তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ও সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়েছে। এলএনজি আমদানির ব্যয় মেটাতে না পারার কারণে অতি জরুরি এ পণ্যটি আমদানির চুক্তি স্থগিত করার কথা জানিয়েছে একাধিক রপ্তানিকারক কোম্পানি। পাশাপাশি বকেয়ার অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যুকৃত স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) থেকে অর্থ আদায় করার কথা জানিয়েছে একাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। পেট্রোবাংলার ব্যাংক হিসাবে টাকা থাকার পরও পর্যাপ্ত মার্কিন ডলারের অভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংকট সমাধানে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়ে জ্বালানি সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে পাওয়া যায়নি। তবে কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের হাতে টাকা থাকলেও ডলার নেই। এ কারণেই এই সংকট।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের কোম্পানি গানভর সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে আমদানি করা এক কার্গো (কার্গো নং-১০) এবং টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের সুইজারল্যান্ডের ব্রাঞ্চ থেকে আমদানি করা দুই কার্গো (কার্গো নং-৭ ও ৮) এলএনজি আমদানি করা হলেও এখনো অর্থ পরিশোধ করেনি পেট্রোবাংলা। ওই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকে টাকা থাকলেও ডলার না পাওয়ার কারণে আমদানি বিল পরিশোধ করা যায়নি। এমনকি বিল পরিশোধের সময়ও পেরিয়ে গেছে। এরই মধ্যে বিল পরিশোধের জন্য প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে চলতি মাসের শুরুতে তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। পত্রে বিল পরিশোধের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে কোম্পানি দুটি। কোম্পানি দুটির একটি গানভর বিল পরিশোধের তাগাদাপত্রে উল্লেখ করে, আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে পেট্রোবাংলা বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য আহ্বানকৃত দর প্রস্তাবে কোম্পানিটি অংশগ্রহণ করবে না। জুলাই ও আগস্ট মাসে যে দুই কার্গো এলএনজি আমদানির জন্য ‘কনফার্ম নোটিশ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা স্থগিত করা হবে। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ইস্যুকৃত স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) থেকে বিল কেটে নেওয়া হবে। একইভাবে অন্য কোম্পানি টোটাল এনার্জিসের পক্ষ থেকে এক ইমেইল বার্তায় জানানো হয়েছে, আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে পেট্রোবাংলা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এসবিএলসি থেকে অর্থ আদায় করা হবে।
এদিকে, গত মঙ্গলবার জ্বালানি সচিবের কাছে পাঠানো পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তিন কর্মদিবসের মধ্যে এই দুই কোম্পানির বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে এবং সরবরাহকারী কর্তৃক ইস্যুকৃত এসবিএলসি থেকে তাদের অর্থ আদায় করা হলে তা দেশ ও দেশের বাইরে জানাজানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হবে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে মাস্টার সেলস অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগ্রহ কমে যাবে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ব্যাংকগুলো পেট্রোবাংলার পক্ষে এসবিএলসি ইস্যু করতে রাজি হবে না। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ব্যাপকভাবে বিঘ্ন ঘটবে।
জানা গেছে, গানভর সিঙ্গাপুরের সরবরাহকৃত এক কার্গো এলএনজি বিল পরিশোধের সময় ছিল গত ২০ জুন। বিলের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরই মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাকি রয়েছে ২৮ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিল পরিশোধের নির্দিষ্ট তারিখ থেকেও আট দিন বেশি পেরিয়ে গেছে। গানভরের সরবরাহকৃত এলএনজি দাম আংশিক পরিশোধ করা হলেও টোটাল এনার্জিসের দুই কার্গো এলএনজির বিপরীতে বিলের পুরোটাই বাকি। টোটাল এনার্জিসের একটি কার্গোর (কার্গো-৮) বিল দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় ছিল গত ২০ জুন। এরই মধ্যে ২০ দিন পার হয়ে গেছে। অন্য কার্গো (কার্গো-৭) এলএনজি দাম পরিশোধের সময় ছিল গত ৫ জুলাই। এরই মধ্যে ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও বিল পরিশোধ করতে পারেনি পেট্রোবাংলা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে লাইবরের (লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অপার রেট) সঙ্গে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদ যোগ করে পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী যত দিন বিল অপরিশোধিত থাকবে ততদিন দেরিতে পরিশোধের জন্য জরিমানা গুনতে হবে।
মন্তব্য করুন