ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ (বিএসএমএমসি) হাসপাতালের ৩৭ লাখ টাকার পর্দা কেলেঙ্কারিতে সারা দেশব্যাপী হৈচৈ ফেলে দেয়। এরপর স্টোররুমসহ বিভিন্ন কক্ষে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যেকটিই ছিল মানবসৃষ্ট। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার।
তিনি বলেন, ৫৪ দিনের ব্যবধানে সংঘটিত তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার একটিতেও থানায় কোনো জিডি বা মামলা দায়ের করা হয়নি।
সোমবার (৮ জুলাই) জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার এ তথ্য জানান।
গত ২২ মার্চ প্রথম দফায় হাসপাতালের মর্গে আগুন লাগে। মর্গে মৃতদেহ ছিল এবং মর্গটির মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। কক্ষটিতে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না। এর নয় দিন পর অগ্নিকাণ্ডের দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে হাসপাতালের ৯ তলা (নতুন ভবন) ভবনের ষষ্ঠ তলায়।
এরপর তৃতীয় দফায় গত ১৬ মে হাসপাতালটির নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশে অবস্থিত ভাণ্ডারকক্ষে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কক্ষটি গ্রিল ও থাই গ্লাস দিয়ে সুরক্ষিত। অগ্নিকাণ্ডের সময় ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ওই কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। আগুনে ওই কক্ষে থাকা যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। পরে ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা গিয়ে আগুন নেভান।
এসব অগ্নিকাণ্ডের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের প্রতিনিধি, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ফরিদপুর দমকল বাহিনীর সহকারী পরিচালক। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এসব অগ্নিকাণ্ড মানবসৃষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কেবিনেটে পাঠানো হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে আরও বিশদ তদন্তের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিম আসবে বলে আশা করছি। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে বিশেষ করে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ব্যবহার আরও ভালো হওয়া উচিত বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক।
১৯৯১ সালে শহরের পশ্চিম খাবাসপুর মহল্লায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পূর্ব পাশে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে শয্যা বাড়িয়ে ৫০০ তে উন্নীত করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর’ নামকরণ করে সরকার। ২০২৩ সালের ১৭ মে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে এই হাসপাতালকে পাঁচশ শয্যা থেকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়। ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। প্রতিদিন গড়ে সহস্রাধিকের বেশি রোগী ভর্তি ও দুটি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন।
হাসপাতালটিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মূল্যবান এমআরআই মেশিন, সিটি স্ক্যান মেশিন, এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কপি, এনজিওগ্রামের মতো মেশিন স্থাপন করা হলেও এসব অকেজো পড়ে আছে। এমনকি সামান্য এক্সরে মেশিনটিও রিল না থাকার অযুহাতে অধিকাংশ সময় অকেজো করে রাখা হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বিএসএমএমসি হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ বিষয়টিও আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এখানে সেবার মান বৃদ্ধির জন্য, এখানে যেসব দায়িত্বরত ডাক্তার আছেন তাদের আচরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানোর জন্য যদি প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয় সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নেবে।
মন্তব্য করুন