কথা নয়, এ এলাকার মানুষ চায় একজন চেনা মুখ, যাকে বিপদে-আপদে পাশে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে যারা অবহেলিত, তাদের অধিকার আদায়ের জন্যই আমার এই লড়াই। আমার প্রতীক ‘কলস’ হলেও আমি মনে-প্রাণে জাতীয়তাবাদী আদর্শেরই মানুষ। ভোটারদের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে; তারা প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা এবং অতীতের সেবাকেই বেশি মূল্যায়ন করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’’
মন্তব্য করুন